গতকাল মঙ্গলবারের আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফরাসি ক্লাবগুলোর বিপক্ষে সর্বশেষ ৭ বছরে ৮ বারের দেখায় মোটে ৩টিতে জয় পেয়েছিল রেয়াল মাদ্রিদ। ১ ড্রয়ের বিপরীতে বাকি চারটিতেই হেরেছিল স্প্যানিশ ক্লাবটি। তবে হিসেবটা যদি হয় ঘরের মাঠে, তাহলে শুধু গত ৭ বছর কেন, ফরাসি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সর্বশেষ ১৪ বারের দেখায় অপরাজিত (১০ জয়, ৪ ড্র) লস ব্লাঙ্কোরা।
ঘরের মাঠে মাদ্রিদের দাপট অব্যাহত থেকেছে গতকালও। ফরাসি ক্লাব মোনাকোকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করে ৬-১ ব্যবধানের বড় জয় তুলে নিয়েছেন আলভারো আরবেলোয়ার শিষ্যরা। চ্যাম্পিয়নস লিগে ২০১৯ সালের নভেম্বরের (গালাতাসারাই) পর এই প্রথম প্রতিপক্ষের জালে ৬ গোল দিল মাদ্রিদ। আর সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আধডজন গোল দিল ২০২৩ সালের এপ্রিলের (ভায়াদোলিদ) পর।
মাদ্রিদের হয়ে জোড়া গোল করেছেন ২০১৩ সালে মোনাকোতে ক্যারিয়ার শুরু করা এমবাপ্পে। এছাড়া একটি করে গোল করেছেন ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও জুড বেলিংহাম। মোনাকোর হয়ে একটি গোল ফিরিয়ে দিয়েছেন ইয়র্দান তেসে। আরেকটি আত্মঘাতী গোল হজম করেছে ফরাসি ক্লাবটি।
গতকালের ম্যাচটি ভিনিসিয়ুসের জন্য ছিল সমালোচনার জবাব দেওয়ার। লা লিগায় সর্বশেষ লেভান্তের বিপক্ষে ম্যাচের মতো গতকাল রাতেও শুরুর দিকে দুয়ো শুনেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। তবে নিজে এক গোল করার পাশাপাশি আরও তিন গোলে অ্যাসিস্ট করে কার্যত দুয়ো থামিয়ে দিয়েছেন ভিনিসিয়ুস।
সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়ে গতকাল ম্যাচের শুরুতে যখনই ভিনিসিয়ুস বল পেয়েছেন, তখনই গ্যালারিতে থাকা সমর্থকদের একাংশ তাঁকে দুয়ো দিয়েছেন। ম্যাচের সময় গড়াতে গড়াতে দুয়োর মাত্রাও কমতে থাকে। ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ৬৩ মিনিটে ভিনিসিয়ুস যখন চ্যাম্পিয়নস লিগে চলতি মৌসুমে নিজের প্রথম গোলটি করলেন, দুয়ো তখন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ভিনিসিয়ুসের গোলটি ছিল মাদ্রিদের পঞ্চম গোল। এর আগে পঞ্চম মিনিটে ভালভার্দের সহায়তায় জালে বল জড়িয়ে গোলের খাতায় নাম লেখান এমবাপ্পে। তবে ক্যারিয়ারের প্রথম ক্লাবের বিপক্ষে গোল করে উদযাপন করেননি ফরাসি তারকা। ২৬ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের বাড়ানো বলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে এমবাপ্পে।
এবারের মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে এটি ছিল এমবাপ্পের ১১তম গোল। আর সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকাতেও অনেকটা এগিয়ে ২৭ বছর বয়সী এ ফরোয়ার্ড। উল্লেখযোগ্য বিষয়, মোনাকো ছাড়ার পর নিজের প্রথম ক্লাবের বিপক্ষে এ নিয়ে ১৫ ম্যাচে ১৩টি গোল করলেন এমবাপ্পে।
