শুধু নামের ভারে বিবেচনা করলে মনে হবে, কী দুর্দান্ত এক ত্রয়ী! একদিকে লিওনেল মেসি, আরেকদিকে নেইমার, আর সামনে কিলিয়ান এমবাপ্পে – পিএসজি স্বপ্নের মতো এক ত্রয়ীই তো সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। বার্সেলোনায় মেসি-নেইমারের সঙ্গে লুইস সুয়ারেসের ‘এমএসএন’, রেয়াল মাদ্রিদে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, গ্যারেথ বেল ও করিম বেনজেমার ‘বিবিসি’, কিংবা লিভারপুলে মোহামেদ সালাহ, রবের্তো ফিরমিনো ও সাদিও মানের ত্রয়ীর মতো, কিংবা তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার মতোই আরেক ত্রিফলা হওয়ার সব সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু এমএনএম ত্রয়ী পিএসজিতে করলেন কী? খেলায় সমন্বয় মাঝে কিছু সময় দেখা গেলেও দুই বছরের বাকিটা সময়ে তিনজনকে কখনো এক সুরে বাঁধা মনে হয়নি। বরং আজ এমবাপ্পের সঙ্গে নেইমারের ঝামেলা, তো কাল এমবাপ্পের সঙ্গে মেসির দ্বন্দ্বের গুঞ্জন বারেবারে সামনে এসেছে।
সময়ের আবর্তে তিনজনই এখন পিএসজি ছেড়েছেন। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে মেসি যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টার মায়ামিতে, বছর তিনেক আগেই ৩০ পেরিয়ে যাওয়া নেইমার সৌদি আরবের আল হিলালে, আর বয়সে ছোট এমবাপ্পে ক্যারিয়ারের মধ্যগগণে গিয়ে যোগ দিয়েছেন রেয়াল মাদ্রিদে। তিনজনের সম্পর্কে জটিলতার গুঞ্জন নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন নেইমার। বলেছেন, মেসি পিএসজিতে যাওয়ার পর তাঁর প্রতি হিংসা জমে গিয়েছিল এমবাপ্পের! হিংসাটা কেন? নেইমারের সঙ্গ ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে দেখে!
নেইমার ২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে গিয়েছিলেন, সে বছরই ধারে মোনাকো থেকে এমবাপ্পেকে নিয়ে যায় পিএসজি। আর বার্সেলোনা অধ্যায় শেষে মেসি পিএসজিতে যান ২০২১ সালে। মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেকে নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের শূন্যতা ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিল পিএসজি, কিন্তু তা আর হলো কই! বরং যে দুই মৌসুম তিনজন একসঙ্গে খেলেছেন, দুবারই শেষ ষোলোতেই বিদায় নিয়েছে পিএসজি।
প্রথম মৌসুমে তবু মেসির ক্যারিয়ারের শেষবেলায় গিয়ে প্রথমবারের মতো নতুন কোনো ক্লাবে মানিয়ে নেওয়া, নেইমারের চোট আর কোচ মরিসিও পচেত্তিনো তিনজনকে একসঙ্গে খেলানোর রাস্তা না পাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মৌসুমে? ক্রিস্তফ গালতিয়েখঁ-এর কৌশলে মেসি আর নেইমারকে ‘ডাবল টেন’ রেখে সামনে এমবাপ্পেকে খেলানো মৌসুমের শুরুতে কাজে এসেছিল, পিএসজি উড়ছিল। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপের পর এমবাপ্পের ‘পিভট গ্যাং’ লেখা এক ইনস্টাগ্রাম স্টোরির পরই সব ছারখার। গালতিয়েখঁ কৌশল পাল্টালেন, পিএসজি ধুঁকল। আর এগোতেই পারল না।
ওই মৌসুমের শুরু থেকেই এমবাপ্পে পিএসজিতে দক্ষিণ আমেরিকান খেলোয়াড়ের আধিক্য পছন্দ করছেন না বলে গুঞ্জন ভেসেছিল। আনহেল দি মারিয়া, লিয়ান্দ্রো পারেদেসদের ক্লাব ছেড়ে যাওয়া যে গুঞ্জনে বাতাস জুগিয়েছে। ততদিনে এমবাপ্পেকে চুক্তিতে সই করাতে পিএসজি তাঁকে দলবদলের ক্ষেত্রেও কিছু ক্ষমতা দিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল কিনা! শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে পিএসজির বাদ পড়ার পর মেসি-নেইমারকে দুয়ো আর গালিতে ভাসায় পিএসজির উগ্র সমর্থকগোষ্ঠী, দুজনই মৌসুম শেষে ক্লাব ছাড়েন। এমবাপ্পে অবশ্য এর এক মৌসুম পর আর পিএসজিতে থাকেননি।
তা তখন আসলে কী হয়েছিল তিনজনের মধ্যে? সম্পর্কটা কেমন ছিল? ব্রাজিল কিংবদন্তি রোমারিওর সঙ্গে ইউটিউব পডকাস্ট ‘দে কারা কম ও কারা’-তে এ নিয়ে কথা বলেছেন নেইমার। এমবাপ্পে কি বিরক্তিকর ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নেইমার বলেছেন, ‘না, ও তেমন না। ওর সঙ্গে কিছু ঝামেলা ছিল আমার, ঝগড়া হয়েছে, তবে ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর ও আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।’
পিএসজিতে যাওয়ার পর নেইমার শুরুতে এমবাপ্পেকে আগলেই রেখেছেন সব সময়। তখন তো বার্সেলোনায় নেইমারের শুরুতে মেসি তাঁকে যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, সে প্রসঙ্গ টেনে এমবাপ্পেকে পথ দেখানোর কথা নেইমার সরাসরিই বলতেন। সম্পর্কটা শুরুতে ভালো ছিল বলে পডকাস্টেও বলেছেন নেইমার, ‘আমি ওকে গোল্ডেন বয় ডাকতাম। সব সময় ওর সঙ্গে খেলতাম, বলতাম যে ও সেরাদের একজন হবে। ওর সঙ্গে সব সময় কথা বলেছি, সাহায্য করেছি। ও আমার বাসায় আসত, আমরা রাতে ডিনার করতাম একসঙ্গে।’
কিন্তু মেসি ক্লাবে যোগ দেওয়ার পরই সব পাল্টে গেছে বলে জানালেন নেইমার। কী হয়েছে? নেইমারের বর্ণনা, ‘আমাদের (এমবাপ্পে-নেইমার) কয়েকটা বছর বেশ ভালো কেটেছে। কিন্তু মেসি আসার পর ও (এমবাপ্পে) একটু ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। ও (এমবাপ্পে) আমাকে কারও সঙ্গে ভাগ করতে চাইত না (হাসি)। এরপর কিছু কথা কাটাকাটি হলো, আচরণে বদল দেখা গেল।’
একটা সুন্দর ত্রয়ীর সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেল।