২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউটের প্রথম রাউন্ডে অর্থাৎ, রাউন্ড অব ৩২-তে ব্রাজিল মুখোমুখি হচ্ছে এশিয়ান পরাশক্তি জাপানের। অন্যদিকে, তাঁদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ নবাগত কেপ ভার্দে। শুধু তাই নয়, সেমিফাইনালের আগেই ব্রাজিলকে খেলতে হতে পারে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে ও হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। আর সেমিফাইনালে পৌছাতে আর্জেন্টিনার পথে বাধা হতে পারে কেবল অস্ট্রেলিয়া, কলম্বিয়া বা ক্রোয়েশিয়ার মতো দল।
তাই সমর্থকদের অনেকের মাঝেই গুঞ্জন উঠেছে, ফিফা কি ইচ্ছে করেই নকআউটে আর্জেন্টিনার জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিয়েছে? এটা কি ফিফার কোনো গোপন কারসাজি? চলুন কিছু সময়ের জন্য আবেগকে সরিয়ে রেখে, ফিফার অফিশিয়াল নিয়ম কি বলছে- তার ভিত্তিতেই এই রহস্যের জট খোলা যাক।
বিশ্বকাপের ড্র ও ফিফা র্যাংকিংয়ের হিসাব
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর ড্র কোনো বদ্ধ ঘরে অনুষ্ঠিত হয়নি যে, ফিফার কর্মকর্তারা চাইলেই আর্জেন্টিনার জন্য সহজ একটি ছক আঁকতে পারতেন। এখানে আসল সত্যটা লুকিয়ে আছে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের ফিফা র্যাংকিংয়ে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপের ৪৮টি দলকে মোট ৪টি পটে ভাগ করা হয়। এক নম্বর পটে (পট ১) ছিল ৩ আয়োজক দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) এবং র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৯টি দল। সেসময় আর্জেন্টিনা র্যাংকিংয়ের ২ নম্বরে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই ১ নম্বর পটের শীর্ষ দল হিসেবে পজিশনাল সুবিধা পায় তাঁরা। অন্যদিকে, ব্রাজিল ছিল র্যাংকিংয়ের ৫ নম্বরে। সেরা ৪-এর বাইরে থাকার কারণে নকআউটে ব্রাজিলের সমীকরণটা কঠিন হয়ে যায়।
ফিফার বিশেষ 'কম্পিটিটিভ ব্যালেন্স' নিয়ম
এবারে ফিফার সেই বিশেষ নিয়মের কথায় আসা যাক, যা এই তথাকথিত ‘কারসাজির গুঞ্জন’কে একদম উড়িয়ে দিবে। বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ফিফা অফিশিয়ালি ঘোষণা করেছিল যে, টুর্নামেন্টের ভারসাম্য বা ‘কম্পিটিটিভ ব্যালেন্স’ ধরে রাখার জন্য র্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দল- স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডকে নকআউট পর্বে সম্পূর্ণ বিপরীত পুলে বা ভিন্ন ভিন্ন ‘পাথওয়েতে’ রাখা হবে।
এর অর্থ হলো, এই ৪টি দল যদি নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে এগোতে থাকে, তবে সেমিফাইনালের আগে তাঁদের কাউকেই একে অন্যের মুখোমুখি হবে না। আর্জেন্টিনা যেহেতু র্যাংকিংয়ের ২ নম্বরে ছিল, তাই তারা এই প্রোটেকশন বা শীর্ষ চারের সুবিধা পেয়েছে সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই।
অন্যদিকে ব্রাজিল ৫ নম্বরে থাকায়, তাদের লটারির মাধ্যমে এই চার সেমিফাইনালিস্ট ব্লকের যেকোনো একটির অধীনে পড়তেই হতো। এই যেমন ব্রাজিল এখন পড়েছে ইংল্যান্ডের ব্লকে।
কারসাজি নাকি ফর্মের খরা?
তাহলে সহজ কথায় কী দাঁড়ালো? আর্জেন্টিনা বা ফ্রান্সের পথটা আগে থেকেই ছক কাটা ছিল র্যাংকিংয়ে তাদের অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানের সুবাদে। এখানে ফিফা মাঝপথে এসে কোনো কারসাজি করেনি। ফুটবল একটা নিখাদ গাণিতিক হিসাব। আপনি বছরজুড়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলবেন, র্যাংকিংয়ে ওপরে থাকবেন, ড্র-এর দিন তার সুফল পাবেন।
ব্রাজিল যদি গত কয়েক বছরে মাঠে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে নিজেদের শীর্ষ চারে ধরে রাখতে পারতো, তবে তাঁদের জন্যেও সমীকরণটা তুলনামূলক সহজই হতো। তাই বিষয়টিকে ফিফার কারসাজি না বলে, বরং সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের ফর্মের খরা হিসেবেই দেখা উচিত।
ফুটবল খেলাটা মাঠে হয়, কাগজে-কলমে নয়। এই বিশ্বকাপেই আমরা বেশ কয়েকটি অঘটন দেখেছি। পুর্তুগালকে রুখে দিয়েছে ডিআর কঙ্গো এবং কেপ ভার্দে ড্র করেছে স্পেনের সাথে। তাই আর্জেন্টিনাকেও চমকে দিতে পারে কেপ ভার্দে, আবার জাপান ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ব্রাজিলও দেখাতে পারে তাদের চিরচেনা সাম্বা ম্যাজিক।
তাই ‘ফিফার কারসাজি’ তত্ত্বে কান না দিয়ে, মাঠের ফুটবলে মেতে ওঠাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর্জেন্টিনা তাদের র্যাংকিংয়ের পুরস্কার পাচ্ছে, আর ব্রাজিলকে প্রমাণ করতে হবে কেন তারা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আপনার কী মনে হয়? ব্রাজিল কি পারবে সকল বাধা পেরিয়ে হেক্সা মিশনে সফল হতে?