তৃতীয় সেশনের ততক্ষণে ২০ ওভার হয়ে গেছে। পানীয় পানের বিরতি চলছে। দিনে আর ওভার পনেরোর মতো বাকি, ততক্ষণে ৮১ রানের লিড ভারতের। হাতে তখনো ৬ উইকেট। ইংল্যান্ডের জয় না ভারতের ড্র – এ দুইয়ের মধ্যে দোদুল্যমান যে রোমাঞ্চ নিয়ে দিনটা শুরু হয়েছিল, সেখানে ইংল্যান্ডের জয়ের আর সম্ভাবনা কোনোভাবেই নেই। ইংল্যান্ড আর কী করবে, অধিনায়ক বেন স্টোকস হাত বাড়িয়ে ড্রয়ের প্রস্তাব দিলেন।
ব্যস, সেখান থেকে বাড়তি নাটকীয়তার শুরু! ক্রিজে থাকা ভারতের দুই ব্যাটসম্যান রাভিন্দ্র জাদেজা ও ওয়াশিংটন সুন্দার হাত বাড়ালেন না। তাঁরা এখনই খেলা ছাড়তে রাজি নন। এই টেস্টে ভারতের জয়ের কোনো সম্ভাবনাই নেই, ড্র ছাড়া আর কিছু সম্ভব নয়, তবু সুন্দার-জাদেজা প্রস্তাব মানলেন না কেন? একটাই উত্তর, তখনো যে দুজনই ৮০-র ঘরে! সুন্দারের রান তখন ৮০, জাদেজার ৮৯। সেঞ্চুরির সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নন বলেই হাত মেলালেন না দুজন।
ইংল্যান্ড গেল খেপে! আম্পায়ারের কাছে অসন্তোষ জানালেন। ক্রিকইনফো লিখেছে, ইংল্যান্ডের এক খেলোয়াড়কে নাকি বলতে শোনা গেছে, ‘তোমাদের আরও কতক্ষণ লাগবে? এক ঘণ্টা?’ ভারতের ব্যাটসম্যানদের কাছে একটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়া ম্যাচ শেষ করার চেয়ে কেন ব্যক্তিগত মাইলফলক বড় হয়ে গেল, এ জাতীয় ‘ক্রিকেটীয় চেতনা’র আলাপও তুললেন কেউ কেউ!
কিন্তু নিয়ম তো নিয়মই, এক দল যেহেতু খেলে যেতে চায়, তাই খেলা চলবে! ইংল্যান্ডের বিরক্তি নিয়েই খেলা চলল। একটাই তখন রোমাঞ্চ বাকি এই টেস্টে – কার সেঞ্চুরি আগে হবে, জাদেজার না সুন্দারের? দৌড়ে জাদেজাই জিতলেন। হ্যারি ব্রুককে ছক্কা মেরে খাপছাড়া তলোয়ারের ভঙ্গিতে টেস্টে পঞ্চম সেঞ্চুরি উদ্যাপন করলেন। সুন্দার তখন ৯০-এর ঘরে। ক্রিকইনফোর লাইভ কমেন্টারিতে জানা গেল, হ্যারি ব্রুক তখন সুন্দারকে তাড়া দিচ্ছিলেন দ্রুত সেঞ্চুরি করার জন্য।
১৪৩তম ওভারে চতুর্থ বলে ব্রুককে চার মেরে ৯৯-এ পৌঁছালেন সুন্দার, ওভারের শেষ বলে দুই রান। হয়ে গেল তাঁর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। এবার হাত মেলাল ভারত। মাঝে কেটে গেল ১৮ মিনিট আর পাঁচটা ওভার। হলো দুজনের সেঞ্চুরি।
আর ম্যানচেস্টার টেস্টের ভাগ্যে যা দিনের দ্বিতীয় সেশনের শেষদিক থেকেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়া গিয়েছিল, তা-ই হলো – ড্র! চার দিন পর শুরু হতে যাওয়া ওভাল টেস্টেও রোমাঞ্চটা এখন আজ দিন শুরুর আগের মতোই অনেকটা – চার টেস্ট শেষে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ইংল্যান্ডই সিরিজ জিতবে, নাকি ভারত ড্র করবে সিরিজ?