এমবাপ্পের জোড়া গোলে ২-০ ব্যবধানের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় মাদ্রিদ। বিরতির পর ৫১ মিনিটে ব্যবধান বাড়ান মাস্তানতুয়োনো। অ্যাসিস্টের ঘরে আবারও সেই ভিনিসিয়ুসের নাম। চার মিনিট পর ভিনিসিয়ুসের বাড়ানো বলে পা লাগিয়ে নিজেদের জালে বল জড়ান মোনাকোর জার্মান ডিফেন্ডার থিও কেহরার।
তিন অ্যাসিস্টের পর ৬৩ মিনিটে নিজে গোল করেন ভিনিসিয়ুস। আর নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট আগে ভালভার্দের আরেকটি অ্যাসিস্টে মোনাকোর কফিনে শেষ পেরেকটি মারেন বেলিংহাম। এই গোলের ৮ মিনিট আগে মোনাকোর হয়ে একটি গোল করে ব্যবধান কমান তেসে।
৬-১ ব্যবধানের বড় জয়ে ৭ ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে মাদ্রিদ। সমান ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার ২০ নম্বরে মোনাকো।
গতকাল ভিনিসিয়ুস যখন গোলটা করলেন, দুয়ো দেওয়া সমর্থকদের দিকে না গিয়ে মাদ্রিদের নতুন কোচ আলভারো আরবেলোয়ার কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। ম্যাচ শেষে ভিনিসিয়ুস স্বীকার করেছেন, তাঁর জন্য সময়টা খুব কঠিন যাচ্ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ভিনিসিয়ুস বলেছেন, ‘গত কয়েকটা দিন আমার, আমার সতীর্থদের সময়টা খুব কঠিন যাচ্ছিল। বিশেষ করে আমার জন্য সময়টা ছিল খুব কঠিন। দুয়ো, শিস থেকে শুরু করে আমাকে নিয়ে যা যা বলা হয়েছে- সব কিছুর কারণে।’
ব্রাজিলিয়ান তারকা যোগ করেন, ‘আমি সবসময় আলোচনায় থাকি। কিন্তু মাঠের বাইরের বিষয়ের জন্য নয়, বরং এই ক্লাবের হয়ে মাঠে যা করি, সেটার জন্য আলোচনায় থাকতে চাই।’
ভিনিসিয়ুস অবশ্য ঠিকই বলেছেন। মাদ্রিদের জন্য গত কয়েকটা দিন খুব কঠিন ছিল। সম্প্রতি স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে হেরেছে তারা। মৌসুমের প্রথম শিরোপা হাতছাড়া করার ধাক্কায় কোচ শাবি আলোনসোকে ‘ছাঁটাই’ করে মাদ্রিদ। আলোনসোর জায়গায় দায়িত্ব পান আরবেলোয়া।
কিন্তু নতুন কোচের অধীনে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই দ্বিতীয় স্তরের দল আলবাসেতের কাছে হেরে কোপা দেল রে থেকে বাদ পড়ে মাদ্রিদ। এরপর লা লিগায় লেভান্তের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জিতলেও ওই ম্যাচে ভিনিসিয়ুস, বেলিংহাম এবং মাদ্রিদ সভাপতি পেরেসকে নিয়ে ব্যাপক দুয়ো দেন দর্শকেরা।
গতকালের ম্যাচে ভিনিসিয়ুসকে নিয়ে দুয়োর ঘটনা ঘটলেও আগের ম্যাচের মতো সেটা জোরাল ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত সেই দুয়ো থামিয়ে দিতে পেরেছেন ভিনি। এ প্রসঙ্গে আরবেলোয়া বলেছেন, ‘বের্নাবেউ যখন ওর পাশে থাকে, তখন সে অপ্রতিরোধ্য, সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়। শিরোপার জন্য লড়তে চাইলে আমাদের ওকে দরকার। ও এটার দাবিদার। আমাকে আজ যেভাবে জড়িয়ে ধরেছে, সেই আলিঙ্গনটা মূলত মাদ্রিদ সমর্থকদের জন্য, যারা কঠিন সময়ে ওকে সমর্থন করেছে এবং ওর পাশে থেকেছে।