বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে রীতিমতো সার্কাস চলছে বললেও ভুল হবে না। ডিপিএলে আম্পায়ারের সঙ্গে অসদাচরণের কারণে মোহামেডানের অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়কে দুই ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর সব বিধি-বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তা আবার কমিয়ে এক ম্যাচ করে বিসিবি। এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর দুই ম্যাচ খেলেও ফেলেন হৃদয়। এরপর চারিদিকের সমালোচনার মধ্যে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে গতকাল বিসিবি মুখের কথায় জানাল, ফের হৃদয়কে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
মুখে বললেও সেটার লিখিত কোনো বিবৃতি বা মেমো আসেনি আজ সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত। এর মধ্যে দেশের ক্রিকেট বোর্ডের এমন একেকবার একেক সিদ্ধান্তে অদল-বদলের মাঝেই আজ বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে তামিম ইকবালসহ একাধিক ক্রিকেটার বৈঠকে বসেন। বিসিবিতে এমন বৈঠকের পর গণমাধ্যমে তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ম্যাচ খেলে ফেলার পর আবার একই কারণে হৃদয়ের নিষেধাজ্ঞা ‘হাস্যকর।’
মোহামেডানের হয়ে চলতি মৌসুমে অধিনায়কত্ব করা তামিমের এমন মন্তব্যের পরই আজ সন্ধ্যায় বিসিবি এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, এক বছরের জন্য পেছাল তাওহীদ হৃদয়ের শাস্তি। আগামী মৌসুমের ডিপিএলে কার্যকর হবে এই শাস্তি। ফলে চলতি মৌসুমে ডিপিএলে সুপার লিগের বাকি দুই ম্যাচে খেলতে আর বাধা নেই হৃদয়ের।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিসিবি জানিয়েছে, ‘১৯ এপ্রিলের স্মারকলিপি বাতিল হওয়ার পর টেকনিক্যাল কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়ের ওপর প্রথমে আনা দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে বাতিল করা স্মারকের কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তির পর, এবং সতর্কতার সঙ্গে সবদিক বিবেচনার পর, ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ ২০২৪-২৫-এর টেকনিক্যাল কমিটি ১২ মাসের জন্য দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
টেকনিক্যাল কমিটি খেলার সর্বোচ্চ বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে বিসিবির সেই বিবৃতিতে আরও বলছে, ‘খেলার বিশুদ্ধতা বজায় রাখা, বর্তমান টুর্নামেন্টের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং ক্রিকেট পরিবারের মধ্যে ঐক্য ও খেলার চেতনা সংহত করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়েছে।’ বিসিবির নিয়মকানুনের মধ্যে থেকে ন্যায্যতার চূড়ান্ত মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা ধরে রাখতে টেকনিক্যাল কমিটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে বিবৃতিতে।
বিসিবির এমন সিদ্ধান্ত পেছানোর কারণে আগামীকাল গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের বিপক্ষে খেলতে পারবেন তাওহীদ হৃদয়।
উল্লেখ্য, গত শনিবার মিরপুরে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচে একটা এলবিডাব্লিউর আবেদনে সাড়া না দেওয়ায় বোলার প্রান্তের আম্পায়ার তানভীর আহমেদের সঙ্গে প্রথমে লেগে যায় তামিমের অসুস্থতার পর থেকে মোহামেডানের অধিনায়কত্ব করা হৃদয়ের। পরিস্থিতি সামলাতে ওই ওভারে লেগ সাইডের আম্পায়ার – আইসিসির আম্পায়ারদের এলিট প্যানেলে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি – শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত এগিয়ে আসেন, কিন্তু কথায় কথায় তাঁর সঙ্গেও কথা কাটাকাটি করেন হৃদয়।
ওই ঘটনার পর বিসিবি প্রথমে হৃদয়কে ৪টি ডিমেরিট পয়েন্ট দিলেও নিষেধাজ্ঞা দেয় এক ম্যাচের, যেখানে চার ডিমেরিট পয়েন্টের জন্য সাধারণত সীমিত ওভারের ক্রিকেটের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাটা হয় দুই ম্যাচের। এরপর সংবাদমাধ্যমে এসে হৃদয় বলেন, ‘ঘটনা যদি অন্যদিকে যায়, আমি মুখ খুলব ইনশা আল্লাহ।’ হুমকিই তো! এরপর বিসিবি তাঁকে জরিমানার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা আরও এক ম্যাচ বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু এরপর কোনো এক অদৃশ্য চাপে যাঁদের এই নিষেধাজ্ঞা কমানোর এখতিয়ার নেই, সেই আম্পায়ার্স কমিটি আবার হৃদয়ের নিষেধাজ্ঞা দুই ম্যাচ থেকে এক ম্যাচে নামিয়ে আনে। এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে হৃদয় মাঠেও নেমে যান। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা কমানোর ওই সিদ্ধান্তের পর সিসিডিএম-র (ক্রিকেট কমিট অব ঢাকা মেট্রোপলিস) টেকনিক্যাল কমিটি থেকে সরে যান সাবেক ক্রিকেটার ও আম্পায়ার এনামুল হক মনি, যদিও তিনি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় অন্য কারণের কথা বলেছিলেন।
এরপর আইসিসির এলিট প্যানেলের আম্পায়ার সৈকত যখন বিসিবির কাছে আর ঘরোয়া টুর্নামেন্টে আম্পায়ারিং না করার ব্যাপারে পদত্যাগপত্র দেন, চারিদিকে ওঠে সমালোচনার ঝড়। বিসিবির আম্পায়ার্স কমিটির প্রধান এরপর বৈঠক করে সৈকতকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে ফেরান, আর বিসিবি নতুন করে আবার হৃদয়কে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ করে।