ফুলের মালা ছাড়া কিছু গলায় তুলত না, এখন গলায় হারের মালা

আগের চার মৌসুমেই শিরোপাটা গেছে তাদের ঘরে। সর্বশেষ সাত মৌসুমে ছয়বার। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ইংল্যান্ডে প্রিমিয়ার লিগটা শুরুই হয় ম্যানচেস্টার সিটির শিরোপা কেউ আটকাতে পারবে কি না, এ প্রশ্ন দিয়ে। এই মৌসুমেও তা-ই হয়েছে। মৌসুমের পর মৌসুমে শিরোপামঞ্চে থাকা, গলায় বিজয়ের মালা পরে অভ্যস্ত ম্যান সিটি অক্টোবর পর্যন্ত সেভাবেই এগিয়েছে।

কিন্তু অক্টোবরের পর থেকে কী এক কালোজাদু যে তাদের আটকে ধরেছে, তার উত্তর খুঁজতে গিয়েই সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা অসহায় হয়ে পড়ছেন। একের পর এক ম্যাচে সিটি নামে, আর হারে। ফুলের মালা যাঁদের গলায় ছিল, হারগুলোকে ফুলের জায়গা দিয়ে হারের মালা গড়ছে তারা। আজ প্রিমিয়ার লিগে অ্যাস্টন ভিলার মাঠেও পরিস্থিতি বদলাল না, একেবারে শেষ মুহূর্তে একটা গোল পাওয়া সিটি হেরে গেছে ২-১ গোলে।

৩১ অক্টোবর লিগ কাপে টটেনহ্যামের কাছে হার থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ১২ ম্যাচে মাত্র ১ জয় সিটির, ড্র ২টি, বাকি ৯ ম্যাচেই হার! লিগে মাঝে এই মাসের শুরুতে নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে জয় আর ক্রিস্টাল প্যালেসের মাঠে ড্র-তে মনে হয়েছিল, বুঝি হারের ধারায় ছেদ পড়ছে। কিন্তু ছয়দিন আগে নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে নিজেদের মাঠে শেষ মুহূর্তে দুই গোল খেয়ে হারের পর আজ আবার হারল গার্দিওলার সিটি। সব মিলিয়ে লিগে সর্বশেষ ৮ ম্যাচে ৬ হার, ১ ড্র, ১ জয়!

এমন জঘন্য ফর্মের ফল তো পয়েন্ট তালিকায় পড়ারই কথা। ২৬-২৭ অক্টোবরে লিগের নবম সপ্তাহ শেষেও লিগশীর্ষে থাকা সিটি এখন নামতে নামতে এই মুহূর্তে লিগের ৬ নম্বরে নেমে গেছে। অন্য দলগুলোর ফল তাদের পক্ষে গেলে এই সপ্তাহ শেষ হতে হতে আরও এক থেকে তিন ধাপ নেমে যাওয়ারও শঙ্কায় তারা!

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রদ্রি চোটে পড়ার কারণেই কি সিটির এই অবস্থা? হতে পারে! রদ্রিকে ছাড়া যেন দলের সমন্বয়ই ঠিক করতে ঘাম ঝরে যাচ্ছে গার্দিওলার! পাশাপাশি এত এত হারে দলের আত্মবিশ্বাসেও তো চিড় ধরে, সেটিই ঠিক করার সুযোগ পাচ্ছেন না গার্দিওলা। আত্মবিশ্বাস না থাকা একটা দলের ফুটবল যেমন হয়, আজ ভিলার মাঠেও সিটিকে তেমনই দেখা গেল।   

ভিলার কৃতিত্ব অবশ্য খাটো করে দেখানো যাবে না। মাঝমাঠে তিয়েলেমানকে কেন্দ্র করে খেলেছে দলটা, তাঁর পাশে ম্যাকগিন দৌড়েছেন প্রাণপণ, আর সামনে মরগান রজার্স ও জন দুরান সিটিকে ভুগিয়েছেন। অন্যদিকে সিটি? বল পায়ে না থাকা অবস্থায় দারুণ সংগঠিত ভিলার সামনে সিটির মাঝমাঠে প্রাণ জোগানোরই কেউ থাকল না। বলের দখলে সিটি এগিয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা বারবার ডান থেকে বামে আর বাম থেকে ডানেই ঘুরেছে যেন! আক্রমণে গতি আর আসেনি। মাঝমাঠ ধরেও সিটির এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তেমন চোখে পড়ল না। আক্রমণের সামনে আর্লিং হলান্ড কিছু করে দেখাবেন কী, তাঁর কাছে বলের জোগানই তেমন গেল না!

অন্যদিকে ভিলা সুযোগ কাজে লাগানোয় দক্ষতা দেখিয়েছে দারুণভাবে। ১৬ মিনিটে প্রথম গোলটাই যেমন, মাত্র তিন পাসে নিজেদের গোলকিপার থেকে বল নিয়ে গেল সিটির পোস্টে! গোলকিপার মার্তিনেস পাস দিলেন দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত দৌড়ে মাঝমাঠে পকেট তৈরি করে পাস নেওয়া তিয়েলেমানকে। তাঁর অসাধারণ থ্রু গেল রজার্সের দিকে, সিটির রক্ষণ তাতে হা হয়ে গেল। সিটির দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার যতক্ষণে হুঁশ দৌড়াতে শুরু করেছেন, রজার্স বল নিয়ে বক্সে। তাঁর পাশে পাশে উঠে গেছেন এই মৌসুমে কোপা আমেরিকার পর লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করায় দারুণ দক্ষতার প্রমাণ রাখা কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার জন দুরানও। রজার্সকে আটকাতে সিটি গোলকিপার এগিয়ে যাচ্ছিলেন, রজার্স আলতো করে পাসটা বাড়িয়ে দিলেন দুরানের দিকে। তাঁর প্রথম স্পর্শের শট সিটি গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে জালে!

দ্বিতীয়ার্ধে রজার্সই বনে গেলেন গোলদাতা। পাল্টা আক্রমণের শুরুটা রজার্সই করেছিলেন, মাঝমাঠে তাঁর পাস ধরে তিয়েলেমানের পর বক্সের সামনে বল নিয়ে গেলেন ম্যাকগিন। বক্সে সিটির চার ডিফেন্ডার ছিলেন বটে, কিন্তু পজিশনিং ঠিক ছিল না তাঁদের। যেন জোড়ায় জোড়ায় ডিফেন্ডিং করছিলেন। তাঁদের সামনেই আলতো করে রজার্সের দিকে বাড়িয়ে দিলেন ম্যাকগিন, ডান পা থেকে বাঁ পায়ে দারুণ আড়াআড়ি ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে দিলেন সিটিরই সাবেক খেলোয়াড় রজার্স।

তাতে অদ্ভুত এক ‘ধারা’ বজায় থাকল সিটির – সর্বশেষ আট ম্যাচের সবগুলোতেই অন্তত দুটি করে গোল খেয়েছে গার্দিওলার দল!

পুরো ম্যাচে তেমন আক্রমণে ভয় ধরাতে না পারা সিটি শেষ মুহূর্তে ফোডেনের গোলে ফেরার আশা জাগিয়েছিল বটে, তবে তখন যোগ করা সময়ের মিনিট বাকি আর একটি। তাতে একটি ফ্রি কিক পেলেও সেটি সোজা ভিলা গোলকিপার মার্তিনেসের হাতেই গেছে। নিশ্চিত হলো, আরেকটি ম্যাচ হারছে সিটি।