মঞ্জুর শাস্তিতে সন্তুষ্ট নন জাহানারা, ক্ষোভ জানিয়ে করলেন ৩ অনুরোধ

জাতীয় দলে খেলার সময় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ তুলেছিলেন জাহানারা আলম। তাঁর অভিযোগটা ছিল নারী দলের সাবেক নির্বাচক ও সাবেক ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগ তোলপাড় সৃষ্টি করলে বিষয়টি আমলে নেয় বিসিবি। পরে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শাস্তি হিসেবে মঞ্জুকে বিসিবির যেকোনো কাজের জন্য আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়। 

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বিসিবি মঞ্জুকে এই শাস্তি দিলেও এতদিন বিষয়টি নিয়ে চুপচাপ ছিলেন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের পেসার জাহানারা। অবশেষে গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তিনি। মঞ্জুকে দেওয়া শাস্তিকে সামান্য হিসেবে উল্লেখ করে অসন্তোষ জানান জাহানারা। মঞ্জুর সহযোগীদের শাস্তি দাবির পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে নতুন তিনটি অনুরোধ করেছেন নারী দলের এ পেসার।

ভিডিও বার্তায় জাহানারা বলেছেন, ‘আসসালামু আলাইকুম, আমি ক্রিকেটার জাহানারা আলম। মাননীয় (যুব ও) ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভাইয়া, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমি আজ আপনার কাছে তিনটি অনুরোধ নিয়ে এসেছি। দয়া করে আমার অনুরোধগুলো বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করছি। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, আমার সাথে ঘটা যৌন হয়রানির ইস্যুতে সম্প্রতি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তের রিপোর্টে মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তিস্বরূপ তাকে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করে। এমনকি তারা বাংলাদেশের একটি ল ফার্ম মাহাবুব এন্ড কোম্পানিকে হায়ার করে এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় আমাকে সাপোর্ট করে। আমি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে সাপোর্ট করার জন্য, আমার পাশে থাকার জন্য। আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি, তারা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন মিস্টার মঞ্জুকে শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু আমি খুশি হতে পারছি না। আমার সাথে যা যা হয়েছে, যা যা আমি মোকাবেলা করেছি, সেই তুলনায় এই শাস্তি খুব সামান্য মনে হয়েছে আমার কাছে। আমি আরও বড় শাস্তি আশা করেছিলাম।’

জাহানারা আরও বলেন, ‘শুধু ক্রিকেট অঙ্গনের কথা বিবেচনা করলে আমার মতো হাজারো জাহানারা পৃথিবীর অসংখ্য দলে আছে। আমি জাহানারা মঞ্জুর হাত থেকে ছাড় পাইনি। ওই জাহানারারাও এই মঞ্জুর হাত থেকে ছাড় পাবে বলে আমি মনে করি না। ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত মিস্টার তৌহিদ মাহমুদ এবং মিস্টার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু এই দুইজনের কুপ্রস্তাবে আমি রাজি হই নাই দেখে, এই দুজনসহ এবং তাদের একটি সহযোগী গ্রুপ, চার বছর ধরে আমাকে চরম লেভেলের মেন্টাল টর্চার, মেন্টাল অ্যাবিউস করেছে, সব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে এবং আমাকে চরম লেভেলের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মিস্টার তৌহিদ তো মারা গেছে, মিস্টার মঞ্জুর সামান্য শাস্তি হয়েছে। তবে তাদের সহযোগী গ্রুপের কোনো বিচারও হয়নি শাস্তিও হয়নি।’

জাহানারা আরও বলেছেন, ‘২০২৩ সালে বিশ্বকাপ থেকে যখন আমরা দেশে ফিরি, ফিক্সিংয়ের একটা ইস্যু ছিল। মিস্টার মঞ্জু আরও কয়েক মাস নারী উইংয়ের সাথে চুক্তি থাকে। অজ্ঞাত কারণে নারী উইং থেকে বাংলাদেশ টাইগার্সে তাকে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়। কোনো কারণ ছাড়া, আমি জানি না কী কারণ ছিল। সে নারী উইং থেকে চলে যাওয়ার পর, তার সেই গ্রুপ, আমি দলে ফেরার পর ৬ মাস আমাকে নির্যাতন করে। আমার প্রথম অনুরোধ মঞ্জু এবং তার সহযোগী গ্রুপের কঠিন থেকে কঠিন বিচার চাই। দয়া করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করুন।’

