কোপা আমেরিকা জেতা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামছে ফ্রান্স

মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেস, ম্যাকঅ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেস, লওতারো মার্তিনেস, ওতামেন্দির মতো কয়েকজন ছিলেন না দলের সঙ্গে। বাকিরা যাত্রাপথে উদ্‌যাপন করতে করতেই যাচ্ছিলেন। শিরোপা জেতার পর যা হয় আর কী! কিন্তু সে উদ্‌যাপন থেকেই কত কিছু হয়ে যাচ্ছে!

চেলসিতে খেলা আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনসো ফের্নান্দেসের ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে দেখা যায়, দলের খেলোয়াড়েরা সবাই মিলে গান ধরেছেন, তবে সে গানের উদ্দেশ্য ফ্রান্স। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে যাদের হারিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিলেন মেসিরা, সেই ফ্রান্সের দলে যে এখন আফ্রিকান অনেক খেলোয়াড়ের ছড়াছড়ি, যাঁরা লতায়-পাতায় ফরাসি – এসব নিয়েই গানটা ছিল বলে শোনা যায়।

কিন্তু এই ভিডিও দেখেই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে চারিদিকে সমালোচনার জেরে এখন ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার। এনসো ফের্নান্দেস অবশ্য এরই মধ্যে ওই গানের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

ফ্রান্সকে নিয়ে এ অভিযোগ অবশ্য অনেক পুরোনো। ফ্রান্স জাতীয় দলের অনেক তারকাই আদতে ছিলেন অন্য দেশের। কারও হয়তো মা কিংবা বাবার কোনো একজন ফরাসি, কারও ক্ষেত্রে তা-ও নয়, শুধু জন্ম ফ্রান্সে হয়েছে বলেই তাঁরা ফ্রান্সের হয়ে খেলেছেন। বলা হয়, সাবেক ফরাসি কলোনির অংশ ছিল, এমন দেশের প্রতিভাদেরই বেশি ফ্রান্সের হয়ে খেলতে দেখা যায়। জিনেদিন জিদান কিংবা থিয়েরি অঁরির মতো তারকাদেরও জন্ম ফ্রান্স কলোনির অধীন দেশে। গত কয়েক বছরে এই ধারাটা আরও বেড়েছে।

বর্তমান দলে কিলিয়ান এমবাপ্পে (ক্যামেরুনিয়ান বাবা, আলজেরিয়ান মা), উসমান দেম্বেলে (মৌরিতানিয়া-সেনেগালিজ বংশোদ্ভুত মা ও মালিয়ান বাবা), এনগোলো কান্তে (মালিয়ান বাবা-মা), উইলিয়াম সালিবা (লেবানিজ বাবা, ক্যামেরুনিয়ান মা), অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি (ক্যামেরুনিয়ান বাবা-মা)…এঁদের সবাই-ই আফ্রিকান বংশোদ্ভুত, কিন্তু তাঁদের জন্ম ফ্রান্সে হওয়ায় জন্মসূত্রে ফরাসি নাগরিক বনে গেছেন। ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার পল পগবারও বাবা-মা দুজনই ছিলেন গিনির নাগরিক।

গত কয়েক বছরে ফ্রান্সের শত শত প্রতিভাবান ফুটবলারের উঠে আসার পর যখন দেখা যায়, এঁদের বেশিরভাগই আফ্রিকান বংশোদ্ভুত, এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কারও চোখে, ফ্রান্স তাদের পুরোনো কলোনির শক্তি কাজে লাগিয়ে আফ্রিকান দেশগুলোকে বঞ্চিত করছে। আবার কারও চোখে এটা ফ্রান্সের ‘সবাইকে আপন করে নেওয়ার’ ক্ষমতার প্রমাণ।

তা যা-ই হোক, ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ফ্রান্সের এভাবে আফ্রিকার খেলোয়াড়দের নিজেদের করে নেওয়া নিয়ে খোঁচা মেরে গান বেঁধেছিলেন। আর শিরোপা উৎসবে যা হয়, আগে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া কোনো গানও যেকোনো উদ্‌যাপনে ফিরে আসে। এবার কোপা আমেরিকা জিতলেও তাই উদ্‌যাপনে ফ্রান্সকে খোঁচাল আর্জেন্টিনা!

কিন্তু ফ্রান্স তা মানবে কেন! এই বর্ণবাদী আচরণ নিয়ে আর্জেন্টিনার ফেডারেশন ও ফিফার কাছে তো নালিশ করেছেই, আইনি লড়াইয়ে নামারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ)। ‘খেলাধুলা ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো অদ্ভুত এই মন্তব্যগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আর্জেন্টিনার ফেডারেশন ও ফিফার সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি এমন বর্ণবাদী ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের জন্য সরাসরি আইনি অভিযোগ আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এফএফএফ’- গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে এফএফএফ।

এফএফএফের সভাপতি ফিলিপ্পে দিয়ালো আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের এমন মন্তব্যের কড়া নিন্দাও জানাচ্ছেন বলে বিবৃতিতে লেখা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার নির্বাহী কমিটির সদস্য দিয়ালো গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের রাজনীতিতে ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।

এর আগে এনসো ফের্নান্দেসের ইনস্টাগ্রামে ওই ভিডিও প্রচারিত হওয়ার পর চেলসিতে ফের্নান্দেসের ফরাসি সতীর্থরা খেপেছেন বলে খবর আসে। ডিফেন্ডার ওয়েসলি ফোফানা এ নিয়ে কথাও বলেছেন। এরপর ফের্নান্দেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তাঁদের ওই মন্তব্যগুলো করা উচিৎ হয়নি, অমন মন্তব্যের কোনো ব্যাখ্যাও হয় না। শিরোপা জয়ের উদ্‌যাপনের মুহূর্তে অতটা চিন্তা ভাবনা করে এসব করা হয়নি জানিয়ে ফের্নান্দেস বলেছেন, ওই মুহূর্তে অল্প সময়ের জন্য গানে গানে করা ওসব মন্তব্য তাঁর মূলবোধের সঙ্গে যায় না।