আর্জেন্টিনা তখন উদ্যাপনে ব্যস্ত। তিনি মাঠের এক জায়গায় বসে কাঁদছেন। সে কী অঝোর কান্না! তাঁর যে কিছুই হলো না!
মায়ামিতে আজ মেসি কেঁদেছেন, সে ভিন্ন কষ্টের কান্না – ফাইনালের মতো ম্যাচে, যেটা কিনা আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো বড় টুর্নামেন্টে তাঁর শেষ ম্যাচ হয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি, সে ম্যাচে চোটের কারণে উঠে যেতে হওয়ার কান্না। দি মারিয়াও কেঁদেছেন, সেটা আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠ ছেড়ে যাওয়ার বিদায়ী ব্যথা। তাঁর কান্নাটা অগোচরেই থেকে গেল।
তিনি হামেস রদ্রিগেস, ফুটবলে যাঁর ইতিহাস লেখার হাতছানি ছিল আজ। কলম্বিয়ার ফুটবলকে আলোচনায় এনে নিজেকে পূর্ণতা দেওয়ার আহ্বান ছিল। কিন্তু পুরো কোপা আমেরিকা মাতিয়ে শেষবেলায় এসে আর পারলেন না হামেস। বয়স ৩২, মাঠে বসে অঝোর কান্নার সময়ে তাঁর হয়তো মনে হচ্ছিল – এই সুযোগটাই ছিল শেষ।
টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা তিনিই পেয়েছেন, না পেলে অবিচার হতো। লিওনেল মেসির ২০২১ কোপা আমেরিকার রেকর্ড কেড়ে নিয়ে এবার ৬টি অ্যাসিস্ট করেছেন, তাতে কোপা আমেরিকার ইতিহাসে এক টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল গড়ে দেওয়ার রেকর্ড হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে চোখজুড়ানো একটা গোলও করেছেন। টুর্নামেন্টজুড়ে তাঁর ফুটবলেই প্রাণ পেয়েছে কলম্বিয়ার আক্রমণ। সেরা খেলোয়াড়ের দৌড়ে তাঁর আশপাশেও আর কেউ ছিলেন না।
তবু কলম্বিয়ার ইতিহাস রাঙাতে না পারার কষ্ট নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে হামেসকে। শেষ পর্যন্ত কিছুই না পাওয়ার ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় প্রতিশ্রুতির কিছুটা পূরণ হওয়ার স্বপ্নও পূর্ণ হলো না।
কিছুই না পাওয়ার ক্যারিয়ার? শুধু শিরোপার বিচারে বাক্যটাকে অদ্ভুত মনে হবে। রেয়াল মাদ্রিদে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন, পোর্তোয় ইউরোপা লিগ। স্পেন, জার্মানির মতো দেশে লিগ জিতেছেন। কিছুই না পাওয়া মানে কী!
কিন্তু ওই সব শিরোপা তো দলের, সেগুলোর বেশিরভাগেই হামেসের অবদান আর কতটা! হামেস বলতেই যদি ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার ‘নাম্বার টেন’ জার্সিতে ফুটফুটে দেবশিশুর রুদ্রমূর্তি মনে ভেসে ওঠে – যাঁর পায়ে ফুটবল প্রাণ পায়, রেয়াল মাদ্রিদ-বায়ার্ন মিউনিখে সব শিরোপার সঙ্গে ওই হামেসকে মেলান তো! মেলানো যাবে না। হামেসের জন্ম তো শুধুই আরেকজন খেলোয়াড় হওয়ার জন্য হয়নি!
কিন্তু কিছুটা নিজ দোষে, কিছুটা পরিস্থিতির চাপে, কিছুটা সময়ের ভুলে – সেটাই হয়েছে। গত এক দশকের সেরা ফুটবলারের বিচারে হামেস এতটাই অপ্রাসঙ্গিক যে, হয়তো সেরা ১০০-তেও তাঁর কথা মাথায় আসবে না।
এবারের কোপায় তবু কোচ নেস্তর লরেন্সোর কৌশলে দুই উইংয়ে দিয়াস-আরিয়াসদের গতি কাজে লাগিয়ে আক্রমণে উঠেছে কলম্বিয়া, তাঁদের ঠেকাতে ব্যস্ত ডিফেন্ডারদের মাঝে ফাঁকা জায়গা পেয়েছেন হামেস। তা কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠেছেন কলম্বিয়ার আক্রমণের প্রাণ।
তাতে ব্যক্তিগত শিরোপাটা এসেছে, এক দশক আগের ২০১৪ বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরেছে, হামেসকে নিয়ে ‘আহা, কী হতে পারতেন’ আফসোস ঝরেছে…কিন্তু শেষ পর্যন্ত কান্নাই সঙ্গী হামেসের।