ম্যাচের শেষ দিকে একটি পেনাল্টির জোরালো আবেদন করেছিল লিভারপুল। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতেও সেটা পেনাল্টি বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু ভিএআর নাক গলাল না। প্রিমিয়ার লিগের রেফারিং, বিশেষ করে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিং নিয়ে চলা বিতর্ক আরও উসকে দেওয়া সিদ্ধান্তে ১-১ সমতায় শেষ হয়েছে লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটির ম্যাচ।
দুই দলের পয়েন্ট ভাগাভাগিতে লাভ হয়েছে আর্সেনালের। গোল ব্যবধানে লিগের শীর্ষে এখন আর্সেনাল। সমান পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে আছে লিভারপুল। ১ পয়েন্ট পিছিয়ে তিনে সিটি।
প্রথমার্ধে কেভিন দি ব্রুইনার দুর্দান্ত এক বুদ্ধি সিটিকে এগিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আবার এদেরসেনের সুবাদে পেনাল্টি পেয়ে লিভারপুলকে ম্যাচে ফিরিয়েছেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শেষ মুহূর্তের ওই পেনাল্টির আবেদন।
বক্সের মধ্যে ম্যাক অ্যালিস্টারের বুকে জেরেমি ডোকুর বুট আঘাত হানে। মাঠের যেকোনো প্রান্তেই সেটা ফাউল। কিন্তু কোনো কারণে ভিএআরের দায়িত্বে থাকা রেফারির সেটা মনে হয়নি। ম্যাচ শেষে ক্ষিপ্ত ক্লপ বলেছেন, ‘শতভাগ নিশ্চিত এটা পেনাল্টি ছিল। ওরা ঠিকই কোনো না কোনো ব্যাখ্যা তুলে আনবে। মাঠের যেকোনো প্রান্তে এটা শতভাগ ফাউল এবং হলুদ কার্ডের যোগ্য। আমার পাশে আইপ্যাড হাতে থাকা সবাই বলেছে, “পরিষ্কার পেনাল্টি।” তবে ওরা (ভিএআরের দায়িত্বপ্রাপ্তরা) দাবি করবে এটা পরিষ্কার না।’
একদিক থেকে এই ম্যাচ সমতায় শেষ হওয়া হয়তো ‘পোয়েটিক জাস্টিস’। গত আট বছর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগকে অন্য মাত্রা দিয়েছে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা- লিগে ইয়ুর্গেন ক্লপ ও পেপ গার্দিওলার অন্তিম লড়াইটা হয়তো সমতাতেই শেষ হওয়া উচিত ছিল।
ক্লপ ও গার্দিওলার লড়াইয়ে সবসময় যা হয়েছে, ম্যাচপূর্ব পরিস্থিতি এবারও অভিন্ন ছিল। একদিকে অর্থের ঝনঝনানি আর ঈর্ষা জাগানো এক স্কোয়াড নিয়ে ক্ষুরধার গার্দিওলা, ওদিকে নামেভারে সিটির চেয়ে অনেক বড় এক দল হলেও স্কোয়াডের শক্তিতে বেশ পিছিয়ে থাকা লিভারপুলকে নিজের ব্যক্তিত্ব ও কৌশল দিয়ে ‘মোর দ্যান দ্য সাম অব ইটস পার্টস’ করে তোলা ক্লপ। তাই শিরোপা সংখ্যায় গার্দিওলা যত এগিয়ে থাকুন, এই দ্বৈরথের শ্রেষ্ঠত্বের মীমাংসা হয়নি কখনো।
চোটের কারণে মো সালাহ, আলিসন, ট্রেন্ট আলেকজান্ডার আরনল্ডের মতো মূল খেলোয়াড়দের পাননি ক্লপ। ওদিকে গার্দিওলার মূল স্কোয়াড শুধু পূর্ণ সুস্থ নয়; ১০ কোটির গ্রিলিশ, বিশ্বের দামি ডিফেন্ডার গাভারদিওল, জেরেমি ডোকুর মতো উইঙ্গারদের বেঞ্চে রাখার মতো বিলাসিতা দেখাতে পেরেছেন গার্দিওলা। কিন্তু ম্যাচ শুরু হতেই তা মনে রাখার কোনো উপায় ছিল না।
