মেসি, কেইন, এমবাপ্পে নাকি ইয়ামাল— কার হাতে উঠছে ব্যালন ডি’অর?

মেসির ঝুলিতে কি উঠতে যাচ্ছে রেকর্ড নবম ব্যালন ডি’অর? নাকি এবার ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর পাবেন হ্যারি কেইন কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পে? আর গতবারের বিজয়ী উসমান দেম্বেলের হাতে আরও একবার ব্যালন ডি’অর ওঠার সম্ভাবনাই বা কতটুকু? নাকি স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী ১৯ বছরের লামিন ইয়ামাল-ই শেষ মুহূর্তে বাজিমাত করবেন?

২০২৬ ব্যালন ডি’অর কি এই ৫ জনের মধ্যেই কারও হাতে উঠছে? নাকি হিসাবের বাইরে থেকে অন্য কেউ এসে ছিনিয়ে নেবেন বছরের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার?

আগামীকাল সোমবার রাতে লন্ডনের মঞ্চে যখন খামটা খোলা হবে, তখনই জানা যাবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত পুরস্কারটা কার হাতে উঠবে। প্রাথমিক তালিকাটা ৩০ জনের হলেও, চলুন জেনে নেওয়া যাক- ২০২৬ ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন কারা?

 

হ্যারি কেইন: গোলের বন্যা, অবশেষে ট্রফিও

প্রথমেই বলতে হবে হ্যারি কেইনের কথা। ট্রফি না জেতার যে খোঁচাটা হ্যারি কেইনকে সবসময় সহ্য করতে হতো, এবার সেটা একপাশে উড়িয়ে দিয়েছেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। আর তারপর যা করেছেন, সেটা রীতিমতো ভয়ংকর।

ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সি মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল, সঙ্গে ৮ অ্যাসিস্ট। বুন্দেসলিগায় ৩৬ গোল করে টানা তৃতীয়বার সর্বোচ্চ গোলদাতা, জিতেছেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট। বায়ার্নকে জিতিয়েছেন বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ (ডিএফবি পোকাল), আর সুপার কাপ। চ্যাম্পিয়নস লিগে দলকে তুলেছেন সেমিফাইনালে।

শুধু গোল নয়। নিচে নেমে খেলা তৈরি করা, প্রেস করা, সতীর্থদের খেলায় রাখা— সব মিলিয়ে পুরো খেলাটাই খেলেছেন তিনি। বিশ্বকাপে ৬ গোল করে ইংল্যান্ডকে তুলেছেন তৃতীয় স্থানে, যা গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপে ইংলিশদের সেরা পারফরম্যান্স। অনেকে বলবেন, উত্তর আমেরিকায় শিরোপা না জেতাই তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আর সেই ফাঁক গলেই হয়তো ব্যালন ডি’অরটা হাতছাড়া হতে পারে কেইনের।

কিন্তু ব্যালন ডি'অর নির্ধারণে মূলত যা দেখা হয়— অর্থাৎ, এক মৌসুমে কার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স সবচেয়ে ভালো— সেই প্রশ্নের উত্তরে ৭৩ গোল, ৩টি শিরোপা আর একটি গোল্ডেন বুটের বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। বাজিকরদের হিসাবে তাই ব্যালন ডি’অর জয়ে অনেকটাই এগিয়ে ইংলিশ অধিনায়ক। আর হ্যারি কেইন জিতলে ইংলিশদের ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান হবে; সেক্ষেত্রে ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর কেইন-ই হবেন ব্যালন ডি’অর বিজয়ী প্রথম ইংলিশ তারকা- আর সেটাও আবার লন্ডনের মঞ্চে।

 

লামিন ইয়ামাল: ১৯ বছরেই ইতিহাস?

