আলিঙ্গনে জড়ানো ভার্জিল ফন ডাইক পারলে মুখটা ইয়ুর্গেন ক্লপের বুকে লুকিয়ে ফেলেন। যেন পিতৃস্নেহে বাঁধা কোনো পুত্রের বিদায়বেদনা। মুখ লুকালেন, যাতে ক্যামেরায় চোখের জল ধরা না পড়ে।
ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ডের ক্যামেরায় কী ধরা পড়ল না পড়ল সে নিয়ে অত তোয়াক্কা থাকল না। গ্যালারির ‘কপ এন্ডে’র সামনে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পুরো দল যখন মৌসুমে শেষবারের মতো সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছিল, ট্রেন্টের আবেগ ঝরল চোখ বেয়ে। প্রতিটি ফোঁটা অনুচ্চারে বলে গেল ক্লপের জন্য তাঁর ভালোবাসার কথা। ক্লপের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার কথা।
আর তিনি? মনে কী চলছে, তা বুঝতে না দিয়ে দন্তবিকশিত হাসিতে সব মাতিয়ে রেখেছেন। তিনি কোথাও থাকবেন আর সেখানে বিষণ্ণতারও জায়গা থাকবে, তা হয় নাকি! হোক না সেটা তাঁরই বিদায়ের ক্ষণ!
একবার হেঁড়ে গলায় গাইছেন, তো কখনো ছুটোছুটি করছেন। তার কিছুক্ষণ আগে তাঁর জন্য তৈরি করা গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে একবার হেঁটে গিয়েও আবার ছুটে গিয়ে দাঁড়ালেন স্টার্টিং পয়েন্টে – আরেকবার হাঁটবেন। শিশুতোষ খুনসুটি!
বিদায়ে হাসলেন তিনি, কাঁদল সবাই।
ইয়ুর্গেন ক্লপ: কোচ, লিভারপুল ফুটবল ক্লাব… লেখাগুলো গতকাল রাতের পর থেকেই হয়ে গেল ইতিহাস।
চলে যে যাবেন, সে তো জানুয়ারির শেষ শুক্রবারের বিষাদ ছড়ানো বিকেলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারির শেষে মার্চেরও মাঝামাঝি যখন এল, ততদিনে লিগ কাপ জিতে ফেলা লিভারপুল মৌসুমে লড়তে থাকা চার শিরোপার সবই জেতার স্বপ্নে বিভোর। ক্লপ যাবেনই যখন, বিদায়বেলায় সব জিতে গেলে কী দারুণ সমাপ্তিই না হতো! সালাহ-জোতা-ট্রেন্ট-রবার্টসন-থিয়াগোদের একের পর এক চোট সয়েও লিভারপুল তখন একের পর এক ম্যাচে একাডেমির খেলোয়াড়দের নামিয়ে দিব্যি জিতে চলেছে। ক্লপকে শিরোপা চতুষ্টয়ে ভাসানোর বিশ্বাসটা অ্যানফিল্ডে তখন জোরাল।
কিন্তু হলো না। ক্লপের ক্যারিয়ারের গল্পের মতোই, দারুণ ছুটতে ছুটতেও হোঁচট খেয়ে অল্প পেয়ে সন্তুষ্ট থাকার গল্পেই শেষ হলো তাঁর লিভারপুল-অধ্যায়। এমন নয় যে লিভারপুল খারাপ খেলেছে। কিন্তু সালাহ-নুনিয়েস-দিয়াসরা হঠাৎ কীভাবে যেন মৌসুমের শেষভাগে এসে গোলের রাস্তাটা ভুলে গেলেন! লিভারপুলে ক্লপের ফিনিশিংটা সুন্দর হলো না সালাহদের ফিনিশিংয়ের অবিশ্বাস্য দুর্বলতায়।
মার্চে এফএ কাপ ছুটে গেল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে হেরে, কদিন পর ইউরোপা লিগে বিধ্বস্ত করে গেল আতালান্তা। জোড়া ধাক্কা খাওয়া লিভারপুল এরপর লিগেও ম্যান ইউনাইটেডের কাছে পয়েন্ট হারিয়ে লিগের শীর্ষস্থান হারাল, তারপর তো ক্রিস্টাল প্যালেস আর এভারটনের কাছে হেরে ছিটকেই গেল দৌড় থেকে। তেমন কিছুই না পেয়ে চলে গেলেন ক্লপ।
শেষ পর্যন্ত তাঁর নামের পাশে শুধু একটা লিগ, একটা চ্যাম্পিয়নস লিগ। সঙ্গে একটা করে ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ, এফএ কাপ আর দুটি লিগ কাপ। সর্বজয়ী ঠিকই, কিন্তু সর্বব্যাপী নয় তাঁর জয়ের গল্প। বরং লিভারপুলে ক্লপের নয় বছরের গল্পে বারেবারে দীর্ঘশ্বাস জাগাবে এক পয়েন্টের জন্য দুবার আবুধাবির পেট্রোডলারে ধন্য ম্যানচেস্টার সিটির কাছে লিগ হারানো, রেয়াল মাদ্রিদের কাছে দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে হার। আহা, একটু এদিক-ওদিক হলেই কত কিছুই না হতে পারত!
