গত ৩ জানুয়ারি ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআইয়ের সঙ্গে আলাপকালে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া এমন এক মন্তব্য করেন, যে মন্তব্যের জেরে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটাঙ্গনে রীতিমতো ঝড় বইছে। তা দেবজিৎ সাইকিয়া কী এমন বলেছিলেন?
বিসিসিআই সচিব জানান, ‘সাম্প্রতিক নানান ঘটনায়’ কলকাতা স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিসিসিআই। আর বোর্ডের নির্দেশ পাওয়ার পর কালবিলম্ব না করে সেদিনই বাংলাদেশি পেসারকে দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেড়ে দেয় কলকাতা।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই থেকে বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। মোস্তাফিজ ইস্যুতে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) বাংলাদেশি পেসারের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। আবার ভারতে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ভারত থেকে ভেন্যু সরিয়ে নিতে আইসিসির কাছে আবেদনও করেছে বিসিবি। এতে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়ে আইসিসি।
বিষয়টা কি এত জটিল হওয়ার মতো ছিল? ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগে এক দেশের ক্রিকেটার অন্য দেশের লিগে খেলবে, এটাই স্বাভাবিক হওয়ার। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এখানে ধীরে ধীরে কূটনৈতিক হাতিয়ার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অস্ত্রে পরিণত হয়ে উঠছে ক্রিকেট।
অথচ দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘সফট পাওয়ারে’র ভাষা হিসেবে দেখা হতো। যুদ্ধের মতো অবস্থা, সীমান্তে জটিলতা, কূটনৈতিক অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতিতেও সবার অভিন্ন আবেগ জড়িয়ে ছিল ক্রিকেটের সঙ্গে। সেই ভাষাটাই এখন নতুনভাবে লেখা হচ্ছে।
বিশ্ব ক্রিকেটের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি দাপট কার? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি ভাবার দরকার নেই। অনায়াসে ভারতের নাম বলে দেওয়া যায়। সেই ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে কিংবা শাস্তি দিতে ক্রিকেটের প্রভাবকে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এটাকে ভিন্ন চোখে দেখলে, খেলা ধীরে ধীরে কূটনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে।
মোস্তাফিজ ইস্যু: ড্রেসিংরুমে রাজনীতির প্রবেশ
গত মধ্য ডিসেম্বরের নিলামে মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে টেনেছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। কিন্তু ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতির’ দোহাই দিয়ে মোস্তাফিজকে দল থেকে ছেড়ে দিতে কলকাতাকে নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার পেছনে ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাও জড়িত।
আর মোস্তাফিজকে ছাড়ার ঘটনা যে সেই উত্তেজনা আরও বাড়াবে, সেটা অনুমিতই ছিল। হলোও সেটাই। চোট বা অন্য কারণে চুক্তি বাতিল না হওয়ায় আইপিএল থেকে মোস্তাফিজের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনাও সামান্য।
মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার বিষটিকে ‘বৈষম্যমূলক’ ও ‘অপমানজনক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বিসিবি। সেখানেই থেমে থাকেনি দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখিয়ে ভারতে হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায় আইসিসিতে। বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টিতে জড়িয়ে পড়ে। সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিষয়গুলো দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট ও রাজনৈতিক সংযোগকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সূচি অনুসারে, গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচই ভারতে হওয়ার কথা। কিন্তু ভেন্যু সরিয়ে নিতে বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে এখনো চূড়ান্ত কিছু জানায়নি আইসিসি। তবে গত ৭ জানুয়ারি বিসিবি জানিয়েছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে আশ্বস্ত করেছে আইসিসি। পাশাপাশি জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ম্যাচ স্থানান্তরের অনুরোধের বিষয়ে আইসিসি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিসিবি। তবে বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত আইসিসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা নিয়ে জটিলতা কাটছে না।
ভারতীয় রাজনীতিবিদদের থেকেই এই ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য পাওয়া গেছে। বিজেপি নেতা নবনীত রানা বাংলাদেশ সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘ভারতে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটার বা তারকাকে আপ্যায়ন করা উচিত নয়।’ অন্যদিকে ভারতীয় কংগ্রেস নেতা শশী থারুর মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা করে জানান, খেলাকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। পাশাপাশি শশী থারুর এটাও জানান, অন্য দেশের ঘটনার দায় একজন খেলোয়াড়ের ওপর চাপানোর পক্ষে নন তিনি।
ব্যতিক্রম নয়, নতুন করে সামনে এসেছে:
মোস্তাফিজ ইস্যুটি একটি বিষয়কে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সব ক্রিকেট বোর্ড রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করলেও বিসিসিআইয়ের আর্থিক ক্ষমতা একেবারে অনন্য।
আইসিসির বর্তমান প্রধান জয় শাহ। তিনি আবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পুত্র। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পর দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি মনে করা হয় অমিত শাহকে। শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই নয়। আর্থিক দাপটেও আইসিসিতে সবার শীর্ষে ভারতের বোর্ড।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আইপিএল, এ নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। আবার ১৫০ কোটি জনসংখ্যার ভারতই বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাজার। ধারণা করা হয়, বিশ্ব ক্রিকেট আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ ভারত থেকে আসে।
আর এসব ক্ষমতাই ভারতকে সূচি নির্ধারণ, ভেন্যু বাছাই ও রাজস্ব বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। ধীরে ধীরে এই বিষয়গুলো ক্রিকেট ভারতের কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। ফলে ভারতের সঙ্গে কোনো দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে ক্রিকেট আর আলাদা থাকে না। সেটার প্রভাব পড়ে ক্রিকেটেও। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটাই দেখা যাচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০২৪ এর আগস্টে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। এদিকে গত বছর দেশের একটি ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। কিন্তু ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত তীব্রতর হতে থাকে। ডিসেম্বরে শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের বিপক্ষে জনরোষ আরও বাড়ে বাংলাদেশে।
অন্যদিকে ভারতের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে ক্রমাগত সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের খবর প্রচারিত হতে থাকে। এতে ভারতে বাংলাদেশ বিরোধী জনমত গড়ে উঠতে থাকে। ডিসেম্বরে ময়মনসিংহে দীপু দাস হত্যার ঘটনায় সেই জনমত ক্ষোভে পরিণত হয় এবং ভারতে অনেক জায়গায় বিক্ষোভ সংঘটিত হয়।
এরই ক্ষোভের মধ্যে আইপিএল নিলামে কলকাতা মোস্তাফিজকে নেওয়ার পর থেকে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা বাংলাদেশি তারকাকে না খেলানোর চাপ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা কলকাতা ও শাহরুখ খানকেও হুমকি দিয়ে বসেন। শেষ পর্যন্ত মোস্তাফিজকে বাদ দিতে নির্দেশ দেয় বিসিসিআই।
এমন প্রেক্ষাপটে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ভারতীয় বিশ্লেষকরা সমালোচনা করছেন। ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকত বীর সাংভি লিখেছেন, ‘বিসিসিআই “আতঙ্কিত হয়ে” সাম্প্রদায়িক চাপে নতি স্বীকার করেছে এবং খেলাধুলার একটি বিষয়কে কূটনৈতিক বিব্রতকর ঘটনায় পরিণত করেছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে এমন বয়কটের কোনো মানে হয় না। ক্রিকেটের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মেশানোয় একদিকে যেমন ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে, তেমনি আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘সরকার কূটনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।’ প্রশ্ন তুলে অভিজ্ঞ এ সাংবাদিক আরও লিখেছেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় যেতে পারলে, বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা কেন ভারতের খেলতে পারবেন না?’
ক্রিকেট বিশ্লেষক ধর্মিন্দর জোশি বলেছেন, ‘এই ঘটনা দেখাচ্ছে, যে ক্রিকেট একসময় ভারত ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল, সেটাই এখন বিভাজন বাড়াচ্ছে।’
এটার আরেকটা উদাহরণ দেখা গেছে সর্বশেষ এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি ম্যাচে।
এশিয়া কাপে অচলাবস্থা:
সর্বশেষ এশিয়া কাপ শুরুতে শুধু পাকিস্তানে হওয়ার কথা থাকলেও নানান ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত ভারতের আপত্তিতে ‘হাইব্রিড মডেলে’ হয়েছে। সরকারি পরামর্শের অযুহাতে পাকিস্তানে খেলতে যায়নি ভারত। সে কারণে ভারতের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এমনকি পাকিস্তান আয়োজক হলেও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচগুলো খেলতে তাদের আমিরাতে যেতে হয়েছে।
নানান জটিলতা পেরিয়ে ম্যাচ মাঠে গড়ালেও সেখানে নাটকীয়তা কম হয়নি। পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে টুর্নামেন্টে মুখোমুখি তিনটি ম্যাচের একটিতেও পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাননি ভারতের ক্রিকেটাররা।
এ প্রসঙ্গে ভারতের ক্রিকেট বিশ্লেষক জোশি বলেছেন, ‘হ্যান্ডশেক বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু খেলোয়াড়রা প্রায়ই মাঠে প্রতিপক্ষের জুতার ফিতা বেঁধে দেয় বা তাদের সাহায্য করে। এটাই ক্রিকেটের চেতনা। এখন যদি দেশগুলোর মধ্যে সংঘাত থাকে, তাহলে কি খেলোয়াড়রা এসব মানবিক আচরণও বন্ধ করে দেবে? এতে যেমন ঘৃণা ছড়ায়, তেমনি খেলাটার বিশেষত্ব নষ্ট হয়ে যায়।’
টুর্নামেন্টের ফাইনাল হয়ে গেলেও বিতর্ক থামেনি। ভারত চ্যাম্পিয়ন হলেও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি মহসীন নাকভি পাকিস্তানি হওয়ায় তাঁর কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভিও নিজ দাবিতে অনড় থাকেন। ফলে ট্রফি ছাড়াই শেষ পর্যন্ত উদযাপন করে ভারত। আর সেই ট্রফি এখনো হাতে পায়নি। আইসিসি ও এসিসির মধ্যে এ নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও বিষয়টি সমাধান হয়নি। বিসিসিআই ট্রফি ভারতে পাঠানোর অনুরোধ করলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন নাকভি।
সেতু থেকে বিভাজন:
পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আগে থেকেই বৈরী হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তুলনামূলক মসৃণ ছিল। রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যেও দ্বিপাক্ষিক সিরিজ চলেছে, আর আইপিএলেও নিয়মিত দেখা গেছে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের। মোস্তাফিজ ইস্যু যেন সেই মসৃণ সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিল।
অথচ এক সময় ক্রিকেট ছিল রাজনৈতিক বৈরিতা কমানোর হাতিয়ার। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হতে পারে ২০০৪ সালে ভারতের পাকিস্তান সফর। ওই সফরে দুদল ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’ খেলেছিল।
অথচ ওই সিরিজের আগে ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক স্থবির ছিল। এরপর ২০২৪ সালের ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ খেলতে পাকিস্তানে গেলেন ভারতের ক্রিকেটাররা। ওই সফরের আগে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ভারতের সেই সময়ের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীর হাতে একটি ব্যাট তুলে দেন। ওই ব্যাটে লেখা ছিল: ‘খেল হি নাহি, দিল ভি জিতিয়ে’। অর্থাৎ, ‘শুধু ম্যাচ জেতো না, মনও জেতো’।
শুধু যে ক্রিকেটাররা পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, এমন নয়। বহু ভারতীয় সমর্থকও সিরিজ দেখতে বিশেষ ভিসায় পাকিস্তান যান। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ প্রকাশ্যে ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রশংসা করেছিলেন।
সেই থেকে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই এগোচ্ছিল। তবে ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর সেই সম্পর্ক আবারও তলানিতে ঠেকে। এর মধ্যেও ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পাকিস্তানের ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আমন্ত্রণ জানান। দুই প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসে ম্যাচটি দেখেছিলেন। এটিকে ‘ক্রিকেট কূটনীতি’র অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
সম্প্রতি মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা সেটাকে ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করাকে বিশ্লেষকরা বিসিসিআইয়ের একটা স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন। আর সে বার্তাটা হচ্ছে, ‘ভারতীয় ক্রিকেটে প্রবেশাধিকার শর্তসাপেক্ষ।’