এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কী এক অদ্ভুত নিয়ম করেছে আইসিসি! সুপার এইটে কোন দল খেলবে, তা যদি টুর্নামেন্টের আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে আর টুর্নামেন্টের মজা অতটা থাকে কোথায়!
পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড আর শ্রীলঙ্কা বাদ পড়েছে, চিত্রপটে ঢুকে গেল যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান আর বাংলাদেশ। না হলে সুপার এইটে তা-ই হতো, যা আইসিসির এবারের বিশ্বকাপের ফরম্যাট আর গ্রুপিং জানানোর পরই ধারণা হয়ে গিয়েছিল সবার।
সুপার এইটের জন্য আইসিসির এভাবে আগে থেকেই দলগুলোর অবস্থান ঠিক করে রাখা বা ‘প্রি-সিডিং’ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক।
‘আমার মনে হয় এই প্রি-সিডিং নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। এটা বলতে পারছি না যে এই পদ্ধতিটা আমার খুব একটা ভালো লেগেছে’ – সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন স্টার্ক।
প্রি-সিডিংটা কেমন ছিল? টুর্নামেন্টের আগে থেকেই আইসিসি প্রতি গ্রুপে দুটি করে দলকে ‘১’ ও ‘২’ সিডিং দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ, গ্রুপে যা-ই হোক না কেন, ওই দুই দল সুপার এইটে উঠলে তাদের সিডিং পূর্বনির্ধারিত নাম্বার অনুযায়ীই হবে। ‘এ’ গ্রুপে যেমন ভারত ‘এ১’, পাকিস্তান ছিল ‘এ২’। বি গ্রুপে যথাক্রমে ইংল্যান্ড (বি১) ও অস্ট্রেলিয়া (বি২), সি গ্রুপে নিউজিল্যান্ড (সি১) ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ (সি২) আর ডি গ্রুপে দক্ষিণ আফ্রিকা (ডি১) ও শ্রীলঙ্কা (ডি২)।
সিডিং পাওয়া দলগুলোর কোনোটি বাদ পড়লে ওই গ্রুপ থেকে ওঠা অন্য দল তাদের জায়গা নেবে, দুটিই বাদ পড়লে পয়েন্ট তালিকায় এগিয়ে থাকা দল হবে ‘১’ – এটাই ছিল নিয়ম।
এভাবে প্রি-সিডিংয়ের কারণ হিসেবে বলা হয়, সুপার এইটে একটা দলের ম্যাচ কোথায় হবে, সেটা আগে থেকেই জানা থাকলে দর্শকের জন্য ম্যাচের টিকিট, হোটেল, বিমানের টিকিট কাটতে সুবিধা হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে দূরত্ব, যাওয়ার ঝক্কি বিবেচনায়ই নাকি নেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সমালোচকদের মতে, আইসিসি আসলে চেয়েছে, যাতে সুপার এইটে ভারত আর অস্ট্রেলিয়া একই গ্রুপে পড়ে আর ভারত ও পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠলে তারা মুখোমুখি হয়। বাণিজ্য আর কী!
কিন্তু ঝামেলা হলো, এতে টুর্নামেন্টের অনিশ্চয়তাই অনেকটা কমে গেল, যেখানে অনিশ্চয়তার কারণেই টুর্নামেন্টগুলোকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে। সুপার এইটে ওঠা দলগুলো গ্রুপে কী করল না করল, তার আর গুরুত্ব থাকল না। যোগ্যতার ভিত্তিও তাহলে কীভাবে থাকে!
অস্ট্রেলিয়ার গ্রুপেই যেমন, অস্ট্রেলিয়া তিন ম্যাচের সবগুলো জিতেও গ্রুপের সিডিংয়ে দ্বিতীয় থেকে গেল, ইংল্যান্ড কোনোরকমে শেষ মুহূর্তে সুপার এইট নিশ্চিত করে হয়ে গেল ‘বি১!’
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের এই প্রি-সিডিং নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিকও নয়। এই প্রি-সিডিং-এ অস্ট্রেলিয়াই যে কিছুটা কঠিনতর গ্রুপে পড়ছে! কেন? প্রি-সিডিংয়ের কারণে অস্ট্রেলিয়া এখন যে গ্রুপে পড়েছে, তাতে শুধু ভারতই নয়, বাকি দুই দলই এশিয়ান! ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিন-সহায়ক কন্ডিশনে উপমহাদেশীয় দল কে সামলাতে চায়! বাংলাদেশ আর আফগানিস্তান কাগজে-কলমের শক্তিতে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকলেও কন্ডিশনের কারণে অস্ট্রেলিয়ার কিছুটা অস্বস্তি না হয়ে পারে না।
আরেকটি প্রশ্নও ফিসফিসিয়ে আওয়াজ তোলে। এই প্রি-সিডিংয়ের হিসাব না থাকলে কি ভারত আরেকটু কঠিন গ্রুপে পড়ত?
সে হিসেবে যাওয়ার আগে সুপার এইটের দুই গ্রুপে কোন কোন দল পড়বে, সেটি নির্ধারণের সূত্রটা দেখে নেওয়া যাক। সহজ সূত্র – এক গ্রুপের প্রথম দল, পরের গ্রুপের দ্বিতীয় দল…এভাবে চার গ্রুপ থেকে চার দল আসবে। অর্থাৎ, সুপার এইটের গ্রুপ ১-এ ঢুকবে প্রথম পর্বে এ১, বি২, সি১ আর ডি২ – এই চার দল। গ্রুপ ২-তে এ২, বি১, সি২ আর ডি১।
প্রথম রাউন্ডে নিজেদের গ্রুপের সব ম্যাচ জেতায় ভারত ‘এ১’-ই থাকত, সুপার এইটে গ্রুপ-১-এই পড়ত। তবে প্রি-সিডিং না থাকলে ভারতের গ্রুপটা হতো এরকম: ভারত, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশ। আর প্রি-সিডিং না থাকলে সুপার এইটে অস্ট্রেলিয়া পড়ত ‘গ্রুপ ২-তে’, যেখানে তাদের গ্রুপসঙ্গী হতো যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান আর দক্ষিণ আফ্রিকা।
মিচেল স্টার্করা বিরক্ত হবেন না-ই বা কেন!