ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সময়টা খুব একটা ভালো কাটছে না - এটা নতুন করে বলার কিছু নয়। সেই ২০১৩ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অবসরের পর থেকেই মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু ঝলক বাদ দিলে তো ম্যান ইউনাইটেডের এই দশাই চলছে।
কেউ বলেন, অ্যালেক্স ফার্গুসনের অবসরের পর থেকেই তাঁর জুতোয় পা গলানোর মতো কাউকে পায়নি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আবার কারও বিশ্লেষণ, ক্লাবে তাঁর ২৬ বছরের রাজত্বে অ্যালেক্স ফার্গুসন ক্লাবটার প্রায় সবকিছুতেই এত বেশি দখল রেখেছিলেন যে, তাঁর অবসরের পর থেকে যত কোচই ম্যান ইউনাইটেডের কোচ হয়েছেন, ক্লাবের কাঠামো আর অভ্যন্তরীন রাজনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের। লুই ফন হাল, জোসে মরিনিওর মতো বাঘা বাঘা কোচই 'গেলেন তল', সেখানে ডেভিড ময়েস, উলে গুনার সুলশারদের মতো কোচদের 'কত জল' তো বলারই কথা।
এরিক টেন হাগ ক্লাবটার কোচ হওয়ার পর সব বদলে দেওয়ার গান শুরু হয়েছিল। গত মৌসুমে সাফল্যও এসেছিল। কিন্তু এক মৌসুম পরই আবার টেন হাগকে নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ম্যান ইউনাইটেডের মাঠের পারফরম্যান্সও আজ ভালো তো কাল খারাপ।
এমন অবস্থায় অপ্রীতিকর কিছু কারণেও ম্যান ইউনাইটেড সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। আজই যেমন, ম্যান ইউনাইটেড খবরে এল চারটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিককে ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে নিষিদ্ধ করে। বেশ পরিচিত ও প্রভাবশালী চারটি সংবাদমাধ্যমই সেগুলো - ইংল্যান্ডের স্কাই স্পোর্টস, ইএসপিএন, ম্যানচেস্টারের দুই ক্লাব ইউনাইটেড ও সিটির খবরের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ আর ডেইলি মিরর। তাদের 'অপরাধ', তারা এরিক টেন হাগকে জড়িয়ে নেতিবাচক খবর লিখেছে!
এই চার সংবাদমাধ্যমের খবর ছিল, ম্যান ইউনাইটেডের ড্রেসিংরুমের অনেক খেলোয়াড়ই এরিক টেন হাগের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হচ্ছেন। গত শনিবার লিগে নিউক্যাসলের কাছে ম্যান ইউনাইটেডের ১-০ গোলে হারের পর এই 'বিপ্লব' নাকি জোর পেয়েছে। ওই হারটা ছিল মৌসুমে সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ম্যান ইউনাইটেডের দশম হার, ১৯৭৩-৭৪ মৌসুমের পর আর কখনো কোনো মৌসুমে এত তাড়াতাড়ি দশ ম্যাচে হার দেখেনি ম্যান ইউনাইটেড।
কিন্তু ওই চার সংবাদমাধ্যমের এমন খবর দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে ম্যান ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। আগামীকাল বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৫ মিনিটে লিগে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পয়েন্ট তালিকার ৭ নম্বরে থাকা ম্যান ইউনাইটেডের - পয়েন্ট তালিকার দশ নম্বরে থাকা চেলসির সঙ্গে। তার আগে আজ মঙ্গলবার ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে ওই চার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ম্যান ইউনাইটেড।
কী লিখেছিল সংবাদমাধ্যমগুলো?
