২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ 'এফ' থেকে অপরাজিত থেকে রাউন্ড অফ ৩২-এ পা রেখেছে এশিয়ার পরাশক্তি জাপান। আর নকআউটের প্রথম ম্যাচেই তাদের সামনে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। আজ রাত ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে হাজেমি মরিয়াসুর জাপান। কিন্তু গ্রুপে নেদারল্যান্ডসকে রুখে দেওয়া এই সামুরাই ব্লু-দের মাঠের ফুটবল দেখে ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সফল ম্যানেজার পেপ গার্দিওলাও বলতে বাধ্য হয়েছেন, জাপানকে আর আন্ডারডগ ভাবার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু আজ থেকে ঠিক ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালেও জাপানের ফুটবল লিগ ছিল পুরোপুরি অপেশাদার। ফিফা র্যাংকিংয়ে তাঁদের অবস্থান ছিল ৪০-এর নিচে। তাহলে কোন জাদুতে আজ বিশ্বকাঁপানো এক পরাশক্তিতে রূপ নিল সূর্যোদয়ের দেশ জাপান? জাপানের ফুটবলকে আমূল বদলে দেওয়া এই অবিশ্বাস্য মাস্টারপ্ল্যানের গল্পটা এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক।
১০০ বছরের 'পাগলাটে' মহাপরিকল্পনা
গল্পটার শুরু ১৯৯২ সালে। জাপানিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন দেখলো, দেশে সুমো রেসলিং আর বেসবলের জনপ্রিয়তার কাছে ফুটবল মার খাচ্ছে। তারা তখন একটা পরিকল্পনা করলো। সাধারণ কোনো পরিকল্পনা নয়, একেবারে '১০০ বছরের মহাপরিকল্পনা' বা 'হান্ড্রেড ইয়ার ভিশন'।
তাদের লক্ষ্য ছিল খুবই স্পষ্ট, পরবর্তী ১০০ বছর, অর্থাৎ ২০৯২ সালের মধ্যে জাপানে ১০০টি পেশাদার ফুটবল ক্লাব তৈরি করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি জয় করা। পশ্চিমা বিশ্ব তখন এই পরিকল্পনা শুনে হেসেছিল। কিন্তু জাপানিরা তো অন্য ধাতুতে গড়া। তারা প্রতিটি ক্লাবকে নির্দেশ দিল, কোনো বড় কর্পোরেট কোম্পানির ভরসায় থাকা যাবে না, ক্লাবের শিকড় গাড়তে হবে স্থানীয় কমিউনিটিতে। তৈরি করা হলো তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল একাডেমি। আর এভাবেই জাপানের পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়লো ফুটবলের বীজ।
জাপানিজ সংস্কৃতি ও 'ওভারট্রেনিং' ম্যাজিক
কিন্তু শুধু লিগ চালু করলেই তো আর বিশ্বকাপ জেতা যায় না, দরকার হয় বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের। আর এখানেই কাজ করেছে জাপানের অনন্য সংস্কৃতি— যাকে বলা হয় 'কমিটমেন্ট টু মাস্টারি'।
আমেরিকান কোচ টম বায়ারের হাত ধরে জাপানে শুরু হয় তৃণমূলের ফুটবলের বিপ্লব। জাপানি মা-বাবারা মেনে নিলেন এক কঠিন নিয়ম। জাপানে মাত্র ৬ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুরা সপ্তাহে ৪ দিন, দিনে ৩ ঘণ্টা করে, বছরের ১২টা মাসই ফুটবলের কঠিন অনুশীলন করে। বিশ্বের খুব কম দেশই এই ধরণের 'ওভারট্রেনিং' সংস্কৃতি মেনে নেবে।
শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম আর একই ড্রিল বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে জাপানি ফুটবলাররা ছোটবেলা থেকেই টেকনিক্যালি অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত হয়ে গড়ে ওঠে। জাপানের বর্তমান এই দলটির দাইজেন মাইদা, দাইচি কামাদা, আয়াসে উইদার মতো ফুটবলাররা সবাই এই সিস্টেমেরই ফসল।
ইউরোপ জয় ও ২০২৬-এর সামুরাই স্কোয়াড
