এই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা আরও একবার ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) অত্যন্ত বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তের সুবিধা পেল। রোববার সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। আর এতেই তৈরি হয় বিতর্ক।
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিঅ্যান্দ্রো পারেদেস সুইজারল্যান্ডের এম্বোলোকে ফাউল করায় রেফারি তাঁকে হলুদ কার্ড দেখান। তবে ভিএআর দল এই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে রেফারি জোয়াও পিনহেইরোকে মাঠের পাশের মনিটরে ফুটেজটি পুনরায় দেখার অনুরোধ জানায়। ভিডিও ফুটেজটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর পর্তুগিজ রেফারি পিনহেইরো সিদ্ধান্ত নেন, পারেদেস কোনো ফাউল করেননি। এরপর তিনি তাঁর হলুদ কার্ডটি বাতিল করেন। কিন্তু এর পরপরই রেফারি আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নেন। পারেদেসের কার্ড বাতিলের ঠিক পরেই তিনি এম্বোলোকে ফাউলের ভান করার অপরাধে হলুদ কার্ড দেখান।
এই সিদ্ধান্তটি হয়তো খুব বেশি বড় হত না। কিন্তু সুইস ফরোয়ার্ড ম্যাচের প্রথমার্ধে আরেকটি ফাউলের জন্য আগেই একটি হলুদ কার্ড পেয়েছিলেন। ফলে দ্বিতীয় কার্ডের কারণে রেফারি তাঁকে লাল কার্ড দেখান। এই সিদ্ধান্তের পর পুরো সুইজারল্যান্ড দল তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তবে শেষ পর্যন্ত চোখের পানিতে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয় এম্বোলোকে। পেশাদার ফুটবলে ফাউলের নাটকের কারণে কোনো খেলোয়াড়কে দ্বিতীয়বার হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
রেফারির এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত কঠোর বলে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনা। একই সঙ্গে এটি মেসির আর্জেন্টিনার প্রতি ভিএআরের পক্ষপাতিত্বের পুরোনো বিতর্ককে আবারও উসকে দিয়েছে।
ফাউলের ভান করা নিয়ে নিয়মটা আসলে কী?
ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) নিয়ম অনুযায়ী, ফাউলের ভান করা সম্পূর্ণভাবে 'অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ'। রুলবুক অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যদি রেফারি বা ম্যাচ অফিশিয়ালদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তাঁকে অবশ্যই সতর্কবার্তা বা হলুদ কার্ড দেখাতে হবে। আইএফএবির ‘ফাউল ও অসদাচরণ’ সংক্রান্ত ১২ নম্বর নিয়মের ৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য একজন খেলোয়াড়কে অবশ্যই হলুদ কার্ড দেখাতে হবে যদি তিনি রেফারিকে প্রতারিত করার চেষ্টা করেন; যেমন—আহত হওয়ার ভান করা কিংবা ফাউলের শিকার হয়েছেন এমন নাটক করা।
ফুটবলের ভাষায় এই পরিস্থিতিকে বলে সিমুলেশন।
পেশাদার ফুটবলে কেবল সিমুলেশনের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। যদিও ফুটবলের নিয়মে ডাইভিং বা ড্রপ করাকে স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, তবুও বেশ কিছু কৌশলগত ও কাঠামোগত কারণে এর জন্য সাধারণত লাল কার্ড বা দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেওয়া হয় না।
রেফারিরা সাধারণত দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক থাকেন, কারণ তাঁরা জানেন যে একটি দলকে ১০ জনের দলে পরিণত করলে ম্যাচের পুরো গতিপ্রকৃতি বদলে যায়। একজন রেফারি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাকল বা প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্নক কাউন্টার-অ্যাটাক থামানোর জন্য সহজেই কার্ড বের করতে পারেন, তবে ডাইভিংয়ের মতো অহিংস অপরাধের জন্য কাউকে মাঠছাড়া করতে ঐতিহ্যগতভাবেই দ্বিধাবোধ করেন।
তবে আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার এই উত্তেজনাপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালে আধুনিক প্রযুক্তির নিখুঁত চোখের সামনে সেই পুরোনো নিয়মের কোনো মূল্যই রইল না। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রিল এম্বোলো চতুর্থ খেলোয়াড়, যিনি সিমুলেশনের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন।
এর আগে সর্বশেষ ২০০৬ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ঘানার আসামোয়াহ গিয়ান এই ধরনের লাল কার্ড পেয়েছিলেন।