তার আগে ম্যানচেস্টার টেস্টে প্রায় একই ঢংয়ের প্রশ্ন নিয়ে শুরু হওয়া আজ পঞ্চম দিনে সময় যত গড়িয়েছে, ভারতের ব্যাটসম্যানরা ততই ইংল্যান্ডকে হতাশ করেছেন। ভারতের দিক থেকে দেখলে এ অবশ্য এক অসাধারণ কীর্তি। গতকাল ৩০৫ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে প্রথম ওভারেই দুই ব্যাটসম্যানের বিদায় দেখা ভারত যে পরের ১৪২ ওভারে আর মাত্র দুটি উইকেট হারাবে, তা কে ভাবতে পেরেছিল!
গতকাল চতুর্থ দিন শেষ হতে হতেই লোকেশ রাহুল (৮৭*) আর শুবমান গিল (৭৮*) প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ভারতকে একটা আশা দেখানোর মতো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পরও-বা এমন কিছু কজন ভেবেছিলেন! ইংল্যান্ডের মাত্র ৮ উইকেট দরকার, ভারতকে কোনোরকমে ড্র করতে হলেও দিনে তিন সেশনের মধ্যে অন্তত আড়াই সেশন ব্যাট করতে হবে – এমন সমীকরণে শুরু হওয়া পঞ্চম দিনে ইংল্যান্ডের জয় অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে বরং কচুকাটা চলেছে তাদের দলের বিভিন্ন অনুষঙ্গের। কেউ ব্যাটসম্যানদের সমালোচনা করেছেন, কেউ ভারতের কোচ গৌতম গাম্ভীরের, কেউবা ভারতের অধিনায়ক গিলের!
রাহুল আজ সকালে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি, সেঞ্চুরিটাও করতে পারেননি। দিনের অষ্টম ওভারেই স্টোকসের বলে এলবিডাব্লিউ হয়ে যখন ৯০ রানে আউট হচ্ছেন রাহুল, ভারতের কাঁপাকাঁপি শুরু। গিল সেঞ্চুরি পেলেন বটে, অধিনায়ক হিসেবে এক সিরিজে ৪ সেঞ্চুরির রেকর্ডে দুই কিংবদন্তি – অস্ট্রেলিয়ার ডন ব্র্যাডম্যান আর ভারতের সুনীল গাভাস্কারকে ছুঁয়েছেন। তবে সেঞ্চুরি পেতেই তাঁর দম শেষ! আর্চারের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে গিল যখন ১০৩ রানে আউট, ভারত তখনো ৮৩ রানে পিছিয়ে। তখনো প্রথম সেশন প্রায় শেষ হলো বলে! ভারত তখনো শঙ্কায়, অলআউট হয়ে গেলেও দিনের বাকি সময়ে ইংল্যান্ডের তাড়া করার মতো অসাধ্য রান করতে পারবে ভারত?
সে হিসেবেই আর যেতে দিলেন না জাদেজা ও সুন্দার। শুধু ঠেকিয়ে গেছেন এমন নয়! উইকেটের আশায় ইংল্যান্ডের আগ্রাসী ফিল্ড সেটিংও ভারতকে বাড়তি কিছু বাউন্ডারি পেতে সাহায্য করেছে। তাতে লাঞ্চ থেকে ফিরে চা বিরতি পর্যন্ত ১৯ ওভারেই জাদেজা-সুন্দার ভারতকে এনে দিলেন ৯৯ রান। দুজনের ততক্ষণে মাত্র ফিফটি হয়েছে। তবে ততক্ষণে ভারত অনেকটা নির্ভার হতে শুরু করেছে, তখন যে আর মাত্র ১৭ রান পিছিয়ে তারা!
বাকি সময়ে ইংল্যান্ডের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় নেমেছে, ভারত অন্তত টেস্ট বাঁচানোর স্বস্তি নিয়ে খেলেছে। টেস্টের রোমাঞ্চে জল যা একটু পড়েছে, সেটা শেষদিকে স্টোকসের বাড়ানো হাত না মিলিয়ে সেঞ্চুরির পথে ছোটা জাদেজা-সুন্দার কিছুটা ফিরিয়ে দিলেন বিতর্কে।