জাপানের এই ১০০ বছরের পরিকল্পনা এখন সময়ের চেয়েও অনেক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় জাপানি ফুটবলারদের ইউরোপে খেলা ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু আজ কোচ হাজিমে মরিয়াসু এমন এক স্কোয়াড সামলাচ্ছেন, যার মূল একাদশের ১১ জনই খেলেন ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগে। চলতি বিশ্বকাপে তাঁদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ২৫ জনই খেলেন ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে।
এই যেমন, ডাচ লিগে ফেয়েনুর্ডের হয়ে গেল মৌসুমে ২৫টি গোল করেছেন ৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদা। এছাড়া ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেডে খেলা আও তানাকা, স্কটিশ ক্লাব সেল্টিকের হয়ে খেলা দাইজেন মাইদা, কিংবা ফ্রাঙ্কফুটের উইঙ্গার রিতসু দোয়ান- এদের গতি আর ট্যাকটিকাল শৃঙ্খলা যেকোনো দলের রক্ষণকে ভেঙে দিতে সক্ষম।
উল্লেখ্য, বর্তমান জাপান দলটি এখন আর শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে না। বরং তাঁরা এখন পজিশন হোল্ড করে, হাই-টেম্পোতে কাউন্টার অ্যাটাক করে, চোখের পলকে রক্ষণ থেকে আক্রমণে (ডিফেন্স টু অফেন্স ট্রানজিশনে) উঠতে পারে, এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই তীব্রতায় (ইনটেনসিটিতে) লড়াই করার মানসিকতা রাখে।
বিগত চার বছরে ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, জার্মানি আর স্পেনকে হারানোর রেকর্ডই বলে দেয়, জাপানের এই দলটি কতটা ভয়ংকর। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে জাপান গ্রুপ পর্বে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বের টিকিট পায়। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালের পর ইউরোপের কোনো দলের কাছে আর হারেনি জাপান। এসময়ে ৮ বার ইউরোপিয়ান দলের সাথে মুখোমুখি হয়ে ৬ বারই জয়ী হয় তাঁরা। এর মধ্যে দু’বার জার্মানিকে (এর মধ্যে একবার ৪-১ ব্যবধানে) এবং একবার করে স্পেন ও ইংল্যান্ডকে হারায় হাজিমে মরিয়াসুর শিষ্যরা।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলকেও ৩-২ গোলে পরাস্ত করে জাপান। সম্প্রতি এক প্রেস কনফারেন্সে ব্রাজিলের বিপক্ষে এই জয়ের কথা উল্লেখও করেন জাপানের কোচ।
জাপানের শক্তিমত্তা ও কৌশল
জাপানের এই দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে, এই দলটিতে একক কোনো তারকা নেই, যেমনটা এক সময় ছিল হিদেতোশি নাকাতা। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া, শৃঙ্খলা, কৌশল, এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা- এই বিষয়গুলোই তাঁদেরকে দুর্দান্ত এক দলে পরিণত করেছে।
পাশাপাশি ফুটবলিং স্কিলেও কোনো ঘাটতি নেই তাঁদের। দুর্দান্ত গতির পাশাপাশি তাঁদের টেকনিক্যাল দক্ষতা এবং কৌশল- সবই আছে এই দলটিতে। ম্যাচে লিড ধরে রাখার জন্য তাঁরা যেমন লো-ব্লক ডিফেন্সে খেলতে পারদর্শী, তেমনি বড় দলের বিপক্ষে তুলনামূলক কম পজেশন নিয়েও তাঁরা কাউন্টার অ্যাটাকে কুইক ট্রানজিশনে যেতে সিদ্ধহস্ত। বিশেষ করে বড় দলগুলো যখন হাই-লাইন ডিফেন্স নিয়ে খেলে, তখন ডিফেন্সের পেছনে তৈরি হওয়া খালি জায়গার ফায়দা তুলে নিতে পারে উইদা, মাইদা, কামাদার মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা।
জাপান সাধারণত ৩-৪-৩ ফর্মেশনে খেলে থাকে। এটা তাঁদের বেজ ফর্মেশন। তবে বলের পজেশন হারালে তাঁরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ৫-৪-১ ফর্মেশনে চলে আসে। ফলে আক্রমণে উঠার জন্য তাঁদের রক্ষণে খুব বেশি স্পেস তৈরি হয় না, যেটা বড় দলগুলোর জন্য ভয়ের কারণ। এক্ষেত্রে ক্রিয়েটিভ এবং টেকনিক্যালি সাউন্ড প্লেমেকার না থাকলে জাপানের ডিফেন্সে ছোট ছোট স্পেস (পকেট অব স্পেস) বের করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
ব্রাজিল কী করবে?
