বয়স ৩০-এর ডানে চলে এসেছে, সে তো অনেকদিন হলো। ইউরোপের শীর্ষ পর্যায় ছেড়ে ক্লাব ফুটবলেও এখন তাঁর ঠিকানা সৌদি আরবের লিগ। তা-ও যদি খেলতে পারতেন! একের পর এক চোট তো আরও বছর সাতেক আগে পিএসজিতে যাওয়ার সময় থেকেই ভোগাচ্ছে, সৌদি আরবের আল হিলালে যাওয়ার পর সেভাবে মাঠেই নামা হয়নি!
এই নেইমারকে আর যা-ই হোক, ব্রাজিলের মতো একটা দলের ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বপ্নসারথি ভাবা যায় না। তারওপর যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোতে দুবছর পরের বিশ্বকাপ আসতে আসতে যেখানে নেইমারের বয়স হয়ে যাবে ৩৪!
তবে সে সব কোপা আমেরিকার আগের কথা।
এবারের কোপা আমেরিকা সেই নেইমারকেই বানিয়ে দিয়েছে ব্রাজিলের ত্রাণকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রেই হয়ে যাওয়া কোপা আমেরিকায় কোনোরকমে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতেই দম ফুরিয়ে যাওয়া ব্রাজিল হাড়ে হাড়ে বুঝেছে, নেইমার ছাড়া গতি নেই। নেইমারের অনুপস্থিতিই নেইমারকে করে দিয়েছে অমূল্য।
এমন নয় যে নেইমারকে নিয়ে আগের তিনটি বিশ্বকাপে কোনো হাতি-ঘোড়া মেরে ফেলেছে ব্রাজিল। ২০০২ বিশ্বকাপের স্মৃতিরই এখন জাবর কাটতে হচ্ছে, ‘মিশন হেক্সা’ এরপর থেকে প্রতি বিশ্বকাপের আগে স্বপ্ন জাগায় আর বিশ্বকাপ শেষ হয় স্বপ্ন ভাঙার বেদনায়। এর মধ্যে ইতালি-জার্মানি বিশ্বকাপ সংখ্যায় তাদের খুব কাছে গিয়ে আবার পথও হারিয়েছে, ফ্রান্স টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে একটিতে শিরোপা উল্লাস করেছে, আরেকটিতে টাইব্রেকারে ‘হার্টব্রেকে’র শিকার হয়েছে। আর ব্রাজিলের জন্য এর চেয়েও বেশি জ্বলুনির ব্যাপার, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা তাদেরই মাটিতে ২০১৪ বিশ্বকাপে শেষে গিয়ে না পারলেও কাতারে ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়েছে। ব্রাজিলের অপেক্ষা দিনে দিনে ২০ বছর ছাপিয়ে আগামী বিশ্বকাপে ২৪-এ গড়াবে।
তাতে নেইমারেরও কি দায় নেই? ২০১০ বিশ্বকাপে টিনএজ নেইমারকে দলে রাখলে ব্রাজিলকে কোয়ার্টার ফাইনালেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হতো কি না, সে প্রশ্ন কার্লোস দুঙ্গার গোয়ার্তুমিকে বারেবারে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু এরপর যে তিন বিশ্বকাপে নেইমার খেলেছেন, কোনোবারই ফাইনালে যেতে পারেনি ব্রাজিল। ২০১৪ সালে ঘরের মাটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে নেইমারের চোটের কান্না শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম বড় লজ্জার পথই তৈরি করে দিয়েছে। রাশিয়ায় চার বছর পর নেইমার গড়াগড়ি করে বেড়িয়েছেন, ব্রাজিলের স্বপ্নও তাঁর সঙ্গে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে কোয়ার্টার ফাইনালে থেমেছে। আর কাতার হয়ে আছে সে সময়ের ব্রাজিল কোচ চিচির কৌশল নিয়ে হতাশার অন্য নাম। ব্রাজিল উড়ছিল বটে, নেইমারও আলো ছড়াচ্ছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে নেইমারেরই অসাধারণ গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মিনিট পাঁচেক বাকি থাকার সময়েও চিচি কেন আরও ঘর সামলে রেখে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশলে যাননি – সে প্রশ্ন ব্রাজিলকে পোড়ায়।
তবে সে সব পুরোনো কথা।
কাতার বিশ্বকাপের পর চিচি দায়িত্ব ছেড়েছেন, তাঁর পর কার্লো আনচেলত্তিকে ডাগআউটে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা ব্রাজিলিয়ান ফেডারেশন ফের্নান্দো জিনিসের ক্ষণস্থায়ী মেয়াদের পর এখন দরিফাউ জুনিয়রে সওয়ার। আনচেলত্তিকে আর পাওয়া হচ্ছে না, দরিফাউই ভরসা। কিন্তু দরিফাউয়ের অধীনে কোপা আমেরিকা কি ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে ভরসা জাগাতে পারছে?