গতকাল ম্যাচেও যেমন দেখা গেল দুই মাস্টারমাইন্ডের লড়াই। ম্যাচের শুরু থেকে সিটির প্রেসিং ফুটবলে অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল স্বাগতিক দল। এর জবাবে প্রথম ১৫ মিনিট শুধু লং বল খেলার চেষ্টা করেছে লিভারপুল। বারবার ডান প্রান্ত দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছে সিটি। একটু পর ক্লপ পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন আনেন। চোটজর্জর দলের হয়ে শুধু হার্ভি এলিয়টই একটু প্রাণ ছড়াচ্ছিলেন। তাই ডান প্রান্ত ব্যবহার করে আক্রমণ লিভারপুলও শুরু করে। কিন্তু দারউইন নুনিয়েস ও লুইস দিয়াসের কারণে গোলে শট পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছিল না অলরেডদের।
এর মধ্যে ২৩ মিনিটে যা হলো, সেটা যেন অনুশীলন মাঠের স্ক্রিপ্টকে মাঠে নামিয়ে আনলেন গার্দিওলা ও দি ব্রুইনা। কর্নার পেয়েছিল সিটি। কাছে পোস্টে থাকা নাথান আকে সঙ্গে লেগে থাকা ম্যাকঅ্যালিস্টারকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেন। গোলকিপারের সামনে আচমকা ফাঁকা জায়গা সৃষ্টি হয়। ওদিকে একটু পিছিয়ে থাকা স্টোনস হতবিহ্বল নুনিয়েসকে পেছনে ফেলে চলে যান সামনে । আর দি ব্রুইনাও বাতাসে বল ভাসানোর কোনো চেষ্টায় না গিয়ে গোল লাইন ঘেঁষে পাস দেন। স্টোনসকে শুধু বলে পা লাগাতে হয়েছে।
সিটির ডিফেন্ডার যা করেছেন, সেটাই অবশ্য করতে পারছিলেন না লিভারপুলের ফরোয়ার্ড ও মিডফিল্ডাররা। দারুণ গতিতে আক্রমণে উঠে এরপর খেই হারিয়ে ফেলছিলেন দিয়াস ও নুনিয়েস। সবোসলাই বক্সে খালি জায়গা পেয়েও ভালোভাবে হেড নিতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণে এগিয়ে ছিল লিভারপুল। কিন্তু অন্যপ্রান্তে যেখানে আর্লিং হলান্ড ও ইউলিয়ান আলভারেসরা পর্যাপ্ত বলের জোগানের অভাবে ভুগছিলেন, এই প্রান্তে দিয়াস-নুনিয়েসরা মেতে উঠেছিলেন সুযোগ হাতছাড়া করার খেলায়। মৌসুমের শুরুর দুর্দান্ত নুনিয়েস আবার হারিয়ে গেছেন। গোলে শট নেওয়া বা পাসিংয়ে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাসের অভাব নুনিয়েসের। আর দিয়াসকে দেখে মনে হচ্ছিল, দুই মাস আগে ঘটা পারিবারিক বিপর্যয় এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
পুরো ম্যাচে সিটি যেখানে ১০টি শট নিয়েছে, সেখানে লিভারপুল দ্বিতীয়ার্ধেই নিয়েছে ১২ শট। কিন্তু সে শটগুলো তো গোল আদায়ের মতো হতে হবে! সে সঙ্গে পেনাল্টি বিতর্ক তো আছেই। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের স্মরণকালের সেরা দ্বৈরথের শেষটাও তাই হয়েছে সমতায়।