গত কয়েক বছরে একের পর এক ক্লাবে জোসে মরিনিওর এমনই অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, কোনো ক্লাবে তিনি যেতেই আলোচনা শুরু হয়ে যায় – এখানে ঝামেলায় জড়াতে কতদিন লাগবে পর্তুগিজ কোচের?
বছরে ১ কোটি ৫ লাখ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩২ কোটি টাকা) বেতনে গত জুনে তুরস্কের ক্লাব ফেনেরবাচের কোচ হয়েছেন মরিনিও। দুই বছরের চুক্তির চার মাসও গড়ায়নি, এর মধ্যেই রেফারিং নিয়ে বারেবারে ঝামেলায় জড়িয়ে মরিনিও বলছেন, ফেনেরবাচে কর্তৃপক্ষ তুরস্কে রেফারিংয়ের এই অবস্থা তাঁকে আগে জানালে তিনি চাকরিটাতে যোগই দিতেন না!
রেফারিং নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার অভিযোগ জানানো মরিনিও নতুন করে বিতর্কে জড়িয়েছেন গতকাল লিগে ত্রাবজনস্পরের মাঠে ফেনেরবাচের ৩-২ গোলের জয়ের পর। ত্রাবজনস্পর দুটি পেনাল্টি পেয়েছে ম্যাচে – দুটিই ভিএআরের পরামর্শের পর, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে লাল কার্ড না দেখানোর পাশাপাশি তাঁর দলকে প্রাপ্য একটা পেনাল্টি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ মরিনিওর। এ নিয়েই ম্যাচেই রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়ানো মরিনিওকে ডাগআউট থেকে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ম্যাচ শেষে প্রায় ৮ মিনিট দীর্ঘ বিষোদগারে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিকে ধুয়ে দিয়েছেন তিনি।
শুধু তা-ই নয়, তুরস্কের ফুটবল কেন বিদেশে কেউ দেখে না - এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দলের পক্ষে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে ভিএআর ‘ঘুমিয়ে ছিলেন’ জানিয়ে মরিনিও বলেছেন, প্রথমার্ধে ত্রাবজনস্পরের খেলোয়াড়ের জায়গায় তাঁর দলের কেউ লাল কার্ড পাওয়ার মতো অবস্থা হলে ঠিকই ভিএআর জেগে উঠতেন! তাঁর দলের প্রাপ্য পেনাল্টি না দেওয়ার ঘটনা তাঁর ইনস্টাগ্রামে তুলে ধরবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন মরিনিও, তার কিছুক্ষণ পর মরিনিওর ইনস্টাগ্রাম পোস্টে বোঝা গেল, মরিনিও এসব ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিকে পূর্ণতা দেওয়ায় দেরি করেন না!
ম্যাচেও ১০২ মিনিটে ফেনেরবাচে শেষ পর্যন্ত জয়সূচক বনে যাওয়া গোলটি পাওয়ার পর মরিনিওর বুনো উদ্যাপনও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সোফিয়ান আমরাবাতের গোলটির পর ডাগআউট থেকে মাঠে দৌড়ে গিয়ে স্লাইড দেন ৬১ বছর বয়সী পর্তুগিজ কোচ। এছাড়া ত্রাবজনস্পরের এক খেলোয়াড়কে দুকথা শুনিয়েছেন মাঠে, ত্রাবজনস্পরের দর্শককেও খুঁচিয়েছেন। ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময়ে মরিনিওকে দুয়ো দিয়েছেন স্বাগতিক ত্রাবজনস্পরের দর্শক।
বি-ইন স্পোর্টসে শ্লেষাত্মক সুরে মরিনিও বলেছেন, ‘আমি ফেনেরবাচের লোকদেরই দোষ দিই আমাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য। ওরা আমাকে (তুরস্কে রেফারিংয়ের এই অবস্থা নিয়ে) আধা সত্যি বলেছে! পুরো সত্যিটা বলেনি। পুরো সত্যিটা যদি তখন বলত, আমি এখানে আসতামই না! এই আধা সত্যির পর ছেলেদের নিয়ে এখন আমাকে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি সিস্টেমের বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে।’
ম্যাচের ভিডিও রেফারি আতিল্লা কারাওগ্লানকে এরপর ধুয়ে দিয়েছেন মরিনিও, ‘রেফারি না দেওয়ার পরও (ত্রাবজনস্পরকে) দুটি পেনাল্টি দেওয়ার সময়ে তিনি তৎপর ছিলেন, অথচ আমাদের যখন পেনাল্টি প্রাপ্য ছিল তখন সম্ভবত তিনি টার্কিশ চা খেতে গিয়েছিলেন, সে কারণে পেনাল্টিটা দিতে পারেননি। ম্যান অব দ্য ম্যাচ আসলে আতিল্লা কারাওগ্লান!’
মাঠে রেফারি থাকলেও এই ম্যাচে আসলে কারাওগ্লানই মূল রেফারিং করেছেন জানিয়ে শ্লেষের সুরে মরিনিও বলেছেন, ‘আমরা তাঁকে (মাঠে) দেখতে পাইনি, কিন্তু তিনিই রেফারি ছিলেন। মাঠে যিনি ছিলেন, সেই রেফারি তো ছোট বাচ্চা, রেফারি ছিলেন আতিল্লা কারাওগ্লান। অদৃশ্য মানব থেকে তিনি ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন।’
এই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিকে আর ফেনেরবাচের কোনো ম্যাচে দেখতে চান না জানিয়ে মরিনিও এরপর বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আমার কথাটা ফেনেরবাচের প্রত্যেক সমর্থকেরই কথা যে, এই রেফারিকে আর দেখতে চাই না। তাঁকে ভিএআর হিসেবে আর চাই না। মাঠেই চাই না, ভিএআরে আরও বেশি করে চাই না।’
তুরস্কের ফুটবলে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারই হয়ে উঠছে। গত মৌসুমে তুরস্কের প্রথম স্তরের লিগেই আঙ্কারাগুচু ক্লাবের সভাপতি ফারুক কোচা এক ম্যাচের পর মাঠে নেমে রেফারিকে ঘুষি মারেন। কোচাকে তখন আজীবনের নিষেধাজ্ঞা দেয় তুরস্কের ফুটবল ফেডারেশন, সব স্তরের লিগের ম্যাচও সাময়িকভাবে স্থগিত করে। গত ডিসেম্বরে ত্রাবজনস্পরের বিপক্ষেই ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইস্তানবুলস্পর ক্লাবের সভাপতি তাঁর দল নিয়ে মাঠ থেকে চলে যান। মরিনিও-ও গত চার মাসে বেশ কয়েকবার রেফারিং নিয়ে কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমে।
গতকালের এই জয়ের পর অবশ্য লিগের পয়েন্ট তালিকার দুই নম্বরে উঠে এসেছে মরিনিওর ফেনেরবাচে। ১০ ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট তাদের, শীর্ষে থাকা গালাতাসারাইয়ের চেয়ে ৫ পয়েন্ট পিছিয়ে তারা।