মেসি তো থেকে গেলেন, কিন্তু আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারবে?

ফুটবল বুঝতে শেখার পর থেকে লিওনেল মেসি যে স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, আর্জেন্টাইন মহাতারকার সেই স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে সাড়ে তিন বছর আগে। ১৮ ডিসেম্বর ২০২২- মেসি চাইলেও হয়তো কাতারের লুসাইলের সেই মহাকাব্যিক রাতের কথা ভুলতে পারবেন না।

ফ্রান্সের বিপক্ষে ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো ম্যাচের উত্তেজনা আর টাইব্রেকার নাটক পেরিয়ে স্বপ্নের বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু আঁকেন মেসি। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক যে শুধু ফাইনালে উজ্জ্বল ছিলেন, ব্যাপারটা এমন নয়। ফাইনালে জোড়া গোলসহ পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল আর ৩ অ্যাসিস্ট করেন মেসি। অনুমিতভাবে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’টা মেসির হাতেই ওঠে।

মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পরও ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শুধু ‘মেসির দল’ বললে ভুল হবে। বৈশ্বিক এ টুর্নামেন্টে আলবিসেলেস্তেদের ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হুলিয়ান আলভারেস, আলেক্সিস মাকআলিস্তার, এনসো ফের্নান্দেসের মতো তারকাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বকাপের মঞ্চ দিয়েই তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেন। এর মধ্যে এনসো ফের্নান্দেস তো বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কারই জেতেন।

এর বাইরে নিকোলাস ওতামেন্দির রক্ষণ সামলানো, গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্তিনেসের দেয়াল তুলে দাঁড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আনহেল দি মারিয়ার জ্বলে ওঠা- সবকিছুই মিশে আছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গল্পে।

কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযানের সেই গল্পে শুরুতেই ছিল সৌদি আরবের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হার। সেই ধাক্কা সামলে উঠে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা।

কিন্তু আরেকটা বিশ্বকাপের যখন দুই মাসের কিছু বাকি, তখন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কার মেঘ কম নয়। সব মিলিয়ে লিওনেল স্কালোনির দলের প্রস্তুতি কিছুটা এলোমেলোই মনে হচ্ছে। তাতে প্রত্যাশার পুরো চাপটা আরেকবার জমা হচ্ছে মেসির ওপরই।

কিন্তু বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনা কতটা প্রস্তুত? এ প্রসঙ্গে ফুটবল বিষয়ক ওয়েবসাইট গোল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেটির আলোকে আর্জেন্টিনা দলের বর্তমান পরিস্থিতি ও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনার বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

 

বাছাইপর্বে কষ্টার্জিত জয়

কনমেবল অঞ্চল থেকে সবার আগে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে কোন দল? উত্তরটা সহজ- আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ বাছাই শেষে কোন দলের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি? উত্তর একই- আর্জেন্টিনা। এমনকি দুইয়ে থাকা ইকুয়েডরের চেয়ে ৯ পয়েন্ট বেশি নিয়ে বাছাইপর্ব শেষ করে আর্জেন্টিনা।

পরিসংখ্যান দেখে মনে হতে পারে, আর্জেন্টিনার বাছাইপর্ব ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু বাস্তবতা সে কথা বলছে না। এর অন্যতম কারণ, প্রতিপক্ষ দলগুলোর দুর্বলতা। উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের মতো দল যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম হয়ে বিশ্বকাপ বাছাই শেষ করেছে।

এর মধ্যেই বাছাইয়ে উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের কাছে হেরেছে আর্জেন্টিনা। ঘরের মাঠে ড্র করেছে কলম্বিয়ার বিপক্ষেও। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মাঝে কোপা আমেরিকা জিতলেও মহাদেশীয় ওই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনাকে সেরারূপে দেখা যায়নি। আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স দেখে মনে হয়েছে, কোনোমতে ম্যাচ জিতেছে ঠিকই, কিন্তু সমর্থকদের মন জিততে পারেনি।

 

দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রীতি (প্রস্তুতি) ম্যাচ

বাছাইপর্ব শেষ হওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে প্রীতি ম্যাচ খেলা শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। এর প্রথম ম্যাচটা খেলেছিল গত বছরের অক্টোবরে। ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ওই ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে জেতে স্কালোনির দল।

এরপর সময় যত গড়িয়েছে, আর্জেন্টিনার প্রস্তুতি ম্যাচের প্রতিপক্ষের মান যেন ততই তলানির দিকে নেমেছে। ভেনেজুয়েলা ম্যাচের পর পুয়ের্তো রিকো ও অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ যেন সে কথাই বলছে।  সেখানেই শেষ নয়। মার্চের চলমান আন্তর্জাতিক বিরতিতেও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে থাকা মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে একটা ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা।  পরের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে আগামীকাল ভোরে মাঠে নামবেন মেসিরা। ওই ম্যাচে স্কালোনির দলের প্রতিপক্ষ র‍্যাঙ্কিংয়ে ৯১ নম্বরে থাকা জাম্বিয়া।  

একটা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের মান যাচাইয়ের জন্য এ ধরনের ‘পুঁচকে’ দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ যথেষ্ট হতে পারে না। তারওপর, এমন দুর্বল মৌরিতানিয়াকে হারাতেই (২-১) কিনা বেগ পেতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে।

গোল উল্লেখ করেছে, যে দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা ম্যাচ শেষ হতেই অটোগ্রাফ ও সেলফির জন্য মেসিকে ঘিরে ধরে, সেই দলের জন্য তো মেসির সঙ্গে ছবি তোলাই একটা বড় অর্জন। তারা আবার আর্জেন্টিনাকে কীভাবে চ্যালেঞ্জ জানাবে?

আর্জেন্টিনা যে ম্যাচটা ভালো খেলেনি, সেটা ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন স্কালোনি নিজেও। আর্জেন্টিনা কোচ বলেছেন, ‘আমরা ভালো খেলিনি। আমাদের উন্নতির অনেক জায়গা আছে।’

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেস কোনো রাখঢাক না রেখেই জানান, আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলা এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বাজে প্রীতি ম্যাচের অভিজ্ঞতা।

 

ফিনালিসিমা বাতিলের প্রভাব

মার্চের ২৭ তারিখে কাতারে স্পেনের বিপক্ষে ফিনালিসিমায় মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল আর্জেন্টিনার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ও ভেন্যু নিয়ে জটিলতায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা বাতিল হয়ে যায়। মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের পর ফিনালিসিমা বাতিল নিয়ে স্বস্তিই প্রকাশ করেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। আর্জেন্টাইন গোলকিপারের মতো বলেছেন, ‘ভাগ্য ভালো যে, (স্পেনের বিপক্ষে ফিনালিসিমা ম্যাচটা হয়নি) বেঁচে গিয়েছি। আজ যেমন খেলেছি, ওই ম্যাচে এমন খেললে নির্ঘাত হারতাম।’

অন্যদিকে ফিনালিসিমা না হওয়ায় কিংবা কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ না থাকায় আর্জেন্টিনা যে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারছে না, সেটা উঠে এসেছে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর কথায়। আর্জেন্টাইন লেফট ব্যাক বলেছেন, ‘শিরোপা জয়ের হিসেব বাদ দিলেই (ফিনালিসিমা) ম্যাচটা গুরুত্বপূণৃ হতো। কারণ, শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেললে নিজেদের মান যাচাই করা যায়।’

 

মেসিকে নিয়ে অনিশ্চয়তা, মেসিতেই ভরসা

২০২৬ বিশ্বকাপে কি মেসি খেলবেন? নাকি বিশ্বকাপের আগেই জাতীয় দলকে বিদায় জানাবেন? বিষয়টা এখনো ধোঁয়াশার মধ্যেই আছেন। মেসি নিজে জানিয়েছেন, তিনি এখনো বিশ্বকাপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। আর্জেন্টাইন অধিনায়কের ভাষায়, ‘দিন ধরে ধরে এগোতে চাই। নিজের ফিটনেস দেখে সিদ্ধান্ত নেব।’

মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে শেষ প্রীতি ম্যাচটার পরও সেই একই কথা জানিয়েছেন মেসি। তবে আর্জেন্টিনা কোচ বিশ্বাসী, মেসিকে বিশ্বকাপে পাবেন, ‘আমি চাই ও (বিশ্বকাপে) খেলুক, তবে সিদ্ধান্ত ওর নিজের ওপর।’

 

মেসি না খেললে…

মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনা আর মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা- পার্থক্যটা মাঠের পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট। চোটের কারণে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচে ছিলেন না মেসি। দুটো ম্যাচেই হেরেছে আর্জেন্টিনা।

এছাড়া সর্বশেষ কোপা আমেরিকার পর অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আনহেল দি মারিয়া। মাঠে দি মারিয়ার শূন্যস্থান এখনো পূরণ করতে পারেনি স্কালোনির দল। নিকো গঞ্জালেস চেষ্টা চালালেও, দি মারিয়ার অভাব স্পষ্টই থেকে যাচ্ছে।

মধ্যমাঠ নিয়েও স্বস্তিতে নেই আর্জেন্টিনা। রদ্রিগো দে পল আগের মতো ফিট নন। তিনি আবার ইউরোপেও নেই। গেছেন মেসির সঙ্গে মায়ামিতে। এনসো ফের্নান্দেস ও মাকআলিস্তার চেলসি-লিভারপুলের মতো শীর্ষ ক্লাবে খেললেও মাঝে মধ্যেই ছন্দহীন হয়ে পড়েন।

তবে আর্জেন্টিনাকে আশার আলো দেখাতে পারে হুলিয়ান আলভারেস, লওতারো মার্তিনেস, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর মতো তরুণ। এছাড়া কোমোর মিডফিল্ডার নিকো পাসও হতে পারে এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার চমক।

আরও একটা স্বস্তির বিষয় আছে। গতবছরের মার্চে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে মাটিতে নামি ৪-১ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচে মেসিকে ছাড়াই খেলেছে স্কালোনির দল। মাঠে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স এতটাই দুর্দান্ত ছিল যে, মেসির অভাব টেরই পায়নি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।  

 

রক্ষণভাগে দুর্বলতা

সর্বশেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল জমাট রক্ষণভাগ। এবার সেই রক্ষণভাগেই যেন সবচেয়ে বেশি জড়তা! নিকোলাস ওতামেন্দির মধ্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোও নিজের সেরা ফর্মে নেই।

লিসান্দ্রো মার্তিনেস ও গনসালো মন্তিয়েলও চোট সমস্যায় ভুগছেন। শুধু রাইট ব্যাক নাহুয়েল মলিনাই পুরোপুরি ছন্দে আছেন। কিন্তু লেফট ব্যাক হিসেবে তাগলিয়াফিকো কিংবা আকুনিয়া- কেউই সেরারূপে নেই! রক্ষণের পাশাপাশি শঙ্কা আছে গোলপোস্‌ট নিয়েও। চলতি মৌসুমেও মার্তিনেসকে ক্লাবের জার্সিতে বেশ কিছু ভুল করতে দেখা গেছে।

 

তবে কি সময় ফুরিয়ে আসছে?

এত সব শঙ্কা-দুর্বলতা সত্ত্বেও দলটার নাম আর্জেন্টিনা বলে ফেভারিটদের তালিকায় রাখতেই হবে। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা কতটা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে স্পেন ও ফ্রান্সের মতো গতিশীল, ধারাবাহিক কিংবা শক্তিশালী দলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা কতটা দাপট দেখাতে পারবে- সেটার ওপরও নির্ভর করবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গতিপথ।

আর্জেন্টিনার দরকার ছন্দ ফিরিয়ে আনা। মেসি যে কাতারেই শেষ টানবে মনে হয়েছিল, বিশ্বকাপ জিতে শেষ করার রোমাঞ্চ ছিল, কিন্তু সেটা না করে টেনে এনেছেন এই বিশ্বকাপ পর্যন্ত... বিশ্বকাপে এবার আর্জেন্টিনা ভালো না করলে তাঁর (মেসির) চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না, এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।