ব্রাজিল পজেশন ধরে রেখে, হাই-প্রেস ফুটবলটাই খেলার চেষ্টা করবে। যেমনটা তাঁরা হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছে। তবে এক্ষেত্রে তাঁদেরকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, হাই-লাইন ডিফেন্স নিয়ে খেলতে গিয়ে ডিফেন্সের পেছনে যে স্পেসটা তৈরি হবে সেটার সুযোগ যেন জাপানের ফ্রন্টলাইন নিতে না পারে।
এক্ষেত্রে দুই সেন্টারব্যাক গ্যাব্রিয়েল ও মার্কিনিওসের পাশপাশি দগলাস সান্তোস বা দানিলোর মধ্যে যেকোনো একজন ফুলব্যাককে ডিফেন্সিভ ইউনিট বজায় রাখতে হবে। কাউন্টার অ্যাটাক সামাল দিতে মাঝমাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে কাসেমিরোকেও, বিশেষ করে বলের পজেশন হারানোর পর ট্রানজিশনের মুহূর্তে বিপক্ষের পাসিং চ্যানেল ব্লক করার কাজটা কাসেমিরো কতটা ভালোভাবে করতে পারেন তার ওপর এই ম্যাচে ব্রাজিলের সাফল্য নির্ভর করবে অনেকাংশে।
নেইমার কি খেলবেন শুরু থেকেই?
ব্রাজিল সমর্থকদের মনে এই প্রশ্নটি এখন জোরালভাবেই উঠছে। তবে উত্তরটা এতটা সহজ নয়। পুরোপুরি ফিট নেইমার যে জাপানের মতো দল- যারা লো-ব্লক ডিফেন্সে খেলতে অভ্যস্ত, তাঁদের বিপক্ষে দারুন কার্যকর হতে পারে, সেটাতো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে অ্যাটাকিং থার্ডে ছোট ছোট স্পেস তৈরি করতে এবং পকেট অব স্পেসে সতীর্থ খেলোয়াড়দের খুঁজে পেতে নেইমার হতে পারে ব্রাজিলের ট্রাম্পকার্ড।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মাত্রই ইনজুরি থেকে ফিরে নেইমার স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ১৫ মিনিট খেলেছেন। সেটাও এমন এক সময় যখন দল ৩-০ ব্যবধানে জিততে চলেছে। এখন নকআউট পর্বে এসে প্রথম ম্যাচেই নেইমারকে হাই-প্রেসিং, হাই-টেম্পোতে খেলা জাপানের বিপক্ষে শুরু থেকে খেলাবেন কোচ আনচেলত্তি- এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা বোধহয় কমই।
বিশেষ করে, ফলস নাইন হিসেবে কুনহার পারফরম্যান্স এবং এর ফলে ভিনিসিয়ুসের আরও বেশি জ্বলে ওঠা, পাশাপাশি মাঝমাঠে কুনহার সাথে পাকেতা ও গিমারেজের বোঝাপড়া, রাইট উইংয়ে রায়ানের উঠে আসা- সব মিলিয়ে ব্রাজিল গ্রুপ পর্বের শেষ দুই ম্যাচে দুর্দান্ত একটি ইউনিট হয়ে উঠার ইঙ্গিত দিয়েছে। জাপানের বিপক্ষে সেটা হয়তো ভাঙতে চাইবেন না কোচ আনচেলত্তি। বরং নেইমার দ্বিতীয়ার্ধে ২৫-৩০ মিনিটের জন্য মাঠে নামিয়ে ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার দায়িত্বই হয়তো দেবেন তিনি।
ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধ
গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে ৫ পয়েন্ট নিয়ে জাপান এখন দাঁড়িয়ে ইতিহাসের দোরগোড়ায়। রাউন্ড অফ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার সাম্বা ম্যাজিকের সামনে এবার এশিয়ার সামুরাই ডিসিপ্লিনের এক চরম পরীক্ষা।
জাপান কি পারবে ব্রাজিলের হেক্সা মিশনকে থামিয়ে দিয়ে তাদের ১০০ বছরের স্বপ্নপূরণের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যেতে? নাকি সেলেসাওদের অভিজ্ঞতার কাছে থমকে যাবে সামুরাইদের দৌড়? ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় নিশ্চিত, ১৯৯১ সালের সেই অপেশাদার জাপান আজ বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন পরাশক্তি।