জাহানারার অভিযোগের ভিত্তিতে মঞ্জুকে শাস্তি দেওয়ায় সম্প্রতি মন্তব্য করেন জাতীয় দলের সাবেক স্পিনার আবদুর রাজ্জাক। সেই মন্তব্যে আপত্তি জানিয়ে জাহানারা বলেছেন, ‘আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে নারী উইংয়ের অভিভাবক তখনকার চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক ভাই, কোনো যাচাইবাছাই না করে মন্তব্য করে বসলেন, আমি নাকি বাইরের লোক। আমি যা বলেছি সব ভিত্তিহীন। রাজ্জাক ভাইয়ের জানা উচিত ছিল, আমি দল থেকে বাদও পড়িনি, আমি অবসরও নেইনি। আমি মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে ছুটিতে আছি। নিজের মাতৃভূমি থেকে নিজের প্রিয় ক্রিকেট থেকে অনেক দূরে আছি। এই আবদুর রাজ্জাক ভাই, সহ-সভাপতি ছিলেন নারী উইংয়ের, তিনি মন্তব্য করেন তার ভাই মঞ্জুর নাকি অনেক বড় শাস্তি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। মঞ্জু নাকি এত বড় শাস্তি ডিজার্ভ করে না। নারী ক্রিকেটাররা নাকি সমঝোতা করে ক্রিকেট খেলেন। আমার প্রশ্ন, রাজ্জাক ভাই, আপনি একটা মায়ের সন্তান, আপনার স্ত্রী একজন নারী। আপনার মেয়ে আছে কিনা আমি জানি না। আপনার অবশ্যই বোনরা আছে। আজকে যদি আপনার বোন, মেয়ে, স্ত্রীরা ক্রিকেট খেলত, আপনি কি এই নোংরা মন্তব্য করতেন? আমার মানতে কষ্ট হয় আপনি একজন ক্রিকেটার ছিলেন, বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, আপনি একজন নারীর সন্তান। আমরা শুধু নারী ক্রিকেটাররা না, এমন অনেক সাপোর্ট স্টাফ আছেন, কুপ্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে অনেককে বছরের পর বছর ধরে সাইড অফ করে দেওয়া হয়েছে।’

জাহানারা আরও বলেন, ‘আমার দ্বিতীয় অনুরোধ আপনার কাছে মাননীয় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, আমি কথা বলেছি দেখে আমার যে বোনেরা সাহস পেয়ে, ক্রিকেটসহ অন্যান্য ইভেন্টের আমার বোনেরা যে যে তাদের অভিযোগগুলো মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সবগুলোর বিচারের ব্যবস্থা করেন। বিচার না করলে তারা কোনো দিন আর নিজেদের জায়গায় ফিরতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, আমি সিইও (নিজামউদ্দীন চৌধুরী) সুজন স্যার থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি, সেই চার বছরে। উনি উনার সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করেছেন। উনি সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। ২০২১ এর জুলাইয়ে আমি হাতে লেখা অবজারভেশন নোট সিইও বরাবর দেই, শাস্তি হিসেবে পরের টুর্নামেন্টেই আমাকে বাদ দেওয়া হয়। আমাকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ আমি নোট দিয়েছি। আমি ভয় পেয়ে যাই, আমি আর কথাই বলি নাই। বিচারের ব্যবস্থা না করলে আমাদের বোনেরা কেউ আর ফিরতে পারবে না।’

ভিডিও বার্তার শেষ দিকে জাহানারা বলেছেন, ‘তৃতীয় অনুরোধ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্যারের কাছে, প্রধানমন্ত্রী এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে আমি অনুরোধ জানাই, সম্প্রতি আপনার ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি মহানুভবতা দেখেছি, আমি সাহস পেয়েছি। ক্রীড়াঙ্গনে নারী এবং শিশুদের জন্য একটা সেইফগার্ডিং পলিসির ব্যবস্থার করে দিন। তাহলে এই নোংরা মানুষগুলো মুখ দিয়ে কুপ্রস্তাব দেওয়া তো দূরে থাক, মেয়েদের দিকে নোংরাভাবে তাকানোরও সুযোগ পাবে না। আঙুল টাচ করে যদি স্কিল শো করতে হয়, তাতেও যেন অনুমতি নিয়ে করতে হয়, যেটা অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মত উন্নত দেশে আছে। যদি তাদের অন্যায় প্রমাণিত হয়, তাহলে বড় রকমের আর্থিক জরিমানাসহ কঠিন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে যেন তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে করে অনেক নারী ক্ষমতাবানরাও অসহায় নারীদের প্রতি তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারবে না, তারাও শুধরে যাবে আমার মনে হয়। দয়া করে আমি হাতজোড় করছি আপনাদের কাছে, দয়া করে আমাদের বাঁচান। নারীদের জন্য ক্রীড়াঙ্গনে নিরাপদ পরিবেশের ব্যবস্থা করে দিন। আমরা যাতে সুন্দরভাবে মেধার প্রকৃত বিকাশ ঘটিয়ে নির্ভয়ে আমাদের দেশের জন্য অবদান রাখতে পারি।’