ডেইলি মিরর ও স্কাই স্পোর্টস প্রতিবেদনে লিখেছিল, ম্যান ইউনাইটেডের অনেক খেলোয়াড়ই টেন হাগের ওপর চাপ তৈরি করছেন যাতে জেডন সানচোকে দলে ফেরানো হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে দলে সুযোগ না পাওয়ার পর কোচের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন সানচো, তখন থেকেই 'দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের' অভিযোগে ইংলিশ প্লেমেকারকে ক্লাবের অনুশীলন ও ম্যাচে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ রেখেছেন নিয়মের ব্যাপারে সব সময় কড়াকড়ি রাখা টেন হাগ।
ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ লিখেছে, টেন হাগের কৌশল এবং দলে খেলোয়াড় কেনায় তাঁর বিবেচনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ম্যান ইউনাইটেডের অনেক খেলোয়াড়।
ইএসপিএনের প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ক্লাবের খেলোয়াড়দের 'সমর্থন পেতে লড়ছেন' টেন হাগ।
খুব বেশি যে প্রশ্নবোধক প্রতিবেদন এমন নয়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত সংবাদমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার নৈতিকতা মেনে কোনো সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এমন প্রতিবেদন করার কথা নয়। স্বাভাবিকভাবেই, সূত্রের সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখে তথ্য প্রদানকারী সূত্রের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়। কিন্তু ম্যান ইউনাইটেড এসব প্রতিবেদন নিয়ে খেপেছে। কারণ, ক্লাব কর্তৃপক্ষের দাবি, সাংবাদিকতার নীতি মেনে এসব ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার কথা থাকলেও এই চার সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে তা করেনি।
ম্যান ইউনাইটেডের এক মুখপাত্র বলেছেন, 'আমরা কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এমন নয় যে তারা যেসব প্রতিবেদন ছেপেছে সেগুলো আমাদের ভালো লাগেনি বলে এমন সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ তারা প্রতিবেদনগুলো ছেপে দেওয়ার আগে আমাদের এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করার, এমন অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কিংবা অভিযোগের বিপরীতে আসল পরিস্থিতিটা তুলে ধরার কোনো সুযোগ দেয়নি। আমাদের মনে হয়েছে, এই নীতিটার (সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ক্লাবের কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া) দিক থেকে আমাদের শক্ত থাকা উচিত। আমরা আশা করি, আমাদের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আমরা (ক্লাব ও সংবাদমাধ্যম) একসঙ্গে কীভাবে কাজ করতে পারি সে প্রক্রিয়াটাকে ঠিক পথে নিয়ে আসবে।'
মাঠের বাইরে জবাব তো দেওয়া হলো, এবার মাঠে জবাব না দিতে পারলে হয়তো আরও অনেক সংবাদমাধ্যমেই নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হবে ম্যান ইউনাইটেড ও এরিক টেন হাগ। আপাতত তাই চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে ভালো কিছু করে দেখানোই ইউনাইটেডের বেশি দরকার। সে ক্ষেত্রে অবশ্য ম্যান ইউনাইটেড ভক্তদের জন্য শঙ্কা বাড়ানোর মতো তথ্য - মৌসুমে এখন পর্যন্ত লিগের পয়েন্ট তালিকায় প্রথম দশের মধ্যে থাকা কোনো দলকে হারাতে পারেনি ম্যান ইউনাইটেড। চ্যাম্পিয়নস লিগে তো গ্রুপ পর্ব পেরোনোর সম্ভাবনা সুতোয় ঝুলছে - গ্রুপের শেষ ম্যাচে বায়ার্ন মিউনিখের মাঠে জিতলেও ম্যান ইউনাইটেডের গ্রুপ পর্ব পেরোনো নিশ্চিত নয়, তাই লিগই এখন বড় ভরসা এরিক টেন হাগের। চেলসির বিপক্ষে নামার আগে লিগে ইউনাইটেডের করুণ দশা বোঝানো তথ্যটা হলো, শীর্ষে থাকা আর্সেনালের চেয়ে ৯ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে ইউনাইটেড (১৪ ম্যাচে ৮ জয়, ৬ হারে ২৪ পয়েন্ট)।