ব্যালন ডি’অর-এর দৌড়ে আছেন স্পেনের ১৯ বছর বয়সী বিশ্বকাপজয়ী তারকা লামিন ইয়ামালও। এরইমধ্যে বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে বড় মঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন এক সময়ের এই বিস্ময়বালক। গত মৌসুমে লা লিগায় ১৬ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট— বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন, আর তিনি লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড়। চ্যাম্পিয়নস লিগে ১০ ম্যাচে ৬ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট। সব মিলিয়ে মৌসুমে ২৬ গোল, ২১ অ্যাসিস্ট। এরপর স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন তিনি। 

ইয়ামালের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যাটা দেখলে পুরো গল্পটা বোঝা যায় না। বল পায়ে তাঁর গতি, ড্রিবলিং, সুযোগ তৈরি করা এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা— সব মিলিয়ে দলের সার্বিক পারফরম্যান্সে তাঁর প্রভাব আছে। কিন্তু এ বছর স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ে ইয়ামালের ভূমিকা কতটা ছিল, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তাই ক্লাব ও দেশ- দুই জায়গাতেই শিরোপা জিতলেও, সেটা ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য যথেষ্ট হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যদি গোল্ডেন বলটা তাঁর হাতে ওঠে, তাহলে ইতিহাস গড়বেন ১৯ বছরের ইয়ামাল। কারণ এর আগে কেউই ২১ বছরের নিচে ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি।

 

কিলিয়ান এমবাপ্পে: গোলের হিসাবে ভয়ংকর, কিন্তু ট্রফি কোথায়?

মোনাকোর কিশোর এমবাপ্পে যখন থেকে আলোচনায়, তখন থেকেই একটা বাক্য পরিচিত— এই ছেলে একদিন ব্যালন ডি'অর জিতবে। গত ডিসেম্বরে ২৭ বছর পূর্ণ হয়েছে এমবাপ্পের। কিন্তু ব্যালন ডি’অর জয়ের অপেক্ষা তাঁর এখনো শেষ হয়নি।

ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে এবার এমবাপ্পে প্রায় অতিমানবীয়। লা লিগায় ২৫ গোল করে মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা, চ্যাম্পিয়নস লিগেও সবচেয়ে বেশি ১৫টি গোল তার নামের পাশেই শোভা পাচ্ছে। রেয়াল মাদ্রিদের বর্ষসেরা ফুটবলারও হয়েছেন তিনি। ধুঁকতে থাকা রেয়াল মাদ্রিদকে কার্যত একাই টেনে নিয়ে গেছেন তিনি। আর সেটা করতে গিয়ে হাঁটুর চোট বাধিয়েছেন, সেই চোট পুরোপুরি সারার আগেই রেয়ালের মৌসুম শেষ।

ফল? লিগে রানার্সআপ, আর চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় রেয়াল মাদ্রিদের। অর্থাৎ, ক্লাব পর্যায়ে বড় কোনো দলগত ট্রফি নেই এমবাপ্পের।

তবে বিশ্বকাপে বরাবরের মতোই জ্বলে উঠেছেন তিনি— টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ ১০ গোল, টানা দ্বিতীয় গোল্ডেন বুট। মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু ফ্রান্স সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরেছে, আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণীতে হেরেছে ইংল্যান্ডের কাছেও।

ব্যালন ডি'অর যদি শুধু গোলসংখ্যার পুরস্কার হতো, সোনালী বলটা নিশ্চিতভাবেই এমবাপ্পের হাতেই শোভা পেত। কিন্তু ভোটাররা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স আর দলীয় সাফল্যের মধ্যে কোনটাকে কতটা গুরুত্ব দেন, সেটাই নির্ধারণ করে দেবে ব্যালন ডি'অরে জন্য এমবাপ্পের অপেক্ষাটা কতটা দীর্ঘায়িত হবে।

 

উসমান দেম্বেলে: ট্রফি ভরপুর, কিন্তু টাইমিং ভুল

গতবারের বিজয়ী উসমান দেম্বেলেকেও ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গেল মৌসুমের ট্রফি-ক্যাবিনেট দেখলে মনে হবে এক্ষেত্রে তর্কই চলে না— চ্যাম্পিয়নস লিগ, ফ্রেঞ্চ লিগ (লিগ ওয়ান), উয়েফা সুপার কাপ, ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ, ট্রফি দে শঁপিয়ন- এই সবগুলো ট্রফিরই স্বাদ পেয়েছেন এই পিএসজি তারকা।

কিন্তু সমস্যা এখানে দুটো। প্রথমত, মৌসুমের প্রথমার্ধটা তাঁর চোটে কেটেছে; আর দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর প্রভাব। ক্যারিয়ারে প্রথমবার বিশ্বকাপে গোল পেয়েছেন, নরওয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ মোট ৬ গোল করেছেন বিশ্বকাপে। তবুও দেম্বেলে ঢাকা পড়ে গেছেন এমবাপ্পে-ওলিসের মতো সতীর্থদের ছায়ায়। এছাড়া টানা দুইবার ব্যালন ডি'অর জিততে হলে যে অনস্বীকার্য শ্রেষ্ঠত্ব দরকার, সেটা সম্ভবত এবার তাঁর ছিল না।

 

রদ্রি: যিনি পরিসংখ্যানে ধরা পড়েন না

এই নামটাকে একেবারে হিসাবের বাইরে রাখার কোনো উপায় নেই। রদ্রিকে ঠিক গোল আর অ্যাসিস্ট দিয়ে মাপা যায় না। স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে আট ম্যাচের প্রতিটিতেই খেলেছেন, দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপার স্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন, পাশাপাশি নিজেও জিতেছেন টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার- গোল্ডেন বল। বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ পাস দেওয়ার নতুন রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।

মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের ইউরোতেও রদ্রি ঠিক এভাবেই মাঠের খেলায় স্পেনের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে দলকে যেমন শিরোপা জিতিয়েছিলেন, তেমনি ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে তিনি হারিয়ে দিয়েছিলেন গোলের পরিসংখ্যানে অনেকটাই এগিয়ে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের। অর্থাৎ, ভোটাররা তাঁর মূল্যটা বোঝেন, যথার্থ মূল্যায়নও করেন।

তবে এখানে বাধা আছে। রদ্রির ক্লাব মৌসুমটা ছিল চোটে জর্জরিত— ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৩৩ ম্যাচে মাত্র ২ গোল, নেই বড় কোনো ট্রফি। ক্লাব পর্যায়ের এই শূন্যতা ঢাকা কঠিন। এরপরও রদ্রি আরও একবার ব্যালন ডি’অর জিতলে সেটা হবে নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্সের পুরস্কার। আর না জিতলে সেটা হবে ক্লাব পর্যায়ে নিতান্তই সাদামাটা এক মৌসুম কাটানোর শাস্তি।

 

লিওনেল মেসি: রূপকথার শেষ অধ্যায়?

সবশেষে একটি নাম না নিলে পুরো আলোচনাটাই অপূর্ণ থেকে যায়। লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি যা করেছেন, সেটাকে স্রেফ একটা ‘ভালো মৌসুম’ বলা অন্যায় হবে।

গেল মৌসুমে ইন্টার মায়ামিকে জিতিয়েছেন ক্লাবের ইতিহাসের প্রথম এমএলএস কাপ, নিজে জিতেছেন টানা দ্বিতীয় এমএলএস এমভিপি, অর্থাৎ, লিগের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। প্লে-অফের ছয় ম্যাচে ৬ গোল, ৭ অ্যাসিস্ট। আর পুরো মৌসুমে ৪৪ গোল, ৩০ অ্যাসিস্ট।

এরপর বিশ্বকাপে মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্স। আর্জেন্টিনাকে বলতে গেলে একাই টেনে তুলেছেন ফাইনালে। আর এই যাত্রায় ৮ গোলের সঙ্গে করেছেন ৪ অ্যাসিস্ট। গোলসংখ্যায় মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে গেছেন, জিতেছেন বিশ্বকাপের সিলভার বল আর সিলভার বুট।

তাহলে মেসি আটকাচ্ছেন কোথায়? ফাইনালে। স্পেনের কাছে হেরে আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হয়েছে। ব্যালন ডি'অরের ভোটাররা রানার্সআপ হওয়াকে কতটা প্রাধান্য দেন, সেটাও একটা বিষয়। তাছাড়া এমএলএসের পারফরম্যান্স ইউরোপীয় সাংবাদিকদের ব্যালটে কতটা ওজন পাবে, সেই প্রশ্নও থেকেই যায়। এরপরও যদি মেসির হাতে নবমবারের মতো ব্যালন ডি’অর ওঠে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।