বার্সায় উড়ছেন রাফিনিয়া

জুলাই-আগস্টের পর যাঁর থাকারই কথা ছিল না, তাঁরই দাপট দেখছে সবাই

গত বছরের জুলাই-আগস্টে যখন ইউরোপের ফুটবলে গ্রীষ্মকালীন দলবদল চলছিল, সেটির শেষে বার্সেলোনায় রাফিনিয়াকে আর দেখা যাবে, এমনটা বোধ হয় বার্সারই অনেক সমর্থক ভাবেননি। ২০২২ সালে লিডস ইউনাইটেড থেকে বার্সায় যাওয়ার পর তো কখনোই কাতালান ক্লাবটিতে জায়গা পাকা করতে পারেননি। ওদিকে বার্সার আর্থিক দৈন্য মিলিয়ে প্রতি দলবদল মৌসুমেই রাফিনিয়াকে বার্সা বিক্রি করে দেওয়ার গুঞ্জন বাতাসে ভেসেছে। গত জুলাই-আগস্টেও ব্যতিক্রম হয়নি।

কিন্তু ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে ৮ মাস পরে বর্তমান সময়ে এসে কী দেখা যাচ্ছে? বার্সেলোনা আরেকবার মৌসুমে তিন শিরোপার তিনটিই জেতার দৌড়ে আছে, হানসি ফ্লিকের অধীনে তরুণ দলটা খেলছেও মুগ্ধতাজাগানিয়া ফুটবল, আর সে দলের সবচেয়ে দাপট দেখানো খেলোয়াড়দের একজন রাফিনিয়া। অনেকের চোখে সবচেয়ে দাপুটে ফুটবলারই তিনি।

রবার্ত লেভানদফস্কি গোল করছেন, তরুণ লামিন ইয়ামাল পায়ের কাজে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন, মাঝমাঠে পেদ্রি নিজেকে বিশ্বের সেরা প্লেমেকারদের একজন হিসেবে প্রমাণ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু গোলে-অ্যাসিস্টে, প্রেসিংয়ে, ক্ষিপ্র পাল্টা আক্রমণে বল পায়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভয়ধরানো দৌড়ে রাফিনিয়াই বার্সার মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন। এমনই অবস্থা যে, এ বছরের বর্ষসেরা ফুটবলারের সব পুরস্কারের তালিকায়ও ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের নাম ওপরের সারিতেই থাকছে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে গতকাল নিজেদের মাঠে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে ৪-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বার্সা, সে পথে দলের প্রথম গোলটি করা রাফিনিয়া পরে আরও দুটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। গোলটাতে যদিও রাফিনিয়ার ‘স্বার্থপরতা’ দেখছেন অনেকে, পাউ কুবার্সির শট গোললাইন পেরোনোর পথেই ছিল, শেষ মুহূর্তে রাফিনিয়া পা ছুঁইয়ে গোলটা করেছেন। তিনি পা না লাগালেও গোলই হতো। যদিও রাফিনিয়ার পক্ষে যুক্তি আসতে পারে, রাফিনিয়া দৌড়ের গতিপথে যেভাবে পা ছুঁইয়েছেন, তাতে তিনি গোলটা নিজের নামে করার লোভে নয়, বরং বলটা গোলের ভেতর ঢুকতে না-ও পারে ভেবে অবচেতন মনেই বলে পা লাগিয়েছেন। পরে অবশ্য কুবার্সির কাছে দুঃখপ্রকাশও ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড করেছেন বলে জানিয়েছে স্প্যানিশ অনেক সংবাদমাধ্যম।  

তা যা-ই হোক, বার্সার দাপুটে জয়ে রাফিনিয়া পরে আরও দুই গোল করিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দাপট দেখানোর জন্য অন্যের গোল কাড়তে হয় না। সে অবশ্য মৌসুমজুড়েই দেখিয়ে চলেছেন। তাতে রেকর্ডের পর রেকর্ডও তাঁর নামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে।

গতকালের গোল আর অ্যাসিস্ট মিলিয়ে এই মৌসুমে সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে রাফিনিয়ার গোল হলো ২৮টি, অ্যাসিস্ট হলো ২০টি। রাফিনিয়ার ক্যারিয়ারে এত সফল মৌসুম আর নেই।

শুধু কি নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া? বার্সার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল আর অ্যাসিস্ট মিলিয়ে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখার রেকর্ডে লিওনেল মেসির পাশেও বসে গেছেন রাফিনিয়া। ২০১১-১২ মৌসুমে ১১ ম্যাচে ১৯টি গোলে অবদান রেখেছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা, গতকালের পর এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে রাফিনিয়ারও ১১ ম্যাচে গোলে অবদানের সংখ্যা ১৯!

