উদ্যাপনে এমনই বাঁধনহারা হয়ে পড়েছিলেন লিভারপুলের খেলোয়াড়েরা যে, উদ্যাপনে সঙ্গী হয়ে চোখে আঘাত পাওয়ার দশাই হয়ে গিয়েছিল সে সময়ের লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের।
সময়টা ২০১৬ সাল, ২৩ জানুয়ারির রাত। নরউইচের মাঠে ১৮ মিনিটে এগিয়ে যাওয়া লিভারপুল ৯২ মিনিটে গোল খেয়ে গেল, ম্যাচ তখন ৪-৪ সমতায়। কিন্তু যোগ করা ছয় মিনিট সময়ের পঞ্চম মিনিটে অ্যাডাম লালানার গোলে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে গেল লিভারপুল! গোলের উদ্যাপনে লালানা ছুটে গেলেন দৌড়ে ছুটে আসা ক্লপের দিকে, উদ্যাপনে সঙ্গী মামাদু সাখোর হাতের ধাক্কায় ভেঙে গেল ক্লপের চশমা! কী দারুণ উত্থান-পতনে ভরা এক রাতের শেষে সেদিন হাসি নিয়ে ফিরেছিল লিভারপুল!
সেই রাতের কথা হঠাৎ আসছে কেন! ক্লপ ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার পর এই মৌসুমে লিভারপুলের কোচ হয়েছেন আরনে স্লট, তাঁর অধীনে উড়তে থাকা লিভারপুল আজ লালানার বর্তমান ক্লাব সাউদাম্পটনের মাঠে জিতেছে ৩-২ গোলে। জয়ের ধরন? অতটা রোমাঞ্চে ঠাসা না হলেও উত্থান-পতন তো একই রকম। প্রথমে গোল পাওয়া, এরপর একটা পর্যায়ে পিছিয়ে পড়া, শেষ পর্যন্ত জিতে যাওয়া! নরউইচের পর প্রতিপক্ষের মাঠে এমন ম্যাচ ৮ বছরে আর দেখেনি লিভারপুল।
তেমন আনন্দের স্মৃতি ফেরার রাতে লিভারপুল এর চেয়েও বেশি খুশি সম্ভবত এ কারণে যে, সাউদাম্পটনের মাঠে এই জয়ে পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে থাকা ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ৮ পয়েন্ট এগিয়ে গেছে শীর্ষে জেঁকে বসা লিভারপুল! ১২ ম্যাচ শেষে লিভারপুলের পয়েন্ট ৩১, সিটির ২৩। লিগে সিটির পরের ম্যাচটাই লিভারপুলের মাঠে, যেটিকে সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা এরই মধ্যে বলেছেন, লিগ শিরোপার দৌড়ের নিষ্পত্তির ম্যাচ!
লিভারপুলের জয়ের নায়ক? আর কে, মোহামেদ সালাহ! ক্লপের গুছিয়ে দিয়ে যাওয়া দল নিয়ে স্লট মৌসুমের শুরু থেকেই উড়ছেন, তবে আজ পারফরম্যান্সের বিচারে লিভারপুল খুব ভালো খেলেছে বলা যাবে না। তা নিয়ে অবশ্য এখন লিভারপুল সমর্থকেরা সম্ভবত খুব বেশি উদ্বিগ্নও নন! গতকাল সিটির হারের পর পয়েন্ট তালিকায় ব্যবধান আরও বাড়িয়ে নিতে লিভারপুলের জয়টা দরকার ছিল, সেটি তো এসেছে! এসেছে সালাহর জোড়া গোলের হাত ধরে। শেষদিকে গোলবার বাধা হয়ে না দাঁড়ালে হ্যাটট্রিকও পেয়ে যেতেন সালাহ।
৩০ মিনিটে ডমিনিক সোবোসলাইয়ের গোলে এগিয়ে যাওয়া লিভারপুল বিরতির আগে-পরে দুই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৪২ মিনিটে অ্যাডাম আর্মস্ট্রং সাউদাম্পটনকে সমতায় ফিরিয়েছেন লিভারপুল ডিফেন্ডার ভার্জিল ফন ডাইক মাঝমাঠে ভুল পাস দেওয়ায়, ৫৬ মিনিটে মাতেউস ফের্নান্দেস সাউদাম্পটনকে এগিয়ে দেওয়ার পথেও দায় লিভারপুলের রক্ষণের হ-জ-ব-র-ল অবস্থার।
তবে ত্রাতা হতে সালাহ তো ছিলেন! ৬৫ মিনিটে লিভারপুলকে সমতায় ফেরানো সালাহর গোলটি অবশ্য একটু অদ্ভুতুড়ে। রক্ষণ থেকে লম্বা পাস যখন বক্সে দৌড়ে ঢোকা সালাহর পায়ে এল, তিনি অফসাইডে ছিলেন কি না এ নিয়ে সংশয় ছিল। তবে খেলা তো থামেনি! এর মধ্যেই অদ্ভুতুড়ে গোল – দৌড়ে এগিয়ে গেলেন সাউদাম্পটন গোলকিপার, কিন্তু তিনি বল ধরার আগে সালাহর প্রথম স্পর্শ পড়ল বলে। দেখে মনে হচ্ছিল, সালাহ বলটা নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিলেন। কিন্তু বল তাঁর পায়ের বাইরের অংশে লেগে চলে গেলে জালের দিকে। পোস্ট ছেড়ে এগিয়ে যাওয়া সাউদাম্পটন গোলকিপার ম্যাকার্থিকে পাশ কাটিয়ে বল যখন জালের দিকে যাচ্ছে, সাউদাম্পটন গ্যালারি নীরব। রিপ্লে দেখাল, সালাহ অফসাইড ছিলেন না।
৮৩ মিনিটে সালাহর দ্বিতীয় গোলটি পেনাল্টি থেকে। সালাহরই ক্রস বক্সে যাচ্ছিল লিভারপুল লেফটব্যাক অ্যান্ডি রবার্টসনের দিকে, কিন্তু দৌড়ে এগোতে থাকা রবার্টসনকে জাপটে ধরে রাখেন সাউদাম্পটন ডিফেন্ডার সুগাওয়ারা। পেনাল্টি! নিখুঁত লক্ষ্যভেদে প্রিমিয়ার লিগে অ্যাওয়ে গোলের সেঞ্চুরি পূর্ণ হলো সালাহর।
হ্যাটট্রিক দিয়ে রাতটা আরও রঙিন করা প্রায় হয়েই গিয়েছিল সালাহর। কিন্তু ৮৮ মিনিটে লিভারপুলের দারুণ পাল্টা আক্রমণের পর দিয়াসের থ্রু ধরে সালাহর শট বার কাঁপিয়ে ফিরে গেল।
তা নিয়ে অবশ্য সালাহর বা লিভারপুলের খুব বেশি আক্ষেপ থাকার কথা নয়!