গত মার্চে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের জন্য ছিল বিশেষ কিছু। এ ম্যাচ দিয়েই যে বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক হয়েছে হামজা চৌধুরীর! ভারতের জন্যও এ ম্যাচ ছিল প্রত্যাবর্তনের গল্প – কিংবদন্তি স্ট্রাইকার সুনীল ছেত্রী এ ম্যাচ দিয়ে অবসর ভেঙে ফিরেছিলেন।
কিন্তু শিলংয়ে ম্যাচটাতে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির মিল হয়নি। গোলশূন্য ড্র হয়েছে ম্যাচ। সে ম্যাচে ভারতের খেলোয়াড়দের নিবেদন আর দেশপ্রেম নিয়েই এবার প্রশ্ন উঠেছে। এবং প্রশ্নটা তুলেছেন ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের টিম ডিরেক্টর ও সাবেক গোলকিপার সুব্রত পল। যদিও পলের দাবি, তিনি দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি!
ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে লেখা, গত এপ্রিলে টেকনিক্যাল কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ভারতের আর্জুনা পুরস্কার পাওয়া সাবেক গোলকিপার সুব্রত সভায় ‘সিনিয়র জাতীয় দল যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে আছে, সেগুলো তুলে ধরেছেন। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে খেলোয়াড়দের ভাবভঙ্গি, দেশপ্রেম এবং পুরো দলের দলীয় চেতনা নিয়ে প্রশ্নও আছে।’ হিন্দুস্তান টাইমস সভার কার্যবিবরণীটি দেখেছে বলে তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে।
এ নিয়ে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতের ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কিংবদন্তি স্ট্রাইকার বাইচুং ভুটিয়া হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছেন, ‘পলের উচিত এমনটা কেন বলেছে সেটা ব্যাখ্যা করা। এবং ওর কাছে কোন কোন খেলোয়াড় নিজেদের সেরাটা দেয়নি বলে মনে হয়েছে তাদের নাম জানানো উচিত, যাতে ওই খেলোয়াড়দের আর পরে দলে নেওয়া না হয়।’ পল আর ভুটিয়া একই সঙ্গে লম্বা সময় ভারতীয় দলে খেলেছেন।
৩৮ বছর বয়সী পল আবার গত পরশু খেলোয়াড়দের তাড়ণার অভাব বলতে কী বোঝাচ্ছেন, সে নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে টেনে এনেছেন বাইচুং ভুটিয়াসহ সাবেক আরও অনেক সতীর্থের প্রসঙ্গ, ‘আমার সিনিয়র এবং সমসাময়িক অনেক খেলোয়াড়দের মধ্যে যে তাড়ণা দেখেছি সব সময়, সেটা (ভারতের বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে) দেখতে পাইনি। (সিনিয়র ও সমসাময়িকদের) নাম নিতে গেলে বাইচুং ভুটিয়া, ক্লাইম্যাক্স লরেন্স, সামির নায়েক, দীপক মন্ডলসহ কয়েকজনের নাম তো সহজেই বলে দেওয়া যায়।’ এরপর বর্তমান খেলোয়াড়দের নিয়ে তাঁর মন্তব্যের প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘জাতীয় দলের ডিরেক্টর হিসেবে আমার দায়িত্বই হলো এমন ব্যাপারগুলো তুলে ধরা। তাতে যদি আমি অজনপ্রিয় হয়ে পড়ি, সেটাই হোক!’
পল দায়িত্বটাতে নিয়োগ পেয়েছেনই গত ফেব্রুয়ারি মাসে। বাংলাদেশ ম্যাচটা ছিল তাঁরও দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ! সে ম্যাচের আগে মালদ্বীপের বিপক্ষে একটা প্রীতি ম্যাচে ভারত ৩-০ গোলে জিতেছিল। সে ম্যাচ নিয়েও পলের বিশ্লেষণ, ‘এমনকি ওই (মালদ্বীপ) ম্যাচেও আমি যেমন চেয়েছিলাম পারফরম্যান্স তেমন ছিল না। সেটাও টেকনিক্যাল কমিটির কাছে বলেছি।’
জাতীয় দলের টিম স্পিরিট নিয়ে অবশ্য তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘এটা এমন একটা দল যেখানে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে, আবার এমনও অনেকে আছে যাদের অভিজ্ঞতা কম। পালাবদলের মধ্য দিয়ে যেতে থাকা একটা দল এটা, হয়তো সে কারণেই খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়টা এখনো হয়ে ওঠেনি।’
তবে খেলোয়াড়দের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তিনি তোলেননি জানিয়ে পলের পাল্টা দাবি, সভার যে কার্যবিবরণী থেকে তাঁর এই মন্তব্যের কথা জানা গেছে, সেই কার্যবিবরণী লেখার সময়ে কোন কথাকে কোন ধরনের শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচে ভারতের পারফরম্যান্স নিয়ে অবশ্য ভারতের কোচ মানোলো মার্কেসই খুশি ছিলেন না। সেদিন র্যাঙ্কিংয়ে ১২৬তম ভারতের বিপক্ষে ১৮৫তম বাংলাদেশ আরেকটু ভয়ডরহীন খেললে জিততেও পারত বলে মনে হয়েছে অনেকের। ভারত কোচ মার্কেসও ম্যাচের পর নিজ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে বলেছেন, ‘খুবই খুবই বাজে।’ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের দলের দায়িত্ব নেওয়া স্প্যানিশ কোচ ওই ম্যাচের আগে তাঁর প্রতিটি অনুশীলন সেশনে খেলোয়াড়দের উন্নতি হয়েছে দাবি করে বললেন, ‘আজ (বাংলাদেশ ম্যাচে) আমরা দুই-তিন ধাপ পিছিয়ে গেলাম।’
বাংলাদেশ ম্যাচের পরও অবশ্য ভারতের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এই জুনে প্রীতি ম্যাচে থাইল্যান্ডের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচে ২-০ গোলে হেরেছে ভারত, এরপর এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে হংকংয়ের কাছে হেরেছে ১-০ গোলে।
তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে খেলোয়াড়দের তাড়ণা নিয়ে প্রশ্ন সুব্রত পল ছাড়া আর কেউ তুলেছেন বলে জানা যায়নি। অবশ্য পলের খেলোয়াড়ি জীবনের ইতিহাস জানলে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তাঁর চাওয়া কত বেশি, সে ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ভারতের হয়ে ৬৭ ম্যাচ খেলা পল ২০০৭ নেহেরু কাপে ভারতকে জেতানোর পথে হয়েছিলেন সেরা গোলকিপার। ২০০৯ সালে ভারত শিরোপা ধরে রাখতে পেরেছে টাইব্রেকারে তাঁর সেভের কারণেই। ২০১১ এশিয়ান কাপে সাউথ কোরিয়ার বিপক্ষে ভারত ৪-১ গোলে হারলেও ব্যবধানটা যে আরও বড় হয়নি, সেটা পলের কারণেই – এমনই যে, সে ম্যাচে একের পর এক সেভ করা পলের নামই দিয়ে দেওয়া হয় ‘স্পাইডারম্যান!’ ২০১৭ এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপের সেমিফাইনালে মায়ানমারের বিপক্ষে ভারতের ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে নড়ে যাওয়া আঙুল নিয়েও খেলে গেছেন পল, পরে আঙুলটা পাকাপাকিভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে!
আরও ঝামেলায় পল
শুধু দল নিয়ে মন্তব্যের কারণেই হয়, একটি ই-মেইলের ‘শব্দচয়নে ভুল’ করেও বিতর্কের কেন্দ্রে সুব্রত পল। গত ২৪ জুন পলের দিক থেকে একটি ই-মেইল যায়, প্রাপকের কথা জানায়নি হিন্দুস্তান টাইমস। তবে সেই ই-মেইলে পল লিখেছেন, ভারতের সিনিয়র জাতীয় দলের জন্য একজন নতুন কোচ নিয়োগ দিতে হবে। এই ই-মেইল আবার ভারতের ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) সভাপতি কল্যান চউবের কথার উল্টো দিকে যায়। কল্যান বলেছিলেন, আগামী ২ জুলাই নির্বাহী কমিটির সভায় জাতীয় দলের কোচের পারফরম্যান্স নিয়ে বিশ্লেষণ হবে।
এই ই-মেইল ছড়িয়ে পড়ার পর অবশ্য এর ব্যাখ্যায় সুব্রত পল বলেছেন, ‘ভুল ই-মেইল পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা নির্বাহী কমিটির সভায় মানোলোর (ভারতের কোচ) পারফরম্যান্স নিয়ে বিশ্লেষণ করব, নতুন কোচের নিয়োগ নিয়ে আলোচনার জন্য সভা ডাকা হয়নি। মানোলো এখন পর্যন্ত ভারতের কোচই আছেন।’