বিবিসির ম্যাচ অব দ্য ডে অনুষ্ঠানে গতকাল ম্যাচ শেষে তাই ইংলিশ ফুটবল বিশ্লেষক স্টিফেন ওয়ারনক বলছিলেন, ‘অবিশ্বাস্য অর্জন এটা। আরও সম্ভাব্য চারটি ম্যাচ হাতে থাকা অবস্থায়ই আপনার নাম যদি মেসির সঙ্গে একই ব্র্যাকেটে উচ্চারিত হয়…অসাধারণ সেটা!’

শুধু বার্সা আর মেসির রেকর্ডেই-বা সীমাবদ্ধ থাকা কেন? আর তিনটি গোলে অবদান রাখলে তো চ্যাম্পিয়নস লিগে সব দল মিলিয়েই কোনো খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বেশি গোলে অবদানের রেকর্ড ভেঙে ফেলার হাতছানি রাফিনিয়ার সামনে। রেকর্ডটা বর্তমানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর, ২০১৩-১৪ মৌসুমে ২১ গোলে অবদান রেখেছিলেন রোনালদো। রাফিনিয়া যেভাবে ছুটছেন, তাতে রোনালদোর সে রেকর্ড ভেঙে দেওয়াও তো ২৮ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ানের জন্য খুব কঠিন বলে মনে হচ্ছে না।

গতকালের দাপুটে জয়ে বার্সা সেমিফাইনালে চলেই গেছে বলা যায়, তার মানে চ্যাম্পিয়নস লিগে অন্তত আরও তিনটি ম্যাচ পাচ্ছে দলটা। সেমিফাইনাল পেরিয়ে বার্সা ফাইনালেই উঠে গেলে ম্যাচ পাবে আরও চারটি। সে ক্ষেত্রে রাফিনিয়া মেসির রেকর্ড ছাড়িয়ে রোনালদোর রেকর্ডও যে ভেঙে দেবেন, সে বাজি সম্ভবত ধরাই যায়!

এ তো গেল গোল আর অ্যাসিস্টের হিসাব, বার্সার জন্য গোলের সুযোগ তৈরিতেও তো রাফিনিয়া অনন্য। এ পর্যন্ত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সার সতীর্থদের জন্য ৩৪টি গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন রাফিনিয়া, যা এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে সব খেলোয়াড়ের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ইয়ামাল আর লেভানদফস্কিদের আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠার পথে রাফিনিয়ার অবদান অস্বীকার করবে কে! এমনি এমনিই তো আর বালন দ’রের দৌড়ে তাঁর নাম আসছে না!

ইয়ামাল-লেভার সঙ্গে রাফিনিয়ার এমন দারুণ সমন্বয়ের কারণে বার্সাও আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। যা ম্যাচ অব দ্য ডে-তে বলছিলেন ইংল্যান্ডের মেয়েদের দলের সাবেক তারকা ও বর্তমানে ফুটবল বিশ্লেষক ক্যারেন কেয়ার্নি, ‘এ নিয়ে টানা ২৩ ম্যাচে অপরাজিত বার্সা। ওরা বল পায়ে রাখতে জানে, বলের দখলে দাপট দেখায়, আর আপনি ওদের সুযোগ দিলেই ওরা নিজেদের ভয়ংকর রূপটা দেখিয়ে দেবে। ওদের আক্রমণভাগ এমন যে…ওরা আপনার চেয়ে বেশি গোল করেই ফেলে! ওদের মুখোমুখি হতে তাই যে কেউই ভয় পাবে।’