‘প্রিয় ম্যানচেস্টার’ সম্বোধনে শুরু চিঠি। কালোর ওপর ধূসর ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর তাঁর ছবিই বলে দিচ্ছিল, এ চিঠির আবেগে জড়িয়ে বিদায়ের বেদনা। কেভিন ডি ব্রুইনা তা বুঝিয়েই লিখলেন, ‘এটা দেখেই হয়তো আপনারা বুঝে ফেলেছেন (চিঠিটা) কোন দিকে যাচ্ছে।’
কোন দিকে গেলেন ডি ব্রুইনা? ম্যানচেস্টার সিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দরজার দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৩৩ বছর বয়সী বেলজিয়ান প্লেমেকারের আবেগঘন চিঠি জানিয়ে দিয়ে গেল, এই মৌসুমের শেষেই ম্যানচেস্টারের নীল অংশকে শুধু রঙে নয়, বেদনায়ও নীল হতে হচ্ছে। মৌসুম শেষে ১০ বছরের সম্পর্কটার শেষ টেনে দিচ্ছেন ডি ব্রুইনা। চুক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে আগামী জুনে, সেটি আর নবায়ন না করে নতুন কোনো ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর।
তাঁর বিদায়ে পেপ গার্দিওলার অধীন সিটি একটা যুগের শেষ দেখল আক্ষরিক অর্থেই। ২০১৭ সালে গার্দিওলা সিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর যে স্কোয়াড পেয়েছিলেন প্রথম দিনে, সেখানে এ মৌসুমে শুধু ডি ব্রুইনাই ছিলেন। বাকিদের কেউ অন্য ক্লাবে, কেউবা অবসরে। আজ ডি ব্রুইনারও বিদায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হলো, মৌসুম শেষে গার্দিওলার শুরুর দিনের কেউ আর থাকছেন না।
‘সোজাসুজিই বলে দিই, সামনের দুয়েকটা মাস হতে যাচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটির খেলোয়াড় হিসেবে আমার শেষ মাস। এই চিঠির কোনো অংশই লেখা সহজ নয়, তবে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে আমরা জানি এমন দিন কোনো না কোনো এক সময় আসবেই। সেই দিনটা যখন এসেই গেছে, আমার কাছ থেকেই সবার আগে সেটা জানতে পারা আপনাদের প্রাপ্য’ – চিঠিতে লিখেছেন ডি ব্রুইনা।
চিঠির এর পরের অংশটুকু তেমনই হলো, যেমনটা যেকোনো বিদায়ী বার্তায় থাকে। ম্যানচেস্টার সিটির অংশ হতে পেরে তিনি কতটা গর্বিত, ভক্তদের ভালোবাসা তাঁকে কতটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল এতগুলো বছর, সে আবেগের টান পেছনে রেখে যাওয়া কতটা কঠিন…। আর শেষে থাকল প্রতিশ্রুতি, ম্যানচেস্টারই আজীবন থাকবে তাঁর ঘর।
যা বলার, তা তো চিঠিতে সুন্দর বর্ণনায় বলেই দিয়েছেন ডি ব্রুইনা। তার জবাবে আর কী বলবে সিটিজেনরা? অনির্বচনীয় যে অনুভূতি হয়ে তিনি দশটি বছর ছিলেন সিটির সমর্থকদের মনে, সেটির যে কোনো বর্ণনা হয় না। কী কী জিতেছেন তিনি সিটির হয়ে, সেটা গুগল না করেই বলে দিতে পারবেন সিটি-অন্তপ্রাণ যেকোনো সমর্থক। ৬টা প্রিমিয়ার লিগ, পাঁচটা ক্যারাবাও কাপ, দুটা এফএ কাপ বলবে ইংল্যান্ডে দাপটের কথা, ইউরোপেও শূন্য ছিল না ডি ব্রুইনার সময়ের সিটি – জিতেছে ২০২৩ চ্যাম্পিয়নস লিগ।
এ তো গেল দলীয় শিরোপা, ব্যক্তিগত অর্জনের হিসাব করবেন না? দুবার প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন ডি ব্রুইনা, ৩ বার জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগের মৌসুমসেরা প্লেমেকারের পুরস্কার, প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা দলে জায়গা পেয়েছেন ৫ বার, ফিফপ্রোর বর্ষসেরা দলে ৫ বার, উয়েফার বর্ষসেরা দলে ৩ বার…অর্জনের ফিরিস্তি টানতে গেলে শুধু লম্বাই হবে!
আর রেকর্ডবই বলবে ডি ব্রুইনার শ্রেষ্ঠত্বের কথা। ২০১৫ সালে ডি ব্রুইনার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে হিসেব করলে, গত দশ বছরে প্রিমিয়ার লিগে তাঁর অ্যাসিস্ট ১১৭টি, গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৮২৭টি। এ সময়ে ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগ মিলিয়েই আর কোনো খেলোয়াড়ের এত অ্যাসিস্ট বা চান্স ক্রিয়েশনের রেকর্ড নেই। একজন প্লেমেকারের জন্য এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে!
‘কোচে’স ড্রিম’ ধরনের এমন একজনের বিদায়ে সবচেয়ে বেশি মন খারাপ কার হওয়ার কথা, সেটা সম্ভবত না বললেও চলে। সিটি কোচ গার্দিওলা তো আর এমনি এমনি আজ সংবাদ সম্মেলনে বলেননি, ‘আজকের দিনটা কষ্টের, কারণ আমাদের একটা অংশ আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে। যেমন ভানসাঁ কম্পানি ছেড়ে গিয়েছিল, বা সের্হিও আগুয়েরো কিংবা দাভিদ সিলভা – এ ধরনের খেলোয়াড়েরা এত অসাধারণ অবদান রেখেছিল।’ ডি ব্রুইনার অবদান নিয়ে পরে একবাক্যেই যা বলার বলে দিয়েছেন গার্দিওলা, ‘ও আমাদেরকে দেখিয়েছে মানবিকতা, আর (খেলার দিক থেকে তো) অবশ্যই…গত এক দশকে আমাদের সাফল্যে ওর অবদান নিশ্চয়ই আমাকে বলে ব্যাখ্যা করতে হবে না! ওকে ছাড়া এমন কিছু কল্পনা করাও অসম্ভব!’
তা সিটি অধ্যায় শেষে কোথায় যাচ্ছেন ডি ব্রুইনা? সিটিই বা তাঁর অভাব কাকে দিয়ে ঘোচানোর চেষ্টা করবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে মৌসুম শেষে, তবে গুঞ্জন তো আর বসে নেই। এই মৌসুমের শুরু থেকেই ডি ব্রুইনার সৌদি আরবে যাওয়ার গুঞ্জন আওয়াজ পেয়েছিল, তার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের গুঞ্জন। আর সিটিতে ডি ব্রুইনার বিকল্প? আপাতত বায়ার লেভারকুসেনের ফ্লোরিয়ান ভার্টশের নামই বেশি শোনা যাচ্ছে।