ফিলিস্তিনের গাজায় প্রায় দু বছর ধরে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে নারী ও শিশুসহ ফিলিস্তিনের প্রায় ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। হতাহত হয়েছেন আরও অনেকে। গাজার অধিকাংশ মানুষই এখন বাস্তুচ্যুত।
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানববন্ধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। পিছিয়ে নেই ক্রীড়াঙ্গনও। গাজা যুদ্ধের দায়ে ইসরায়েলকে ফুটবলসহ ক্রীড়াঙ্গন থেকে নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে।
দেশটির সদস্যপদ স্থগিত করার ব্যাপারে ভাবছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (উয়েফা)। এ জন্য আগামী সপ্তাহে ভোটাভুটির আয়োজন করতে যাচ্ছে উয়েফা। গতকাল বৃহস্পতিবার রয়টার্স, এপি, ইএসপিএনসহ একাধিক সংবাধমাধ্যমে উঠে এসেছে বিষয়টি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উয়েফার কার্যনির্বাহী কমিটির দুই সদস্য এপিকে জানিয়েছেন, ২০ সদস্য বিশিষ্ট এ কার্যনির্বাহী কমিটির অধিকাংশই ইসরায়েল জাতীয় দল ও ক্লাবগুলোকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট দেবেন বলে আশা করছেন তারা। আর যদি সেটা বাস্তবায়ন হয়, তবে আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপসহ আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না ইসরায়েল।
আগামী ১১ ও ১৫ অক্টোবর বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নরওয়ে ও ইতালির বিপক্ষে ম্যাচ আছে ইসরায়েলের। এরই মধ্যে এ দুটি ম্যাচ নিয়ে আলোচনার কমতি নেই। ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচের টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয় গাজার মানবিক সহায়তায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন। আর ইতালির সমর্থকদের একটা গ্রুপ ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার দাবি তুলেছেন।
এমন সব উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিতের বিষয়ে ভোটের দিকে যাচ্ছে উয়েফা। তবে উয়েফা যদি ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সে নিষেধাজ্ঞায় ফিফা সমর্থন দেবে কি না, সেটি নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ ফিফা সভাপতি জিয়ান্তি ইনফান্তিনো ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। আবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইসরায়েলকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার যেকোনো প্রচেষ্টা ঠেকাতে কাজ করবেন তারা।
আগামী সপ্তাহে ফিফার জুরিখে বৈঠকে বসবে ফিফা কাউন্সিল। ৩৭ সদস্য বিশিষ্ট এ কাউন্সিলের ৮ জন অবশ্য উয়েফার। তবে বৈঠক সম্পর্কে আগেই কোনো মন্তব্য করেনি ফিফা। ইনফান্তিনো বর্তমানে ম্যানহাটনে ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফার স্যাটেলাইট অফিসে আছেন। সেখান থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্য ইভেন্ট গুলোতেও অংশ নিচ্ছেন।
ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞার পটভূমি:
প্রায় দুই বছর ধরে গাজায় আগ্রাসন চালালেও গত কয়েকসপ্তাহ ধরে ফুটবলসহ অন্যান্য ক্রীড়া ইভেন্ট থেকে ইসরায়েলকে নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস বলেছেন, ইউক্রেনে হামলা চালানোয় যেমন রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনিভাবে ইসরায়েলকেও নিষিদ্ধ করা উচিত।
এর আগে গত মাসে ইতালির উদিনে সুপার কাপে পিএসজি-টটেনহামের ম্যাচে খেলোয়াড়দের সামনে ‘শিশু হত্যা বন্ধ করো’ ও ‘বেসামরিকদের হত্যা বন্ধ করো’ লেখা ব্যানার প্রদর্শিত হয়। এই বার্তা দিয়ে মূলত উয়েফা ও এর সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন ইসরায়েল ইস্যুতে কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। গত মে মাসে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পিএসজি সমর্থকেরা ‘Stop Genocide in Gaza’ (গাজায় গণহত্যা বন্ধ করো) লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেছিলেন। স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে নিয়ম থাকলেও ওই ঘটনায় উয়েফা কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়নি।
এছাড়া গত সপ্তাহে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গঠিত একটি তদন্ত কমিশনও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে।
ইসরায়েলের পাল্টা প্রচেষ্টা :
ইএসপিএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলের ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান মাশে জুয়ারেস পর্দার আড়ালে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, যাতে উয়েফা থেকে নেওয়া ইসরায়েলকে বহিষ্কারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। বৃহস্পতিবার জোহার দপ্তর থেকে থেকে জানানো হয়েছে, ‘অযাচিত মন্তব্য না করে এ মুহূর্তে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করাই সঠিক পন্থা। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এভাবেই কাজ করছে। আমরা ওই (নিষেধাজ্ঞা) ব্যাপারে পরে মন্তব্য করব।’
এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পর উয়েফার অনেক সদস্য রাষ্ট্রই রাশিয়ার বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এরপর রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত উয়েফার সদস্যভুক্ত কোনো জাতীয় দল বা ক্লাব ইসরায়েলের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়নি। যদিও নরওয়ে ও ইতালি সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বস্তির কথা জানিয়েছে।
গত বুধবার গ্রিসে ইউরোপা লিগের ম্যাচে ইসরায়েলি ক্লাব ম্যাকাবি তেল আবিবের মুখোমুখি হয়েছিল পিএওকে। ওই ম্যাচ চলাকালে থেসালোনিকি শহরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থীরা বিক্ষোভ করেন। এছাড়া স্টেডিয়ামেও ‘গণহত্যা বন্ধ করুন’ লেখা ব্যানার টানানো হয়।
আসন্ন বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচকে সামনে রেখে হাঙ্গেরিতে অনুশীলন করছেন ইসরায়েল। সেখানে ইসরায়েলি হামলায় হতাহতদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ইসরায়েল কোচ রন বেন শিমন বলেছেন, ‘আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারি, আমাদের দেশ অত্যন্ত নৈতিক ও অসাধারণ। আমি আমার দেশের জনগণের ওপর আস্থা রাখি। আমাদের সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করি। আমার দেশের পাশে আছি।’