তবে ক্লপ এমনই একজন, শুধু শিরোপা দিয়ে যাঁকে বিচার করতে যাওয়া ভুল। মাইন্স হয়ে শুরু কোচিং ক্যারিয়ারে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের পর লিভারপুল – জার্মান ভদ্রলোকের কোচিং ক্যারিয়ারই যে ঝিমিয়ে পড়া ক্লাবগুলোতে প্রাণ ছোঁয়ানোর এক আবেগঝরা উপন্যাস। এ তো আর ডেভিড-গোলিয়াথের পৌরানিক গল্প নয় যে ডেভিডই জিতবে! বাস্তবের এই গল্পে পতনই বেশি থাকার কথা, থেকেছেও। কিন্তু ক্লপ বলেই এখানে উত্থান থাকে অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি।
সে কারণেই হয়তো, কোচিং ম্যানুয়েলে পেপ গার্দিওলা, জোসে মরিনিও, অ্যালেক্স ফার্গুসন, কার্লো আনচেলত্তিদের পেছনেই থাকলেও ক্লপ বিশেষ একজন। সে কারণেই হয়তো, অজ্ঞাতকুলশীল মাইন্স থেকে বিদায়ের সময়ে কেঁদে বুক ভাসান, কাঁদে পুরো মাইন্স। ডর্টমুন্ডে তাঁর বিদায়ের ছবিতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে গ্যালারির লাখো জোড়া চোখের জল। লিভারপুলে গতকাল কান্নাকাটি একেবারে মাইন্স-ডর্টমুন্ডের মতো হয়নি, হয়তো ক্লপ হতে দেননি বলেই।
মাইন্স-ডর্টমুন্ড ছেড়েছিলেন ক্লাবগুলোকে তাঁর আর দেওয়ার কিছু নেই ভেবে, লিভারপুল ছাড়ার কারণ তো ভিন্ন। এখানে লিভারপুলে তাঁর অধীনে প্রথম প্রজন্মের দলের বিদায়ের পর নুনিয়েস-দিয়াস-সোবোসলাই-ম্যাকঅ্যালিস্টারদের নিয়ে তাঁর স্বপ্নের ‘লিভারপুল ২.০’ গড়ার প্রক্রিয়ার শুরুটা করে দিয়েছেন ক্লপ। কিন্তু এ বেলায় তাঁর নিজেরই শরীর আর সায় দিচ্ছে না। ক্লান্তি জেঁকে বসেছে ৫৭ বছর বয়সী শরীরটাতে।
জানুয়ারির বিষাদী বিকেলে ক্লাবের অফিশিয়াল ভিডিওতে ক্লপ যখন বলেন, ‘আমার শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে’, বিবর্ণ চেহারার ক্লপকে দেখে আফসোস জাগে - কেন যে কারও কারও বয়সটা বাড়ে! মনে হয়, এই তো সেদিন এলেন!
