লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক, দুই অ্যাসিস্ট, বলিভিয়ার জালে ৬ গোল – আর্জেন্টিনা এক রাতে এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারত! বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আজ মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বলিভিয়াকে ৬-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পথে লিওনেল স্কালোনির দলের ফুটবলটাও হয়েছে দারুণ। এর সঙ্গে ‘আইসিং অন্য দ্য কেক’ হয়ে এসেছে মেসির রেকর্ড।
কোপা আমেরিকার ফাইনালে চোট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়ে যাওয়া মেসি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এবারের দুই ম্যাচ দিয়েই আবার আর্জেন্টিনা দলে ফিরেছেন। শুক্রবার ভেনেজুয়েলার মাঠে কিছু করতে পারেননি, বৃষ্টির পানিতে একাকার মাঠ কিছু করার অবস্থাই সেদিন রাখেনি। তবে আজ বলিভিয়ার বিপক্ষে মেসি দারুণ খেলেছেন, হ্যাটট্রিক করেছেন, সে হ্যাটট্রিকে রেকর্ডটা এই – আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি হ্যাটট্রিকের রেকর্ডে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশে বসেছেন মেসি। দুজনেরই জাতীয় দলে হ্যাটট্রিক ১০টি করে।
তা মেসি আর রোনালদো যেখানে প্রাসঙ্গিক, তুলনা তো না চাইতেও সেখানে এসে পড়ে। ১০টি করে হ্যাটট্রিক দুজনের, কার হ্যাটট্রিকের ভার কেমন, সে তুলনায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একটা চেষ্টা না হলে আর মেসি বা রোনালদো ভক্ত কীসের!
তাহলে হয়ে যাক তুলনা! কার হ্যাটট্রিকগুলো কোন কোন দেশের বিপক্ষে, কোন ধরনের ম্যাচে, কেমন পরিস্থিতিতে? অবশ্য তুলনায় যাওয়ার আগেই একটা ‘টীকা’ এখানে জুড়ে দেওয়া সম্ভবত আবশ্যক – ইউরোপের দেশগুলোকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের বাইরেও ইউরো বাছাইপর্ব আর গত কয়েক বছরে চালু হওয়া ‘প্রীতি ম্যাচের টুর্নামেন্ট’ নেশনস লিগ খেলতে হয় বলে তাদের প্রীতি ম্যাচ খেলার সুযোগই সেভাবে থাকে না। ফলে রোনালদোর হ্যাটট্রিকগুলো ‘প্রতিযোগিতামূলক’ ম্যাচেই বেশি হওয়ারই কথা।
টীকা শেষ, তুলনার শুরু। মেসিকে দিয়ে শুরু করা যাক। জাতীয় দলের জার্সিতে মেসি প্রথম হ্যাটট্রিক করেছেন এক যুগ আগে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে প্রথমবার এক ম্যাচে তিনবার জালে বল জড়ান। একই বছর নিউ জার্সিতে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪-৩ গোলে জয়ের ম্যাচে পেয়েছেন দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। পরের বছর মেসির হ্যাটট্রিকে বিধ্বস্ত হয় গুয়াতেমালা।
মেজর টুর্নামেন্টে মেসি প্রথম হ্যাটট্রিক করেন ২০১৬ কোপা আমেরিকায়। বদলি হিসেবে নেমে পানামার জালে তিনবার বল জড়ান মেসি। এর পরের হ্যাটট্রিকটি সম্ভবত মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৮ বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া-না পাওয়ার ভাগ্য যে ম্যাচে লেখা ছিল, ইকুয়েডরের ২৮৫০ মিটার উচ্চতায় প্রথম মিনিটেই পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনাকে সে ম্যাচে ৩-১ গোলে জেতায় মেসির চোখধাঁধানো হ্যাটট্রিক, নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে খেলা। এরপর মেসির হ্যাটট্রিকের তালিকায় যোগ হতে থাকে হাইতি, বলিভিয়া, এস্তোনিয়া ও কুরাসাওয়ের নাম। আজ বলিভিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় দফায় হ্যাটট্রিক করে সংখ্যাটা ১০-এ নিয়ে গেলেন মেসি।
অন্যদিকে পর্তুগালের জার্সিতে ২০০৪ সালে অভিষেক হলেও হ্যাটট্রিকের জন্য রোনালদোকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। সে বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবার এক ম্যাচে তিন গোল করেন রোনালদো। একই বছর পেয়ে যান দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকের দেখা। সম্ভবত জাতীয় দলের জার্সিতে সেটা রোনালদোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হ্যাটট্রিক।
বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার গ্রুপ পর্বে নিজেদের গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় রোনালদোর পর্তুগালকে নামতে হয় প্লে-অফে। সেখানে সুইডেনের বিপক্ষে প্রথম লেগে ১-০ গোলে জেতা পর্তুগাল দ্বিতীয় লেগে জেতে ৩-২ ব্যবধানে। দ্বিতীয় লেগের সেই ম্যাচটিই রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় হাইলাইটস হয়ে আছে। পর্তুগালকে ব্রাজিল বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেওয়ার পথে হ্যাটট্রিক করেছিলেন রেয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা। তা-ও কোন পরিস্থিতিতে? ইব্রাহিমোভিচের জোড়া গোলের দ্বিতীয়টিতে ৭২ মিনিটে পর্তুগাল ম্যাচে ২-১ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল, দুই লেগ মিলিয়ে অবশ্য ২-২ সমতায় থাকলেও ‘অ্যাওয়ে গোলে’ পর্তুগালই এগিয়ে ছিল। কিন্তু রোনালদো সেখানেই থামলে তো! ৭৭ আর ৭৯ মিনিটের দুই গোলে হ্যাটট্রিকও হলো তাঁর, পর্তুগালও দাপুটে জয়ে নিশ্চিত করে ব্রাজিলের টিকিট।
এরপর একে একে রোনালদোর হ্যাটট্রিকের শিকার হতে থাকে আর্মেনিয়া (২০১৫), অ্যান্ডোরা (২০১৬) ও ফারো আইল্যান্ড (২০১৭)। রাশিয়া বিশ্বকাপেও (২০১৮) একটা দারুণ হ্যাটট্রিক আছে রোনালদোর। গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্র ম্যাচে রোনালদোর হ্যাটট্রিক নিশ্চিত করার পথে তৃতীয় গোলটি ছিল শেষ মুহূর্তে চোখে লেগে থাকা ফ্রি-কিকে।
পরের বছর জাতীয় দলের হয়ে তিনটি হ্যাটট্রিক (সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি, লিথুনিয়ার বিপক্ষে দুটি) করেন পর্তুগিজ সুপারস্টার। পর্তুগালের হয়ে রোনালদো শেষ হ্যাটট্রিকটা করেছেন তিন বছর আগে, ২০২১ সালের অক্টোবরে কাতার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে।