রোজারিওর গলি থেকে ফুটবলের সিংহাসনে- জন্মদিনে মেসির গল্প

সময় এসেছে লুকোচুরি বন্ধ করে সত্যিটা মেনে নেওয়ার, মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার- লিওনেল মেসিকে নিয়ে কয়েকদিন আগে এভাবেই বলেছিলেন রোনালদো নাজারিও। যে ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার এত শত্রুতা, এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সেই ব্রাজিলের কিংবদন্তিও মেসির শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

ফুটবলে একজনের পক্ষে যা যা পাওয়া সম্ভব, তার সবটাই অর্জন করেছেন। সবুজ ঘাসের ওপর জাদুকরী সব মুহূর্তের জন্ম দিয়ে নিজেকে এ গ্রহের সব ফুটলারের চেয়ে আলাদা করেছেন। নির্ভার থেকে অংশ নিয়েছেন আরেকটা বিশ্বকাপে। এর মাঝেই কাটছেন ৩৯তম দিনের কেক।

অথচ কে-ই বা জানত, রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটা একদিন বদলে দিবে পুরো ফুটবলের ইতিহাস!

সেই গল্পের শুরুটা হয়েছিল পারানা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের সরু গলি থেকে, যেখানে তাঁর স্বপ্নেরা খেলত ধুলো উড়িয়ে। শরীরটা ছোট্ট, কিন্তু চোখে ছিল অদ্ভুত আগুন, যেন বলের সঙ্গে কথা বলতে জানে সে।

কিন্তু সব স্বপ্নেরা সহজে পূর্ণতা পায় না। মেসির বেলাতেও তা-ই হলো। অন্য আট-দশজনের চেয়ে মেসির শৈশবটা ছিল একেবারে আলাদা। বয়স বাড়ছিল ঠিকই, কিন্তু শরীর বাড়ছিল না কোনোভাবেই। ডাক্তার বলেছিলেন, এটা গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি। চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ দরকার। চিকিৎসা হলেই যে সব ঠিকঠাক হবে, বড় হয়ে ফুটবলার হতে পারবেন, সেটার নিশ্চয়তা ছিল না। অর্থাৎ স্বপ্নেরা তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও যেন ভেতরে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছিল না।

কিন্তু ইতিহাসই তো বলে, যুদ্ধের ময়দান যত কঠিন হয়, সেনাপতিকে আরও কৌশলী বানায়। উত্তাল সমুদ্রই নাবিককে আরও কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার উপায় শেখায়। ঠিক তেমনি, নিয়তি কঠিন হলেও সেই কঠোরতার মধ্যেই কখনো কখনো জন্ম নেয় কিংবদন্তি।

বিরল রোগ মেসির শরীর আটকে রাখলেও প্রতিভার খবর আটকে রাখতে পারেনি। দেশের সীমানা পেরিয়ে খবর গেল আটলান্টিকের ওপারে বার্সেলোনায়। দেরি করেনি বার্সা। মেসিকে উড়িয়ে এনে তার পায়ের কারিশমা মুগ্ধ হয়ে হাতের কাছে থাকা ন্যাপকিন পেপারেই সেরে ফেলে চুক্তি।

তবে নিজ দেশ, বন্ধুবান্ধব, চেনা গলি ছেড়ে লা মাসিয়াতে শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। ছোট্ট, লিকলিকে চুপচাপ থাকা মেসিকে দেখে অনেকেই সন্দেহের চোখে বলত, এই ছেলে কি পারবে?

সময় এগোতে থাকে, বাড়তে থাকে বয়স। স্টেডিয়ামের ঘাস কিংবা আলো বদলাতে থাকে। সেই সঙ্গে বদলাতে থাকে সন্দেহের চোখে দেখা লোকদের দৃষ্টিভঙ্গিও। গতি-ড্রিবলিং আর বলের সঙ্গে নিঃশব্দ নৃত্যেই কবিতা লিখতে থাকেন মেসি। সেই কবিতাতে জবাব পেতে থাকে পুরো পৃথিবী।

যে বল একবার তাঁর পায়ে আসে, সে বল জানে, এখন সে কবিতার অংশ হতে যাচ্ছে। রক্ষণ ভেঙে যায়, ডিফেন্ডাররা শুধু তাকিয়ে থাকে, আর ক্যামেরা বন্দি করে নেয় ইতিহাসের সেই মুহূর্ত। এর মাঝেই চলে মেসির রেকর্ড ভাঙার খেলা। সাফল্যের পালকে যোগ হতে থাকে একের পর এক মুকুট। নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলতে থাকেন মেসি।

কিন্তু গল্পটা শুধু সাফল্যেরও ছিল না। এটা ব্যথারও গল্প। ২০২১ এর আগ পর্যন্ত গল্পটা ছিল বড্ড একপেশে। বার্সার জার্সিতে মেসির যখন সব জেতা শেষ, আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গল্পটা শুধুই হতাশা আর হৃদয়ভঙ্গের। ২০১৪ এর বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ এর কোপা আমেরিকা- টানা তিন ফাইনাল হেরে মেসিও যেন হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।

নিজ দেশেও তাঁর জার্সি পুড়িয়েছেন সমর্থকেরা। অনলাইনে চলছিল মিম-ট্রলের বন্যা। নিজের মনেও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল মেসির। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে বিদায় বলে দেন জাতীয় দলকে।

দলের প্রয়োজনে ফিরলেন বটে, কিন্তু সঙ্গী আবারও সেই পুরোনো হতাশা। ২০১৮ বিশ্বকাপে ভরাডুবি, ২০১৯ কোপা আমেরিকাতে আরেকবার ব্যর্থতা। সবাই বলতে থাকল, এই মেসিকে দিয়ে হবে না! কিচ্ছু জিততে পারবে না আর্জেন্টিনা।

কিন্তু কে জানত, না পাওয়ার গল্পের শেষটা সেখানেই। স্কালোনি নামের এক জাদুর কাঠির পরশে যেন বদলে গেল সবকিছু। ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জিতল কোপা আমেরিকা। জাতীয় দলে মেসির প্রথম, আর আর্জেন্টিনার জন্য ২৮ বছর পর প্রথম শিরোপা। শাপমোচনের পর মারাকানায় হাঁটু গেড়ে মেসির কান্না আজও চোখে জল আনে সমর্থকদের।

এরপর কাতারে সেই স্বপ্নের বিশ্বকাপটাতেও চুমু আঁকলেন। তর্কযোগ্যভাবে নিজেকে তুললেন সর্বকালের সেরার আসনে। ৩৬ বছর বয়সে পেলেন সেই পূর্ণতা। পিটার ড্রুরির কমেন্ট্রির ভাষায়, স্বর্গের দুয়ারে পা রাখলেন মেসি।

কিন্তু গল্পটা শুধু ট্রফি কিংবা সাফল্যের নয়। এই গল্পটা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার এক মানুষের। যে কখনো উচ্চতা দিয়ে নয়, বরং নীরবতা, পরিশ্রম আর স্থিরতায় বিশ্বজয় করেছে। সে কখনো চিৎকার করেনি, তবুও তাঁর নামেই সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনি হয়েছে। যেখানে অন্যরা শক্তি দেখিয়েছে, সে দেখিয়েছে সৌন্দর্য। যেখানে অন্যরা গর্জন করেছে, সে নীরবেই লিখেছে ইতিহাস।

সে ইতিহাস টিকে থাকবে ততদিন, যতদিন ফুটবল থাকবে।

শুভ জন্মদিন, ৩৮ পেরিয়ে ৩৯-এ পা দেওয়া লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচিত্তিনি।