স্পেনের হাত থেকে মেসিকে যেভাবে ‘ছিনতাই’ করেছিল আর্জেন্টিনা

‘আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছি। আমার আর কিছুই দেওয়ার বাকি নেই’- এভাবেই জাতীয় দলকে চিরতরে বিদায় জানিয়েছেন লিওনেল মেসি। তাতে আর্জেন্টিনার জার্সিতে থেমে গেল মেসির দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলা। সেই পথচলায় নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল আর ৬৮ অ্যাসিস্ট। জিতেছেন একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, আর একটি ফিনালিসিমা।

কিন্তু এসবের কিছুই হতো না, যদি না ২১ বছর আগে সেই ফোন কলটি আসত। কিংবা স্পেনের সেই রাধুনি যদি মেসি সম্পর্কে মন্তব্যটা না করতেন। মেসির গায়ে উঠতে পারত স্পেনের জার্সি। দুই দশক আগে তো স্পেন প্রায় ছিনিয়েই নিয়েছিল মেসিকে। সেখান থেকে কীভাবে মেসি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হলেন?

 

যে কিশোরকে আর্জেন্টিনা প্রায় চিনতই না
২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে রোজারিও ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান মেসি। বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় তখন তাঁকে নিয়ে রীতিমতো হইচই। কিন্তু নিজের দেশ আর্জেন্টিনায়? তাঁকে প্রায় তেমন কেউই চেনে না। চিনবেই বা কীভাবে? তখন তো ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিল না!

আর্জেন্টিনার কোচরা তখন পর্যন্ত মেসিকে দেখেননি। অথচ স্পেন ঠিকই খবর রাখছিল। বার্সার যুব কোচ আলেক্স গার্সিয়া বারবার স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা হিনেস মেলেন্দেসকে বলছিলেন— এই ছেলেকে নিয়ে ভাবুন, কারণ আর্জেন্টিনা তো তাঁকে ডাকছেই না। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন তখন মেসিকে স্পেনের হয়ে খেলানোর চেষ্টা শুরু করে। এরপর এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা এখনকার সময়ে ভাবলে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। সেই ঘটনার মূলে একটি VHS ভিডিও টেপ।

 

যে টেপ বদলে দিয়েছিল সবকিছু
২০০৩ সালের মে মাসে, মেসির তৎকালীন এজেন্ট অরাসিও গাগ্গিওলি একটা ভিএইচএস টেপ তুলে দেন আর্জেন্টিনা দলের সহকারী কোচ ক্লদিও ভিভাসের হাতে। টেপে ছিল বার্সা টিভি থেকে রেকর্ড করা মেসির কিছু হাইলাইটস।

সেই টেপ শেষমেশ পৌঁছায় তখনকার আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ মার্সেলো বিয়েলসার কাছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন ফুটেজটা বোধহয় দ্রুতগতিতে চালানো হচ্ছে। যখন তাঁকে বলা হলো এটাই স্বাভাবিক গতি, বিয়েলসা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন— ছেলেটা অসাধারণ।

ভিভাস তখনই বুঝে যান, দেরি করলে চলবে না। টেপটা তিনি পাঠিয়ে দেন যুব দলের কোচ উগো তোকাল্লির কাছে, সঙ্গে একটা বার্তা— কোনোভাবে এই ছেলেটাকে হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবে না। আর্জেন্টনার তৎকালীন যুব দলের কোচ তোকাল্লি পরে বলেছিলেন, লম্বা চুলের ১৬ বছরের ছেলেটা যেন একটা কাঠবিড়ালি— প্রতিপক্ষের মধ্য দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে যাচ্ছিল।

 

সময়টাও প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াল মেসির
কিন্তু সময়টা ছিল খুবই বাজে। টেপটা তোকাল্লির হাতে পৌঁছায় ফিনল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে যাওয়ার মাত্র দশ দিন আগে। এত অল্প সময়ে দলে জায়গা পাকা করে ফেলা একজন খেলোয়াড়কে বাদ দিয়ে সদ্য আবিষ্কৃত এক কিশোরকে দলে নেওয়াটা অন্যায় মনে হয়েছিল তোকাল্লির কাছে। তাই মেসি থেকে যান দলের বাইরেই।

 

একজন রাঁধুনির এক মন্তব্য বদলে দিল ইতিহাস
অনুর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপেই ঘটে সেই টার্নিং পয়েন্ট। সেমিফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। যে ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরেছিল ৩-২ গোলে। হারের পরদিন, দুই দলের ভাগাভাগি করা হোটেলে তোকাল্লির সঙ্গে দেখা হয় স্পেন দলের সঙ্গে আসা এক রাঁধুনির। রাঁধুনি তাঁকে বলেন, বার্সেলোনায় খেলা এক প্রতিভাবান ছেলেকে যদি আর্জেন্টিনা দলে নিত, হয়তো ম্যাচটা আর্জেন্টিনাই জিতত! এমনকি হতে পারত চ্যাম্পিয়ন!

তোকাল্লি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যান, কার কথা বলা হচ্ছে। রাঁধুনির সঙ্গে এই ছোট্ট আলাপেই তাঁর মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। তিনি ভাবতে থাকেন, এক রাঁধুনি মেসির সম্পর্কে এতটা জানলে, স্পেন কি বসে আছে? তাহলে কি স্পেন মেসিকে আগেভাগে দলে নিয়ে নেবে?

