আর্জেন্টিনায় মেসি, দি মারিয়ার অমরত্বের পথে যখন যা হলো

কলম্বিয়াকে হারিয়ে রেকর্ড ১৬তম বারের মতো কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ে লওতারো মার্তিনেসের একমাত্র গোলে শিরোপা ধরে রাখে লিওনেল স্কালোনির দল। তবে আর্জেন্টিনার জয়টা মোটেও সহজ ছিল না। শিরোপা জয়ের পথে আজকের ম্যাচে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা তুলে ধরা হলো। 

বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় ম্যাচ শুরুর কথা থাকলেও ম্যাচের সময় পরিবর্তন হয় তিন দফায়। মূলত স্টেডিয়ামের বাইরে বিনা টিকিটের দর্শকদের চাপে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে তিন দফা পিছিয়ে ম্যাচ শুরু হয় প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট দেরিতে

হার্ডরক স্টেডিয়ামে আজ ম্যাচের প্রথম মিনিটেই আক্রমণে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ডানপ্রান্ত থেকে বাড়ানো গনসালো মন্তিয়েলের ক্রসে ঠিকঠাক শট নিতে পারেননি হুলিয়ান আলভারেস। দুই মিনিট পরে বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠেছিল আলবিসেলেস্তেরা। এ যাত্রায় সুযোগ নষ্ট করেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো।

ম্যাচের ৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে কাঁপুনি ধরিয়েছিল কলম্বিয়া। তবে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া লুইস দিয়াসের ডান পায়ের শট ঠেকিয়ে দেন এমি মার্তিনেস। দুই মিনিট আবারও আক্রমণে ওঠে নেস্তর লরেনসোর শিষ্যরা। এবার সহজ সুযোগ কলম্বিয়া স্ট্রাইকার ইয়ান করদোবা। বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া ৩১ বছর বয়সী এ স্ট্রাইকারের দুর্বল শট পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। 

১২ মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে ক্রস করেছিলেন হামেস রদ্রিগেস। এ যাত্রায় কর্নারের বিনিমনে সেটি প্রতিহত করেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। কর্নার থেকে হেড করেছিলেন কলম্বিয়া ডিফেন্ডার কেস্তা। কিন্তু সেটি ঠেকাতে বেগ পেতে হয়নি এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে।

২০ মিনিটে সতীর্থদের সঙ্গে বল দেওয়া নেওয়া করে আক্রমণে ওঠেন লিওনেল মেসি। দি মারিয়ার ক্রসে বক্সের ভেতর থেকে বাঁ পায়ের শট নিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কিন্তু সেটি আলভারেসের পায়ে লেগে আটকে যায়।

২৬ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ করে কলম্বিয়া। ডান প্রান্ত থেকে বক্সে ক্রস করেছিলেন দলটির রাইট ব্যাক সান্তিয়াগো আরিয়াস। কিন্তু এ যাত্রায় আবারও সে ক্রস ক্লিয়ার করেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস।

এভাবে আক্রমণ-প্রতি আক্রমলে চলতে থাকে ম্যাচ। এর মধ্যে আরও একবার আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বুকের কাঁপুনি বেড়ে গিয়েছিল। না এবার কলম্বিয়া কোনো আক্রমণ করেনি। বরং লিওনেল মেসির চোট শঙ্কা জেগেছিল। মাঠেই প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে খেলতে নামেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন দলটির সমর্থকেরা।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে বক্সের বাইরে থেকে মেসির নেওয়া ফ্রি কিক হেড করেছিলেন তাগলিয়াফিকো। কিন্তু সেটা বক্সের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে গোলহীনই কেটে যায় প্রথমার্ধ।

বিরতি থেকে ফিরে ছন্দ পেতে থাকে আর্জেন্টিনা। তবে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম গোছানো আক্রমণটা করে কলম্বিয়া। ম্যাচের ৪৮ মিনিটে করদোবার হেড যায় সান্তিয়াগো আরিয়াসের সামনে। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া ৩২ বছর বয়সী এ রাইট ব্যাকের শট পোস্ট ঘেঁষে বাইরে যায়।

পরের মিনিটে পাল্টা আক্রমণে ওঠে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে শেষ দি মারিয়ার শট এগিয়ে এসে ঠেকিয়ে দেন কলম্বিয়া গোলকিপার ক্যামিলো ভারগাস। চার মিনিট পর অবশ্য একটি সুযোগ এসেছিল কলম্বিয়ার সামনে। কর্নার থেকে করদোবার মাথা ঘুরে হেড করেছিলেন দেভিনসন সানচেস। কিন্তু সেটি পোস্টের ওপর দিয়ে যায়।

এরপর টানা আক্রমণ চালাতে থাকে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে কলম্বিয়া আগ্রহী হয়ে ওঠে শারীরিক ফুটবলে। এর মধ্যে ৫৭ মিনিটে দুবার সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। বাম উইং ধরে এগিয়ে ক্রস করেছিলেন দি মারিয়া। কিন্তু ম্যাকঅ্যালিস্টারের হেড ফিরে এলে মেসি-আলভারেসের পা ঘুরে আবার শট নিয়েছিলেন দি মারিয়া। কিন্তু সেটি ঠেকিয়ে দেন কলম্বিয়া গোলকিপার ভারগাস।