শুরুতেই কোস্টারিকার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, এরপর প্যারাগুয়েকে গুঁড়িয়ে দিয়েও শেষ পর্যন্ত কলম্বিয়ার পেছনে থেকে কোনোরকমে দ্বিতীয় হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ব্রাজিল। সেখানে উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হার। কাগজে-কলমের হিসাব বলবে, কোপা আমেরিকায় ব্রাজিল চার ম্যাচের একটিতে জিতেছে, বাকি তিনটি করেছে ড্র –টাইব্রেকারে হার তো কাগজে-কলমে হার হিসেবে লেখা থাকবে না। কিন্তু কাগজে-কলমের হিসাব দিয়ে তো আর মন চলে না, ভক্তদের মনে কতটা বিশ্বাস সঞ্চার করতে পেরেছে ব্রাজিল?
এক বাক্যে বললে – একরত্তিও নয়। কেন নয়, সে ব্যাখ্যায় কোচকে দিয়েই না হয় শুরু হোক বিশ্লেষণ।
৬১ বছর বয়সী দরিফাউ জুনিয়রকে ভাবা হয়েছিল, তিনি ব্রাজিল ডাগআউটে ধীরস্থির একটা ভাব এনে দেবেন। কিন্তু কোপা আমেরিকাজুড়ে প্রতিটি ফাউলে তাঁর হাত ছোঁড়াছুড়ি বুঝিয়ে দিল, দরিফাউয়ের আবেগই প্রাধান্য পায় তাঁর সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায়। কলম্বিয়ার বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে না জিতলেও কোয়ার্টার ফাইনাল যেখানে নিশ্চিত, সে ম্যাচে হলুদ কার্ডসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকা ভিনিসিয়ুসকে নামিয়ে দেওয়াও তাঁর আবেগেরই প্রমাণ। যার দায় ব্রাজিল চুকিয়েছে উরুগুয়ের বিপক্ষে ভিনিকে হারিয়ে।
কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারের আগের চিত্রটা তো আরও হতাশা ছড়িয়ে গেল। উরুগুয়ের খেলোয়াড়েরা যেখানে তাদের কোচ মার্সেলো বিয়েলসাকে ঘিরে তাঁর নির্দেশনা মন দিয়ে শুনছিলেন, দরিফাউয়ের জায়গা হলো ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের বৃত্তের বাইরে। সেখান থেকে দু-একবার হাত ছুঁড়ে নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু সে আর খেলোয়াড়দের কানে পৌঁছানোর উপায় কোথায়! তরুণ হলেও এ দলে তারকার কমতি তো নেই, তাঁদের ওপরই দরিফাউ কতটা কর্তৃত্ব খাটাতে পারেন, সে নিয়ে সংশয় তাই থেকেই যাচ্ছে।
অবশ্য ব্রাজিল দলেই প্রথম নয়, লাতিন ফুটবল বিশেষজ্ঞ টিম ভিকেরি জানাচ্ছেন, দরিফাউকে ব্রাজিলের ক্লাব ফুটবলেও টাইব্রেকারে দলের খেলোয়াড়দের বৃত্তের বাইরে আবিষ্কার করা গেছে। সে ক্ষেত্রে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে দরিফাউ খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেওয়ায় বিশ্বাসী, সে স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো নেতা ব্রাজিল দলে কোথায়!
