ইনিংসের শেষ বলে মুশফিক হাসানের ফুলটস ডেলিভারিটি ব্যাটেই লাগাতে পারলেন না জিমি নিশাম। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের উইকেটকিপার লিটন দাস বল ধরতে ধরতে দৌড়ে এক রান নেন। আফসোস করতে করতে মাঠ ছাড়েন নিশাম। মাথায় হাত দিয়ে থাকতেও দেখা গেছে তাঁকে। অবশ্য আফসোসের যথেষ্ট কারণও আছে। মাত্র ৩ রানের জন্য সেঞ্চুরির দেখা পাননি কিউই ব্যাটসম্যান।
এভাবে না বলে ম্যাচের প্রেক্ষাপট বললে ভালো বোঝা যাবে। ইনিংসের ১৯তম ওভার শেষে রংপুর রাইডার্সের স্কোরবোর্ডে ১৫৭ রান। নিশাম ৭১ রানে ব্যাট করছেন। মুশফিকের প্রথম পাঁচ বল থেকে ২ চার ও ৩ ছক্কায় ২৬ রান নেন নিশাম। শেষ বলে তিন রান – আরও সহজ করতে চাইলে একটা চার হলেই সেঞ্চুরিটা হয়ে যায়! কিন্তু হলো না, নিশামকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো ৪৯ বলে ৮ চার ও ৭ ছক্কায় ৯৭ রানের দারুণ এক অপরাজিত ইনিংসে। এ কিউই ব্যাটসম্যানের ঝড়েই বিপিএলের প্রথম কোয়ালিফায়ারে ৬ উইকেটে ১৮৫ রানের সংগ্রহ পেয়েছে রংপুর।
অন্যদিকে শেষ ওভারে ২৮ রান দেওয়া মুশফিক গড়েছেন লজ্জার রেকর্ড। চার ওভার হাত ঘুরিয়ে দিয়েছেন ৭২ রান। এবারের আসর তো বটেই, বিপিএল ইতিহাসেই এক ম্যাচে এর চেয়ে বেশি রান দেওয়ার রেকর্ড নেই আর কোনো বোলারের। নিশামের ঝড়টা যে মুশফিকের ওপর দিয়েই বেশি গেছে, এটা না বললেও চলে।
আজকের আগে গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের বিপক্ষে লড়েছিল রংপুর রাইডার্স। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের সে ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করা রংপুর যে ১৫০ রানের সংগ্রহ পেয়েছিল, সেটা জিমি নিশামের অপরাজিত ৬৯ রানের কল্যাণেই। আজ ভেন্যু বদলেছে, গ্রুপ পর্ব শেষে ম্যাচ কোয়ালিফায়ার পর্বে এসেছে, কিন্তু বদলায়নি রংপুর ইনিংসের চিত্র।
গ্রুপ পর্বের ওই ম্যাচের মতো আজও টস জিতে আগে ফিল্ডিং নিয়েছেন কুমিল্লা অধিনায়ক লিটন দাস। ম্যাচের প্রথম ওভারেই বল তুলে দিয়েছেন অভিষিক্ত রোহানাত-দৌলা বর্ষণের হাতে। অভিষেকের চাপেই কি না। প্রথম ডেলিভারিতে ফুলটস দিয়ে বসে বর্ষণ। সেটার সুযোগ ঠিকঠাক কাজে এক্সট্রা কাভারে বাউন্ডারি মারেন রংপুর ওপেনার রনি তালুকদার। পরের বলে আবারও চার।
প্রথম দুই বলে আট রান দিয়েও এরপর দারুণভাবে ফিরে আসেন বর্ষণ। গতির সঙ্গে দুর্দান্ত লাইন লেংথের মিশেলে চমকে দেন রাইডার্স ব্যাটসম্যানদের। দ্বিতীয় ওভারে বোলিংয়ে এসে কুমিল্লাকে ব্রেক-থ্রু এনে দেন তানভীর ইসলাম। রংপুর ওপেনার শামিম পাটোয়ারির শট বোলার তানভীরের হাতে বল যায় আন্দ্রে রাসেলের দিকে। দারুণ দক্ষতায় ক্যাচ নেন ক্যারীবিয়ান তারকা।
পরের ওভারে আরেক ওপেনার রনি তালুকদারকে ফেরান বর্ষণ। মাত্র ১৬ রানে দুই উইকেট হারানো রংপুর রীতিমতো বিপর্যয় দেখছে তখন। ওদিকে স্টেডিয়ামে আসা কুমিল্লার সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। ক্রিজে তখন সাকিব আল হাসান, মিরপুরের গ্যালারিতে উত্তেজনা।
কিন্তু সাকিব কী করলেন? ৯ বলে ৫ রান করেই আউট! দলীয় ২৭ রানে তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়ে দলের বিপদ বাড়িয়ে গেলেন তিনি। পাওয়ার প্লে-র ছয় ওভার শেষে রংপুরের স্কোরবোর্ডে ৩ উইকেটে ৩৫ রান।
এবারের বিপিএলে আজই প্রথম স্টেডিয়াম দর্শকদের চাপে কাণায় কাণায় পূর্ণ হয়েছে। কোয়ালিফায়ারের হাই ভোল্টেজ ম্যাচ তখন রানখরার শঙ্কায়। কিন্তু সে শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে পরের গল্পটা নিজ হাতে লিখেছেন নিশাম। দুর্দান্ত ব্যাটিং প্রদর্শনীতে যেমন বিপর্যয়ে পড়া রংপুরের রান মেশিন মেরামত করেছেন, অন্যদিকে রাইডার্স সমর্থকদের বিনোদিত করেছেন।
চতুর্থ উইকেটে শেখ মেহেদীকে নিয়ে ২৬ বলে ৩৯ রানের জুটি গড়েন নিশাম। কিন্তু দলীয় ৬৬ রানে মেহেদীকে (১৭ বলে ২২ রান) রাসেলের হাতে ক্যাচে পরিণত করে জুটি ভাঙেন সুনীল নারাইন। এরপর পুরান এসে ঝড়ের আভাস দিলেও সেটাকে টেনে নিতে পারেননি (৯ বলে ১৪ রান)। এর মাঝে ১৩তম ওভারে দলীয় শতরান পেরোয় রংপুর।
এরপর অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহানকে নিয়ে রংপুরকে টানতে থাকেন নিশাম। কিন্তু সোহান ২৪ বলে ৩০ রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন। তাতে অবশ্য ম্যাচে তেমন প্রভাব পড়েনি। অন্যপ্রান্তে যে নিশাম তখনো সটান দাঁড়িয়ে।
৩১ বলে ফিফটি পেয়ে গিয়েছিলেন, এরপর আরও বিধ্বংসী হয়েছে তাঁর ব্যাট। সেঞ্চুরিই হয়তো প্রাপ্য ছিল। কিন্তু প্রাপ্য আবার প্রাপ্তি যে সব সময় মেলে না!