ম্যাচের ৬৩ মিনিটে মেসি হ্যামস্ট্রিংয়ের ব্যথায় মাঠে পড়ে যান মেসি। প্রথমার্ধে চোট পেয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। যে যাত্রায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে মাঠে ফিরলেও এবার আর পারলেন না। কান্নাভেজা চোখে মাঠ ছাড়লেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

মেসির পরিবর্তে নামা নিকো গনসালেস অবশ্য একবার জাল খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে পাস দেওয়ার আগে অফসাইড পজিশনে ছিলেন তাগলিয়াফিকো। এতে বাতিল হয়ে যায় গোলটি। ম্যাচের ৮০ মিনিটে আরেকটি সুযোগ মিস করেন গনসালেস। বক্সের ভেতর বল পেয়েও শট নিতে পারেননি তিনি।

নির্ধারিত সময়ে গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও প্রথম সুযোগটা পায় আর্জেন্টিনা। তর্কসাপেক্ষে ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগ বললেও বোধহয় ভুল হবে না।

৯৫ মিনিটে বক্সের ডান প্রান্ত থেকে ক্রস করেছিলেন দি পল। কিন্তু এবারও নিকট দূরত্ব থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ফ্লোরেন্তিনার এ স্ট্রাইকার। গোলকিপার বরবার গনসালেসের দুর্বল শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন ভারগাস।

পাঁচ মিনিট আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভয় ধরিয়েছিল জন আরিয়াসের দূরপাল্লার শট। তবে বক্সের বাইরে থেকে দারুণ ডিফেন্ডিং করেন তাগলিয়াফিকো। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের বাকিটা জুড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে কলম্বিয়া।

বিরতি থেকে ফিরেও একই গতিতে খেলতে থাকে লনেরসোর শিষ্যরা। তবে আর্জেন্টিনাও কম যায়নি। এরমধ্যে ১০৮ মিনিটে বক্সের ডান প্রান্ত থেকে দারুণ একটি ক্রস করেছিলেন দি মারিয়া। তবে সেখানে ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারেননি লওতারো মার্তিনেস।

এ যাত্রায় না পারলেও ১১২ মিনিটে মার্তিনেসের কল্যাণেই ম্যাচের একমাত্র গোলের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। এ গোলটির সহায়তাকারীর নাম হিসেবে জিওভান্নি লো সেলসোর নাম লেখা থাকলেও গোলটির আসল কারিগর লিয়ান্দ্রো পারেদেস।

মধ্যমাঠ থেকে দারুণ এক স্লাইডিং ট্যাকলে বল আদায় করে সেলসোর উদ্দেশ্যে বাড়ান পারেদেস। সেখান থেকে ওয়ান টাচে বক্সের দিকে পাস দেন সেলসো। সেটি দারুণ দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কলম্বিয়া গোলকিপারকে পরাস্ত করেন মার্তিনেস। গোল করেই দর্শক গ্যালারীর দিকে ছুটে যান ইন্তের মিলান স্ট্রাইকার। বাধভাঙা উদযাপনে মাতেন আলবিসেলেস্তে সমর্থকেরা।

ম্যাচে ফিরতে মরিয়া কলম্বিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল এরপরেও। এর মাঝে একবার দু দলের খেলোয়াড়দের একদফা তর্কযুদ্ধও হয়ে যায়।

ম্যাচের ১১৭ মিনিটে দি মারিয়াকে তুলে নেন স্কালোনি। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার জার্সিতে থেকে যায় ৩৬ বছর বয়সী দি মারিয়ার পথচলা। তাঁর পরিবর্তে নিকোলাস ওতামেন্দিকে নামান স্কালোনি। কোপা আমেরিকাতে এটাই ছিল ওতামেন্দির শেষ ম্যাচ।

ম্যাচের শেষদিকে আক্রমণের চেষ্টা চালিয়েছিল লরেনসোর দল। কিন্তু কলম্বিয়ার এলোমেলো আক্রমণ আর্জেন্টিনার জমাট রক্ষণ ভাঙতে পারেনি।

অতিরিক্ত সময়ের সঙ্গে ২ মিনিট যোগ হয়। একদম শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার বক্সে ভয় ধরিয়েছিল কলম্বিয়া। আর্জেন্টিনার বক্সের ভেতর পড়ে যান  কলম্বিয়ার একজন। এতে পেনাল্টির আবেদন করতে থাকেন লরেনসোর শিষ্যরা। রেফারি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ভিএআর যাচাই করে জানান, ওটা পেনাল্টি ছিল না। একইসঙ্গে থেমে যায় কলম্বিয়ার সকল আশাও।

একটু পরেই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে মেতে ওঠে আজেন্টিনা। মেসির মুখেও হাসি ফোটে। রেকর্ড ১৬তম শিরোপা জিতল স্কালোনির দল।