শেষ বাঁশি বাজানোর পরই হয়তো আবেগটা দলা পাকিয়ে গেল। মেঘও তো একটা সময় বৃষ্টি হয়ে ঝরে যায়, আবেগও এ বেলায় বনে গেল মেঘের ধর্মের অনুসারী। চোখ ভেঙে আসতে চাইছিল বুঝি! ছোট্ট শিশুর মতো দুই হাতে চোখ কচলানো শুরু হয়ে গেল। চোখটা এত পোড়ায় কেন…!
ওদিকে এমবাপ্পে-দেম্বেলেরা শোকে মূহ্যমান। হওয়ারই কথা। এত বছরের চেষ্টার পর, এত কোটি কোটি ডলার ঢেলেও চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপামঞ্চের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা বানিয়ে নিতে পারেনি পিএসজির কাতারি মালিকপক্ষ। এবারে অপেক্ষাকৃত তরুণ দল নিয়েই সেদিকে ছুটছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু আর পারল না, সেমিফাইনালে হেরে গেল এমবাপ্পের পিএসজি। আরেকদিকে - ‘আবেগ’ মুদ্রার ভিন্ন পিঠে - ডর্টমুন্ড উল্লাসে বাঁধনহারা। তা-ও হওয়ারই কথা! যাঁদের গোনায়ই ধরেনি ইউরোপ, তারাই যে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের বিচারের শেষ মঞ্চে!
ভিন্নমুখী দুই আবেগের মাঝে মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি। হাতের বাঁশিটা তখনো ডানহাতে ধরা। তা নিয়েই চোখ কচলে চলেছেন। কিন্তু জল যে বাঁধ মানতে চায় না! পোড়া চোখ, বেয়াড়া জল!
মূহুর্তটা যেন তাঁর জন্য একই জায়গায় আটকে আছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে যে মুহূর্তটা থাকে, সেটাই আর কী! যা হচ্ছে, তা কী আসলেই সত্যি? আসলেই সব শেষ?
মাঠে লড়তে থাকা দুই দলের মধ্যে নিরপেক্ষ থেকে সব নিয়ন্ত্রণের ভার সামলেছেন নব্বই মিনিট। সেটা শেষ হলো যখন, দুই দল যখন ভিন্নধর্মী দুই আবেগে ভেসে চলেছে, তিনিও ভেসে গেলেন আবেগের তৃতীয় ধারায়। সেখানে তাঁর সঙ্গী নেই। এ যে চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর শেষ ম্যাচ!
রেফারি: দানিয়েলে ওরসাতো – এই লেখাটুকু চ্যাম্পিয়নস লিগের আর কোনো ম্যাচ দেখবে না!
মানুষ নাকি অতীতেই বাঁচে। হয়তো সত্যি। না হলে বিদায়ে এত মন খারাপ কেন হবে! হয়তো বিদায়বেলায় অতীতের সবটুকু আবেগ ঘিরে ধরে। বলে, যেও না! ভবিষ্যতের শূন্যতাও প্রশ্ন হয়ে এসে বলে – এরপর কী করবি রে তুই বোকা! অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝে বর্তমানের ওই মুহুর্তটাতে তখন দাঁড়িয়ে তিনি। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছেন। আর কাঁদছেন।
কিছুক্ষণ পর দুই সহকারী রেফারি এসে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। আলিঙ্গনে বাঁধা থাকতে থাকতেই দুই সহকারীর কপালে বিদায়ী চুমু এঁকে দিলেন।
পিএসজি আর ডর্টমুন্ডের ম্যাচের শেষে টিভি ক্যামেরা তাঁকে খুঁজে নিতেই হয়তো প্রশ্নটা জেগেছে অনেক ফুটবলপ্রেমীর। রেফারি কেন কাঁদছেন? কারণ ওটুকুই – চ্যাম্পিয়নস লিগে এটাই তাঁর শেষ ম্যাচ। মেসি-রোনালদো-নেইমার-এমবাপ্পেদের বছরের পর বছর শত ম্যাচে নিয়ন্ত্রণে রাখা বাঁশিটা ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে আর উঠবে না ইতালিয়ান রেফারির হাতে।
২০১০ সালে ফিফার রেফারি হয়েছিলেন, এরপর থেকে দ্রুতপায়ে এগিয়ে চলা রেফারিং ক্যারিয়ারে কত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচই তো বশে রেখেছে তাঁর বাঁশির আওয়াজ। ২০২০ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে, যেখানে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে গেল নেইমার-এমবাপ্পের পিএসজি, সে ম্যাচের রেফারি ছিলেন ওরসাতো। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়ার সেমিফাইনালের দায়িত্বও সামলেছেন। ২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিকটিক্সের (আইএফএফএইচএস) এর বর্ষসেরা রেফারিও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বয়স হয়ে গেছে ৪৮, এ বেলায় এসে তাঁর পা জোড়ার হয়তো মনে হলো, বিশ্রাম দরকার। ইতালিয়ান লিগে এ মৌসুমে নিয়মিত রেফারিং করে চলা ওরসাতো অবশ্য একেবারেই আড়ালে যাওয়ার আগে আরেকবার বড় মঞ্চে বাঁশি বাজাবেন। জুনেই ইউরো আছে না!
সেটাই শেষ! সেখান থেকে বিদায়ের দিনে হয়তো আরেকবার চোখগুলো পোড়াবে ওরসাতোর। হয়তো বৃষ্টি হয়ে ঝরবে আবেগ। ওই বৃষ্টি মিলিমিটারে মাপা যায় না।