ভিনিসিয়ুস নেতা হবেন কী, তিনি নিজেকেই সামলাতে ব্যর্থ। সেটা মাঠে তাঁর অযথা অনুযোগের দৃশ্যগুলো যদি পরিষ্কার না-ও করে, কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা ভালোভাবেই করে দিয়েছে। কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞায় থাকা সত্ত্বেও ম্যাচের ৭ মিনিটেই সেদিন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের মুখে আঘাত করে হলুদ কার্ড খাওয়াই তা প্রমাণ করে। রদ্রিগো এখনো জায়গার দাবিই ভালোভাবে তুলতে পারেননি, পাকেতা মাঝমাঠে ফুটবল-দক্ষতায় নেতৃত্ব দিতে পারেননি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যাওয়ার পর থেকে কাসেমিরো ব্রাজিল দলে থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। আর রক্ষণ? এত বছর থিয়াগো সিলভা থাকার কারণে নেতৃত্বগুণের অভাবে পড়তে হয়নি ব্রাজিলকে, সিলভার অবসরের পর ব্রাজিলের সে রক্ষণ তো গড়ের মাঠ! মারকিনিওসের নেতৃত্বগুণের অভাব পিএসজিই প্রতি মৌসুমে টের পায়।
তাহলে নেতা হওয়ার মতো আছেন আর কে?
কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের ম্যাচগুলোতে ভিআইপি গ্যালারিতে যাঁর উপস্থিতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্রাজিলের খেলার চেয়েও বেশি উদ্যাপনের উপলক্ষ হয়ে এসেছে – নেইমার! এই তরুণ দলের ভিনি-রদ্রিগোরা তাঁকে আদর্শ মেনেই বেড়ে উঠেছেন, মারকিনিওস-পাকেতারাও তাঁকে বন্ধু মানেন। নেইমার তো এ দলের অবিসংবাদিত নেতাই! যেমনটা মেসি আর্জেন্টিনার।
কিন্তু শুধু নেতৃত্বগুণই নেইমারকে কোপা আমেরিকায় ব্যর্থ ব্রাজিলের ‘মেসাইয়া’ বানিয়ে দিয়েছে – এমন তো নয়! ব্রাজিলের খেলার ধরনই অনুচ্চারে বারেবারে বলে গেছে, নেইমার ছাড়া সমাধান নেই।
অনেকদিন ধরেই ভুগিয়ে চলা সমস্যাগুলোই কোপা আমেরিকায় আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ব্রাজিলের খেলার ধরনে। রোনালদো, রোমারিওদের দেশ ব্রাজিল প্রতিপক্ষ বক্সে ভরসা করার মতো স্ট্রাইকার তো সেই ২০১০ বিশ্বকাপ থেকেই পায় না, ১৮ বছর বয়সের এনদ্রিক ছাড়া আপাতত আশা দেখানোর মতোও কেউ নেই। কাফু-রবের্তো কার্লোস-আলভেসদের দেশ এখন আর উইংব্যাকও পায় না।
তার পাশাপাশি যে সমস্যাটা ব্রাজিলকে এবার বেশি ভুগিয়েছে তা হলো, মাঝমাঠে সৃষ্টিশীলতার অভাব। ব্রুনো গিমারায়েস বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার, তাঁর কাছ থেকে কুতিনিও-নেইমারের সৃষ্টিশীলতা আশা করাই বাড়াবাড়ি। রদ্রিগো তা হতে পারতেন, কিন্তু তাঁকে খেলানোর মতো জায়গাই এখনো খুঁজে বের করতে পারেনি ব্রাজিল। রদ্রিগোর মতো খেলোয়াড়ের সেরাটা বের করতে গেলে তাঁকে কেন্দ্র করেই দল সাজাতে হয়, কিন্তু এখনো সে অধিকার অর্জন করার মতো নিয়মিত পারফরম্যান্স দেখানো হয়ে ওঠেনি রদ্রিগোর – রেয়াল মাদ্রিদেও নয়, ব্রাজিলে তো নয়ই।
