জানুয়ারিতেই জেনে গিয়েছিলেন, ক্যানসার তাঁর শরীরে এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছে যে আর সারানো সম্ভব নয়। জানিয়েছিলেন, ‘বড়জোর’ আর এক বছর সময় আছে তাঁর। এক বছরও সময় পেলেন না সভেন গোরান এরিকসন।
পাঁচদিন আগে তাঁর সর্বশেষ পোস্টই বুঝিয়ে দিয়েছিল, লোকান্তরের ডাক শুনতে পাচ্ছেন। শেষ বিদায় জানানো পোস্টে ইংল্যান্ড দলের সাবেক সুইডিশ কোচ সবাইকে জীবনটা উপভোগ করার মন্ত্র শুনিয়েছিলেন। আজ খবর এল, দীর্ঘশ্বাস ছড়ানো অপেক্ষার সমাপ্তি টেনে ৭৬ বছর বয়সে অন্যলোকে পাড়ি জমিয়েছেন এরিকসন।
ইংলিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এরিকসনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে সুইডেনে তাঁর এজেন্ট বো গুস্তাভসন জানিয়েছেন, আজ সোমবার সকালে পরিবারের সদস্যদের কাছে রেখেই শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এরিকসন।
জানুয়ারিতে তাঁর ক্যানসারের খবর জানানোর পর ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখন নিজের দেশ সুইডেনের ক্লাব কার্লস্টাডের ক্রীড়া পরিচালক ছিলেন।
ইংল্যান্ড জাতীয় দলের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে বেকহ্যাম-জেরার্ড-ল্যাম্পার্ডদের দায়িত্ব সামলানো এরিকসন চার দশকের কোচিং ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ১৮টি শিরোপা জিতেছেন। সুইডেনের ক্লাব ইয়োতেবোরিয়াকে ১৯৮২ সালে সুইডিশ লিগের পাশাপাশি উয়েফা কাপ (বর্তমান ইউরোপা লিগ) জিতিয়েছেন। এরপর পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকাকে দুটি লিগ শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি ১৯৮৩ সালে উয়েফা কাপের ফাইনালেও নিয়ে যান।
মাঝে রোমা ও ফিওরেন্তিনায় কয়েক মৌসুম কাটানোর পর আবার বেনফিকায় ফিরে ক্লাবটাকে আরেকটি পর্তুগিজ লিগ জেতানোর পাশাপাশি তুলে নেন ১৯৯০ ইউরোপিয়ান কাপের (বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ) ফাইনালে। সেখান থেকে ইতালির ক্লাব সাম্পদোরিয়ায় গিয়ে ইতালিয়ান কাপ জেতেন। এরপর লাৎসিওতে গিয়েও দারুণ সফল এরিকসন, ক্লাবটিকে ২০০০ সালে ইতালিয়ান লিগ জিতিয়েছেন, যা লাৎসিওর ইতিহাসের দ্বিতীয় ও সর্বশেষ লিগ শিরোপা।
এই সাফল্যই তাঁকে ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের কোচ বানিয়ে দেয়। যদিও তখন তাঁকে দিয়েই ইংল্যান্ডের ডাগআউটে কোনো ভিনদেশির আগমণের কারণে বিতর্কও ছড়ায় ইংলিশ মিডিয়ায়। তবে প্রথম ম্যাচেই স্পেনকে হারানোর সাত মাস পর জার্মানিকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার সাফল্যে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত এরিকসনের ইংল্যান্ড-অধ্যায় অতটা সাফল্যমন্ডিত থাকেনি। বেকহ্যাম-জেরার্ড-স্কোলসদের ‘সোনালি প্রজন্ম’কে নিয়ে তিনটি টুর্নামেন্টে উঠেছেন, তিনবারই কোয়ার্টার ফাইনালে থেমে গেছে ইংল্যান্ডের পথচলা।
এরপর ম্যানচেস্টার সিটি, লেস্টারের মতো ক্লাব সামলেছেন। মেক্সিকো আর ফিলিপিন জাতীয় দলের দায়িত্বেও ছিলেন। তাঁর ক্যানসারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর শৈশবের স্বপ্ন ছিল কোনো একদিন লিভারপুলের কোচ হবেন। তা তো হওয়া হয়নি, তবে গত মার্চে নিজেদের কিংবদন্তিদের নিয়ে এক দাতব্য ম্যাচে এরিকসনকে কোচ হতে অনুরোধ করে লিভারপুল। ‘খুব সুন্দর একটা দিন কাটল’ – ম্যাচ শেষে বলেছিলেন এরিকসন।
সময় ফুরিয়ে আসছে – এটা জানতে পারার পর থেকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আরও বেশি করে উপভোগের মন্ত্র বারেবারে ছড়িয়ে গেছেন এরিকসন। এই তো, পাঁচদিন আগে তাঁর সর্বশেষ ভিডিও পোস্টেও বলেছিলেন, ‘সুন্দর একটা জীবন কেটেছে আমার। যে দিনটাতে মারা যাব, সে দিনের কথা ভেবে আমরা সবাই-ই ভয় পাই, তবে জীবন মানে তো মৃত্যুও। এ ব্যাপারটাকে মেনে নিতেই হয়। আশা করি, সবকিছুর শেষে সবাই বলবে, হ্যাঁ, উনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তবে সবাই হয়তো তা বলবে না। আশা করি আপনারা আমাকে এমন একজন ইতিবাচক মানুষ হিসেবে মনে রাখবেন যিনি সম্ভব সবকিছুই করার চেষ্টা করেছে। মন খারাপ করে বসে থাকবেন না, হাসুন।’
এরপর তাঁর ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সব কোচ, খেলোয়াড়, দর্শক ও সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষে বললেন, ‘নিজের যত্ন নিন, নিজের জীবনের যত্ন নিন। বাঁচুন। বিদায়।’
এ বিদায়ে দীর্ঘশ্বাস ঝরে অজান্তেই।