চোখের পলকে মাঝে মাঝে নয়টা বছরও বুঝি কেটে যায়! চোখ বন্ধ করলে যে নয়টা বছর রূপালি পর্দার মতো ভেসে ওঠে, স্মৃতি ফেরায়, আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি জাগায়। ২০১৫ সালে অক্টোবরের মাঝের দিকের এক বৃহস্পতিবার দুপুরে এমনই আলো ঝলমলে হাসিতে লিভারপুলে বিশ্বাসের জয়গান শুনিয়ে এসেছিলেন। তাঁকে নিয়ে প্রশ্নে বলেছিলেন, ‘আমাকে না হয় “নরমাল ওয়ান”ই ধরে নিন!’ তিনি নাকি সাধারণ একজন! লিভারপুলে তাঁর আবেগে উথালপাথাল নয়টা বছরকে আর যা-ই হোক, সাধারণ বলা যায় না।
ব্রিটিশদের কলোনিয়াল শাসনের সময় থেকেই শোষণের শিকার লিভারপুল সাম্যবাদী মতাদর্শের ক্লপকে আপন করে নিতে এক মুহূর্ত সময় নেয়নি। প্রথম দেখার সেই প্রেম শেষবেলায়ও একইরকম – আবেগী, মর্মস্পর্শী। চোখে জল এনে ঠোঁটে হাসি এঁকে দেয়।
পথ চলতে চলতে লেখা যে গল্পের শেষে পেছনে তাকিয়ে অজান্তে হাসি চলে আসে ঠোঁটে, ক্লপ তেমন গল্পই লিখে চলেন বারেবারে। মাইন্সে, ডর্টমুন্ডে। লিভারপুলেও। তাঁর জীবন দর্শনই এমন। হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে আবেগ ঝরে তাঁর, নিশ্বাসে থাকে সামর্থের চেয়েও বেশি কিছু করে ফেলার বিশ্বাস। এবং কী আশ্চর্য ক্যারিশমায় যেন, ক্লপের সে বিশ্বাসের পরাগায়ন হয়ে যায় তাঁর ক্লাবে, ওই শহরে।
ওই বিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে পারেন বলে, নিষ্পাপ ভালোবাসার অধিকার থাকে বলেই হয়তো, কখন তাঁর সরে যাওয়া ভালোবাসার ক্লাবটার জন্য ভালো, সেটা ক্লপই ঠিক করে নেন। কীভাবে বিদায় জানাবেন, ঠিক করে নেন সেটাও। কালই যেমন, বিদায়বেলায় সমর্থকদের শিখিয়ে দিয়ে গেলেন কীভাবে লিভারপুলের পরবর্তী কোচ হতে যাওয়া আরনে স্লটকে নিয়ে গান গাইতে হবে! আর কজন কোচকে দেখেছেন তাঁর উত্তরসূরির নামে গান বেঁধে দিয়ে যেতে! আরও মজার ব্যাপার কী, লিভারপুল এখনো স্লটের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণাই করেনি!
তবু মঞ্চে দাঁড়িয়ে ক্লপ গাইলেন, গলা মেলাল অ্যানফিল্ড। আরনে স্লট… লা লা লালা লা!
এতদিন গানটা ছিল ‘ইয়ুর্গেন ক্লপ… লা লা লালা লা!’
সুর একই, শুধু দুটি নাম ভিন্ন। অনুভূতিও কতটাই না ভিন্ন! স্লট হয়তো লিভারপুলকে আরও বড় কিছুর স্বাদ দিয়ে যাবেন - যেমনটা সত্তরে বিল শ্যাঙ্কলির পর করেছিলেন বব পেইসলি। কিন্তু তা হোক বা না হোক, স্লট ‘পেইসলি’ হয়ে উঠুন বা না উঠুন, ক্লপ লিভারপুলের ইতিহাসে ততটাই উঁচুতে থাকবেন, যতটা উঁচুতে আছেন শ্যাঙ্কলি।
ক্লপ যে লিভারপুলের জন্য একটা অনির্বচনীয় এক অনুভূতির নাম। সেরাদের সেরা তিনি নন, কিন্তু প্রসঙ্গ যখন লিভারপুল, তখন অন্য কারও সম্ভবত সাধ্যই নেই যে ক্লপের মতো হোন!