আর ভিনিসিয়ুস? নেইমার না থাকায় তাঁর কাঁধেই সব প্রত্যাশা চাপিয়ে দিয়ে ব্রাজিল ভেবেছিল – ভিনি হবে আমাদের নেইমার। কিন্তু তা আর হলো কই! টাচলাইন ধরে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ওয়ান-অন-ওয়ানে ছিটকে ফেলতে ভিনিসিয়ুসের জুড়ি নেই সত্যি, কিন্তু সতীর্থদের খেলানোর দক্ষতা বিবেচনায় নিলে ভিনিসিয়ুস যে নেইমার নন – সেটা ব্রাজিল এবার কোপা আমেরিকায় বেশ ভালোভাবেই বুঝেছে।
নেইমার-মেসির মতো ‘একের ভেতর তিন’ খেলোয়াড় তো আর সহজে আসে না! তাঁরা গোল করতে পারেন, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যেতে ড্রিবলিংয়ে মুগ্ধতাও ছড়াতে পারেন, আবার মাঝমাঠ থেকে বল টেনে নিয়ে যাওয়া বা প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া কোনো থ্রু-তে সতীর্থকে গোল গড়ে দেওয়ার ক্ষমতায়ও তাঁরা অদ্বিতীয়। এমন একজন দলে থাকলে শুধু সতীর্থদের তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলতে পারলেই তো হয়! লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা যে কৌশল খুঁজে নিয়েছে মেসিকে ঘিরে। ব্রাজিল নেইমারকে ঘিরে তা এখনো করতে পারেনি – গত দশকে ব্রাজিলের ব্যর্থতার একটা বড় কারণ সম্ভবত এটিই।
নেইমার মাঝমাঠ থেকে বল টেনে নিয়ে আক্রমণ গড়ে দিতে পারেন বলে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের তখন সৃষ্টিশীলতা নিয়ে ভাবতে হয় না, তাদের তখন ছোটখাটো কাজগুলো ঠিকঠাকভাবে করতে পারলেই চলে। আর্জেন্টিনা যা করার মতো মাঝমাঠ খুঁজে নিয়েছে ম্যাকঅ্যালিস্টার-এনসো-দে পলদের মধ্যে। তাঁদের কেউই এককভাবে সৃষ্টিশীলতায় প্রতিপক্ষকে ভোগানোর মতো নন, তবে মেসির পাশে তাল মিলিয়ে খেলতে জানেন। ব্রাজিলে ব্রুনো-পাকেতারাও তো একইরকমই! শুধু নেইমারকে ঘিরে তাঁদের খেলানোর কৌশল সাজানোর মতো কোচ ব্রাজিল এতদিনে পায়নি। দরিফাউ কি পারবেন?
২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৪ বছরের নেইমার উইং ধরে দ্রুত দৌড়াবেন, মাঝমাঠ থেকে একেবারে বক্সে উঠে গিয়ে গোল করে আসবেন – এতটা আশা করা বাড়াবাড়ি। সে দায়িত্বটা ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগোদের দিয়ে সৃষ্টিশীলতার উৎসে নেইমারকে রাখলেই তো হয়! তাঁরা তির হলেন, নেইমার না হয় হলেন ধনুক – ব্যস, হয়ে গেল ব্রাজিলের ২০২৪ বিশ্বকাপের স্বপ্ন রাঙানোর রেসিপি!
কোপা আমেরিকার পর যে রেসিপিতে আরও বেশি করে মজেছে ব্রাজিল।