কেন ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন ফিফা সভাপতি?

‘ভুল হয়েছে, আমরা দুঃখিত’— বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মুখ দিয়েই শেষ পর্যন্ত এমন কথাই বের হলো। যে মানুষটা গত এক দশক ধরে ফিফাকে নিজের মতো করে পরিচালনা করছেন, সেই ইনফান্তিনোকেই এবার ক্ষমা চাইতে হলো নিজের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য।

কারণ, বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টের অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার এক পরিকল্পনায় নিজের চেয়ারই প্রায় হারাতে বসেছিলেন তিনি। উয়েফা, কনক্যাকাফের মতো ফুটবল সংস্থাগুলো তাঁর বিরুদ্ধে রীতিমতো বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, উঠেছিল তার পদত্যাগের দাবিও।

শেষমেশ পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে ক্ষমা চেয়ে এই যাত্রায় রক্ষা পেয়েছেন ইনফান্তিনো। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই ক্ষমা প্রার্থনায় সত্যিই কি সব ঝামেলা মিটে গেছে? নাকি সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য?

কী ছিল ইনফান্তিনোর সেই বিতর্কিত পরিকল্পনায়?

তো, কী এমন পরিকল্পনা যার জন্য ক্ষমা চাইতে হলো খোদ ফিফা সভাপতিকেই? পুরো বিতর্কের শুরু ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা এফএফই নামের একটি পরিকল্পনা থেকে। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় বড় টুর্নামেন্টের মুনাফার একটা অংশ— নির্দিষ্ট করে বললে প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার— বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার তোলার লক্ষ্য ছিল ফিফার, যেখানে পুরো প্রতিষ্ঠানের মূল্য ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটি ডলার।

এই বিনিয়োগে "অ্যাংকর ইনভেস্টর" হিসেবে থাকার কথা ছিল জশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটার্নালের— যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। রাজি হলে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে ৪ কোটি ডলার করে দেওয়ারও প্রলোভন দেখানো হয়।

কীভাবে ফাঁস হলো, আর কেন এত সমালোচনা?

এই গোপন পরিকল্পনা প্রথম প্রকাশ্যে আনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস। খবরটি প্রকাশের পরই শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এতটাই ক্ষুব্ধ হয় যে, তাদের অধীনস্থ ৫৫টি দেশ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নেয়। উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সংস্থা কনক্যাকাফও বলে দেয়, ফিফার নেতৃত্ব ফুটবলকে আর অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।

ফিফার ভেতর থেকেও আসে বিরোধিতার সুর— প্রধান উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেন, আর প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা কেভিন লামুর বলেন, সভাপতির স্বচ্ছতার অভাবে কর্মীরা প্রতারিত বোধ করেছেন। এমনকি ফিফার নিজস্ব মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোমও পুরো ঘটনাকে দুঃখজনক ও নিন্দনীয় বলে আখ্যা দিয়ে দূরত্ব তৈরি করেছিলেন।

পরিকল্পনা প্রত্যাহার ও ইনফান্তিনোর ক্ষমা প্রার্থনা

চাপের মুখে গত শনিবার নিজের ২ হাজার কোটি ডলারের এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন ইনফান্তিনো। এরপর মরক্কোর রাবাতে জরুরি এক সভা ডাকেন তিনি। সভা শেষে ফিফার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ভুল স্বীকার করে বলা হয়, পুরো প্রক্রিয়াটি ভিন্নভাবে সামলানো উচিত ছিল। ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম যৌথভাবে ফিফার সহসভাপতি, কাউন্সিল ও ২১১টি সদস্যদেশের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে সভা শেষে ফিফার শীর্ষ নির্বাহীরা ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন।

তাহলে কি ইনফান্তিনোর চেয়ার নিরাপদ?

মরক্কোর বৈঠক আপাতত ইনফান্তিনোকে বড় ধাক্কা থেকে বাঁচিয়েছে। ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা প্রকাশ্যে তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, ২১১টি সদস্য দেশের ভোটে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর ওপর তাদের আস্থা রয়েছে।

কিন্তু সংকট এখানেই শেষ হচ্ছে না। কারণ বাইরে এখনো অসন্তোষ রয়ে গেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তার আস্থা নেই। সাবেক ফুটবলার লুইস ফিগোও সরাসরি পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতির পদের মর্যাদা কমিয়ে দিয়েছেন।

ইনফান্তিনোর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা— নির্বাচন

ইনফান্তিনোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে আগামী নির্বাচন। ২০২৭ সালের মার্চে ফিফা সভাপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। প্রতিদ্বন্দ্বীদের নাম জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ১৮ নভেম্বর। আর ইনফান্তিনো সেখানে চতুর্থ মেয়াদের জন্য লড়াই করতে চান। নিয়ম অনুযায়ী, ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে ১০৬ ভোট পেলেই জয় নিশ্চিত।

এখন প্রশ্ন হলো— যেসব দেশ এতদিন তার পাশে ছিল, তারা কি শেষ পর্যন্ত সমর্থন ধরে রাখবে? কারণ এরই মধ্যে কিছু সদস্য দেশ ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে উয়েফার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী ফুটবল সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে নির্বাচনের আগে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

সামনে তাহলে কী হতে পারে?

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আপাতত নিজের চেয়ার ধরে রেখেছেন। ভুল স্বীকার করেছেন, পরিকল্পনা বাতিল করেছেন, পেয়েছেন ফিফার অভ্যন্তরীণ সমর্থনও। কিন্তু এই সংকট তার নেতৃত্বের ওপর যে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, সেটি এত সহজে মুছে যাবে না। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় সংস্থার প্রধান হিসেবে এখন তাকে শুধু বিরোধীদের নয়, নিজের ভাবমূর্তির সঙ্গেও লড়াই করতে হবে। আপাতত ফিফা সভাপতির চেয়ার তার দখলে থাকলেও, সামনে থাকা নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তই হতে পারে ইনফান্তিনোর ভবিষ্যতের পরীক্ষা।