 

টেলিফোন ডিরেক্টরি, এবং আর্জেন্টিনার ডাক
ফিনল্যান্ড থেকে ফিরেই তোকাল্লি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেন। সেই দায়িত্ব পড়ে এএফএ কর্মকর্তা ওমার সৌতোর ওপর। দায়িত্বটা হলো- মেসির পরিবারকে খুঁজে বের করা। কিন্তু সমস্যা হলো, মেসির পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কোনো নম্বর নেই। তিনি বুয়েনস আইরেসের বাইরে একটা টেলিফোন বুথে গিয়ে ফোন ডিরেক্টরি খুলে রোজারিওর সব ‘মেসি’ পদবির মানুষদের কল করতে শুরু করেন। তবে শুরুতে তিনি ‘লিওনার্দো’ নামের কাউকে খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মেসির দাদি, এরপর এক চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তারপর স্পেনে থাকা হোর্হে মেসির সঙ্গে কথা হয় তার।

হোর্হে মেসি প্রথমেই সংশোধন করে দেন— তাঁর ছেলের নাম লিওনার্দো নয়, লিওনেল। এরপর মেসির বাবা যা বললেন, সেটাও যেন আরেক ইতিহাস। হোর্হে মেসি সেসময় বলেছিলেন, ‘অবশেষে তোমরা তাকে ডাকলে। আমার ছেলে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে চায়।’

 

এএফএর ভুল বানান, ইতিহাস বদলানো মুহূর্ত
কিন্তু এরপরও ভুলের শেষ নেই। এএফএ বার্সেলোনায় ফ্যাক্স পাঠাল, মেসির প্রথম কল-আপের কাগজ চেয়ে। সেখানে মেসির ভুল বানানে লেখা ছিল ‘লিওনেল মেচ্চি’ নামে। সে যাই হোক, আর্জেন্টিনার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার। যে করেই হোক, মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরাতে হবে। সে জন্য তড়িঘড়ি করে একটা প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

২০০৪ সালের ২৯ জুন আসে সেই মুহূর্ত। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে আয়োজিত অনূর্ধ্ব-২০ সেই প্রীতি ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে গোল করেন মেসি। সেই ম্যাচে গ্যালারিতে দর্শক সংখ্যা ছিল মোটে ৫০০ এর মতো। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয়, এক মহাকাব্যিক যাত্রা।

 

সেই স্পেনের মুখোমুখি মেসি!
এক বছর পর, ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-স্পেন। এবার প্রতিপক্ষ দলে ছিলেন মেসির বার্সা-সতীর্থ ফ্যাব্রিগাসও। ওই ম্যাচে স্পেন প্রথমে এগিয়ে গেলেও মেসির দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ৩-১ গোলে জেতে আর্জেন্টিনা। শুধু স্পেনের বিপক্ষে ওই ম্যাচেই নয়, সেমিফাইনালে ব্রাজিল ও ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির ঝলকেই চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। আর টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়- দুটো পুরস্কারই জেতেন মেসি।

যে কিশোরকে একসময় খুঁজে পেতেই হিমশিম খেয়েছিল আর্জেন্টিনা, সেই মেসিই এবার পুরো বিশ্বের সামনে নিজের আগমনের জানান দিলেন।

 

ব্যর্থতা থেকে অমরত্বের পথে
যুবাদের হয়ে অবিশ্বাস্য এই কীর্তির পর মূল জাতীয় দলে অভিষেক হতে আর বেশি সময় লাগেনি মেসির। ২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথচলাটা শুরু হয় তাঁর। এরপরের গল্পটা সবার জানা। তবে শুরুর অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের সেই সাফল্যের পর যতটা সহজ মনে হয়েছিল, পথ ততটা সহজ ছিল না

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, ২০১৫ আর ২০১৬ কোপা আমেরিকা ফাইনালেও হার। এক পর্যায়ে জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণাও করেছিলেন মেসি। কিন্তু ফিরে আসেন। আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পুরো গল্প।

২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে জেতেন কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে কাতারে বহু আকাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ। মাঝে ফিনালিসিমা আর ২০২৪ এ আরেকটা কোপা আমেরিকা। জাতীয় দলে মেসির অবিশ্বাস্য যাত্রা চলতেই থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। কিন্তু এবার আর পারেনি আর্জেন্টিনা। স্পেনের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটাতে হেরে বসে ১-০ ব্যবধানে। আর স্পেনের বিপক্ষে ওই ফাইনালটাই হয়ে থাকল জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ।

 

মেসিকে স্পেন চেয়েছিল, মেসি কী চেয়েছিলেন?
এটা সত্যি যে, স্পেন মেসিকে চেয়েছিল। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টাও চালিয়েছিল। কিন্তু মেসির নিজের ইচ্ছেটা কখনোই অস্পষ্ট ছিল না। অনেক অপেক্ষার পর যখন আর্জেন্টিনা থেকে মেসির বাবার কাছে ফোন গিয়েছিল, মেসির বাবা হোর্হে মেসির জবাবটাই ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট— তাঁর ছেলে অনেক আগে থেকেই আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে চেয়েছিল।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর, বার্সেলোনার সেই অল্পপরিচিত কিশোর ছেলেটাই বিদায় নিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে। বিদায় নিলেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস বদলে দিয়ে। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো ফুটবলেরই ইতিহাস বদলে দিয়ে।

আর বিদায়ী মুহূর্তেও মেসি মনে করিয়ে দিলেন, তিনি আর্জেন্টিনাকে কতখানি চেয়েছিলেন। মেসির ভাষায়, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’