ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জন্য সময়টা যাচ্ছেতাই যাচ্ছিল। গতকাল মঙ্গলবারের আগ পর্যন্ত সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সর্বশেষ ১০ ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি রেড ডেভিলরা। এতে ক্লাবটির কোচ মাইকেল ক্যারিকের ওপর যেমন চাপ বাড়ছিল, তেমনি মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছিলেন সমর্থকদের একাংশ।
এমন পরিস্থিতিতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে গতকাল রাতে ঘরের মাঠ ওল্ড ট্রাফোর্ডে রোমার বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল ম্যান ইউনাইটেড। মাইকেল ক্যারিকের দলের জন্য ম্যাচের শুরুটাও হয়েছিল একেবারে হতশ্রী। ১৮ মিনিটের মধ্যেই দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে ইংলিশ ক্লাবটি।
অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, এ ম্যাচেও নাস্তানাবুদ হতে যাচ্ছে ম্যান ইউনাইটেড। তবে সেই ধারণা সত্যি হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে মাইকেল ক্যারিকের দল। ৫৮ মিনিটে ব্রুনো ফের্নান্দেসের পেনাল্টি গোল এবং ম্যাচের শেষ দিকে মাতেউস কুনিয়ার জোড়া গোলে ভর করে রোমাকে শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছে ম্যান ইউনাইটেড। এখন দেখার বিষয়, ম্যান ইউনাইটেডের এই জয় ক্যারিকের নড়বড়ে চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারে কি না।
চাকরি থাকুক বা না থাকুক, পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্যারিকের ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম সেরা জয়। মজার বিষয়, খেলোয়াড় হিসেবেও ক্যারিক চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের অন্যতম সেরা রাত কাটিয়েছেন রোমার বিপক্ষেই। তখন ম্যান ইউনাইটেডের হয়ে খেলতেন ক্যারিক। ২০০৭ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালিয়ান ক্লাবটির বিপক্ষে ৭-১ গোলের জয়ে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। এবার কোচ হিসেবে চাকরি টিকিয়ে রাখার ম্যাচে তাঁর দল অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল।
ম্যান ইউনাইটেডের সেই প্রত্যাবর্তনের নায়ক কুনিয়া। সেই ব্রাজিলিয়ান তারকাই আবার যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
রোমার বিপক্ষে এ জয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ৪ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের ১৭ নম্বরে উঠে এসেছে ম্যান ইউনাইটেড। আগামী রোববার প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে ঘরের মাঠে অ্যাস্টন ভিলাকে আতিথ্য দেবে রেড ডেভিলরা। ক্যারিকের জন্য সেটাও বাঁচা-মরার ম্যাচ। তবে রোমার বিপক্ষে জয়ের পর নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন তিনি। খেলোয়াড়েরা যে ক্যারিকের জন্য লড়েছেন, তা বলা সহজ। তবে তাদের নিজেদের জন্যও লড়াইটা ছিল জরুরি। এতদিনের সমালোচনার জবাবও দিতে চেয়েছেন তাঁরা।
সোমবার ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে বেশ নির্ভার ছিলেন ক্যারিক। দলের খেলায় কিছু ইতিবাচক দিক দেখেছেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতে, দল ভালো কিছু মুহূর্ত তৈরি করছিল। একটি জয়ও আসতে চলেছে। তবে প্রথমার্ধের খেলা দেখে কেউ তা কল্পনাও করতে পারেননি। বরং পুরো মৌসুমে ইউনাইটেডের রক্ষণভাগের যে দুরবস্থা দেখা গেছে, প্রথমার্ধে সেটিরই আরেকটি উদাহরণ ছিল।
চোটের কারণে এখনো মাঠের বাইরে লুক শ। তাই বাধ্য হয়েই ডানপায়ের ডিফেন্ডার দিয়োগো দালোতকে খেলাতে হয়েছে লেফট ব্যাক হিসেবে। ম্যাচের শুরুতে দালোত বেশ ওপরে উঠে খেলছিলেন। কৌশলটি ছিল কিছুটা সাহসী। তবে রোমার প্রথম গোলের সময় তাঁর অবস্থান ছিল বড় ভুল।
দ্রুত আক্রমণে ওঠে রোমা। বাঁ দিক থেকে রদ্রিগো মোরা যখন সামনে তাকান, তখন বিপরীত প্রান্তে অনেকটা ফাঁকা জায়গায় দেখতে পান মাতিয়াস সুলেকে। সেখানে কোনো ইউনাইটেড খেলোয়াড় ছিল না। দালোত তখন কোথায়? মোরা বল বাড়িয়ে দেন সুলেকে। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সহজেই গোলরক্ষক সেন্নে লামেন্সকে পরাস্ত করেন তিনি।
দ্বিতীয় গোলের সময় ইউনাইটেডের রক্ষণভাগের ভুল ছিল আরও ভয়াবহ। বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণে ওঠে রোমা। লেনি ইয়োরো নিজেদের গোলমুখের দিকে দৌড়ে পিছু হটছিলেন। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, ইউনাইটেডের বক্সের কাছে এসে রোমার আক্রমণ থেমে গেছে। কিন্তু তখনই বড় ভুল করেন হ্যারি ম্যাগুয়ার। তাঁর বাজে কিকে বল চলে যায় সুলের পায়ে। সুলে শরীরের ভঙ্গি বদলে শট নেন। বল গিয়ে লাগে আয়ডেন হেভেনের হাতে। পেনাল্টি থেকে গোল করেন মালেন। এই গোলের সময়ও দালোত প্রতিপক্ষের অর্ধে অনেকটা ওপরে ছিলেন।
ম্যাচ শুরুর আগেই স্টেডিয়ামে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে সমর্থকদের ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যাচ্ছিল। গ্লেজার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সবুজ ও সোনালি রঙের বেলুন উড়ছিল স্টেডিয়ামজুড়ে। চারদিকে শোনা যাচ্ছিল মালিকপক্ষবিরোধী স্লোগান। পুরো ম্যাচের আগের পরিবেশেই ছিল সেই প্রতিবাদের উত্তাপ।
ম্যাচের ২০ মিনিট ৫ সেকেন্ডে, অর্থাৎ ২০০৫ সালে গ্লেজার পরিবারের ক্লাবটির মালিকানা নেওয়ার বছরটির কথা মনে করিয়ে দিতে, স্ট্রেটফোর্ড এন্ড গ্যালারির সমর্থকেরা পরিকল্পিতভাবে মাঠে টেনিস বল ছুড়ে মারেন। এভাবেই মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিবাদ জানান তাঁরা।