মৌসুমের শেষ এল ক্লাসিকো। কিন্তু বার্সেলোনা ও রেয়াল মাদ্রিদের মহারণ ঘিরে সবসময় যেমন উত্তাপ থাকে, এবার তেমনটা দেখা যায়নি। উত্তাপ থাকবেই বা কীভাবে? লা লিগার সমীকরণের হিসাব যে আগেই মিলিয়ে ফেলেছিল বার্সা। মাদ্রিদকে হারাতে পারলে পারলে তিন ম্যাচ হাতে রেখেই লিগ চ্যাম্পিয়ন হবে কাতালান ক্লাবটি। অন্যদিকে চোটজর্জর ও সাম্প্রতিক নানান অস্থিরতায় বিপর্যস্ত মাদ্রিদের জন্য ম্যাচটি ছিল নিয়মরক্ষার!
সেই ম্যাচে গতকাল রোববার রাতে ঘরের মাঠ কাম্প নেউয়ে মাদ্রিদকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো লা লিগার শিরোপা জিতেছে হানসি ফ্লিকের দল। ক্লাব ইতিহাসে এটি বার্সার ২৯তম লিগ শিরোপা।
একে তো তিন ম্যাচ হাতে রেখে লিগ চ্যাম্পিয়ন, তার ওপর উপলক্ষ্যটা বার্সা পেয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে। এতে বার্সার শিরোপা জয়ের আনন্দ দ্বিগুণ হওয়ার কথা। কিন্তু বার্সা কোচ ফ্লিককে যেতে হয়েছে আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতির মধ্য দিয়ে। এল ক্লাসিকোর কয়েকঘণ্টা আগে বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েছেন ফ্লিক। এমন কঠিন মুহূর্তেও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বার্সার ডাগআউট সামলানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ম্যাচ শেষে ফ্লিক দিনটিকে ‘খুব কঠিন দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ফ্লিক বলেছেন, ‘এটা খুব কঠিন একটা দিন ছিল। যার শুরুটা হয় সকাল থেকেই। আমি কোনো দিন এই দিনটা ভুলব না। সকালে আমার মা ফোন করে জানান, আমার বাবা মারা গেছেন। তখন আমি ভাবছিলাম, বিষয়টা কি লুকিয়ে রাখব, নাকি দলের সঙ্গে শেয়ার করব? কারণ আমার কাছে এই দলটা একটা পরিবারের মতো।’
যেহেতু দলটাকে পরিবারের মতোই মনে করেন, সে কারণে ম্যাচের আগে দলের সবাইকে বাবার মৃত্যুর সংবাদের বিষয়টি জানান ফ্লিক, ‘পরে সিদ্ধান্ত নেই “ঠিক আছে, খেলোয়াড়দের বিষয়টা জানাই।” এরপর তারা যেটা করেছে, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য। আমি এই মুহূর্তটা কখনো ভুলব না।’
গতকালের ম্যাচে ২০ মিনিটের মধ্যেই গোলদুটি পেয়ে যায় বার্সা। ৯ম মিনিটে দুর্দান্ত এক ফ্রি কিকে মাদ্রিদের জালে বল জড়ান রাশফোর্ড। আর ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ফেরান তোরেস। ম্যাচে আর গোল না হলে ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয় বার্সার। একই সঙ্গে শিরোপাও নিশ্চিত হয় কাতালান ক্লাবটির।
এ প্রসঙ্গে বার্সা কোচ বলেছেন, ‘সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ধন্যবাদ। সবকিছুর জন্য ভীষণ কৃতজ্ঞ। এটা একটা পরিবারের মতো।’
ফ্লিকের বাবার সম্মানার্থে গতকাল দুদলই কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন। ম্যাচ শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতাও পালন করা হয়। আবার দুটি গোলের পরই বার্সার খেলোয়াড়রা ফ্লিকের সঙ্গে আবেগঘনভাবে উদযাপন করেন। পরে লিগ শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার পর ফ্লিককে কাঁধে তুলে উদযাপন করে বার্সার ফুটবলাররা।
এ প্রসঙ্গে ফ্লিক বলেছেন, ‘আজকের মতো এত ভালোবাসা আমি আগে কখনো অনুভব করিনি। এটা অসাধারণ।’
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ফ্লিক বার্সার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্পেনে আধিপত্য দেখাচ্ছে বার্সা। এখন পর্যন্ত ৬টি ঘরোয়া ট্রফির মধ্যে ৫টিই জিতেছে বার্সা। শুধু চলতি মৌসুমে কোপা দেল রেতে ব্যর্থ হয়েছে ফ্লিকের দল।
ঘরোয়া টুর্নামেন্টে সাফল্য পেলেও চ্যাম্পিয়নস লিগে আলো ছড়াতে পারছে না কাতালান ক্লাবটি। গত মৌসুমে সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের পর এবার আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হেরে বাদ পড়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই। চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে সাফল্যই যে ফ্লিকের পরবর্তী লক্ষ্য, সেটাও গতকালই জানিয়েছেন বার্সা কোচ।
ফ্লিক বলেছেন, ‘এই ক্লাবকে আরও কিছু দিতে চাই। আমরা পরের স্তরে পৌঁছাতে চাই। আমি জানি, বার্সেলোনার সবাই চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে চায়। আশা করি, আমরা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারব। আমি সবসময় স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে চাই। আমার মনে হয়, আমাদের সামনে আরও অনেক স্বপ্ন আছে। এটা আগামী মৌসুমের জন্য ভালো ব্যাপার।’
চ্যাম্পিয়নস লিগ তো পরের মৌসুমের ব্যাপার। চলতি মৌসুমেও একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন বার্সা কোচ। গতকালের ম্যাচ জয়ের পর ৩৫ ম্যাচে বার্সার পয়েন্ট ৯১। হাতে থাকা তিন ম্যাচ জিততে পারলে ১০০ পয়েন্ট নিয়ে মৌসুম শেষ করতে পারবে কাতালানরা। লা লিগা ইতিহাসে এ কীর্তি এর আগে দেখা গেছে মাত্র দুবার- ২০১২ সালে রেয়াল মাদ্রিদ ও ২০১৩ সালে বার্সেলোনা।
এবার সেই কীর্তি ফেরাতে চান ফ্লিক, ‘আমরা ১০০ পয়েন্টে পৌঁছাতে চাই। এটা এখনও সম্ভব। এটাই এখন আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য।’