কালো পোশাক পরে শবদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য যাচ্ছিলেন তাঁরা। স্বাভাবিকভাবেই শোকে মুহ্যমান সবাই। শবযাত্রীদের সে পথচলা যেন নিঃশব্দ। হঠাৎ দূর থেকে আওয়াজ তাঁদের কানে ভেসে আসতে লাগল।
শব্দটা আস্তে আস্তে জোরাল হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, শব্দের উৎস আস্তে আস্তে তাদের কাছাকাছি আসছে। যত কাছাকাছি আসছিল শব্দের উৎসটা, আওয়াজটা তত স্পষ্ট হচ্ছিল। ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের আওয়াজ, যা মিশে গেছে উৎফুল্ল হাসি আর স্লোগানের সঙ্গে। এক সময়ে শব্দের উৎস দৃশ্যমান হলো। সমাধিক্ষেত্রে দাঁড়ানো শবযাত্রীরা দেখলেন, খোলা লরিতে একদল যুবক চিৎকার-চেঁচামেচি-উল্লাস করতে করতে সেদিক দিয়েই যাচ্ছেন। লাল-সবুজ রিবন উড়ছে বাতাসে।
লরিতে উল্লাসরত যুবকরা স্থানীয় মাইয়ো কাউন্টির খেলোয়াড়, যারা সে মৌসুমে গেইলিক ফুটবলের সম্ভাব্য সবই জিতেছেন। তাঁদের ওই খোলা লরিতে যাত্রার কারণ, ডাবলিনের ক্রোক পার্কে ৭৮ হাজার দর্শকের সামনে মাত্রই সে বছরের অল-আয়ারল্যান্ড টুর্নামেন্ট জিতেছেন তাঁরা।
ঘটনার সময়কাল - ১৯৫১ সাল। মৌসুমের সবচেয়ে বড় ম্যাচটা টানা দ্বিতীয় বছরের মতো জিতেছেন মাইয়োর খেলোয়াড়েরা, আকাঙ্খিত স্যাম ম্যাগুয়ার কাপের শিরোপা ধরে রেখেছেন। অমন খোলা লরিতে উল্লাস তো তাঁদের করারই কথা।
কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপার তো এসব খেলা-শিরোপার চেয়েও বড়। বিশেষ করে ১৯৫০-এর দশকের আয়ারল্যান্ডে, যেখানে ধর্মবিশ্বাস আর রীতিনীতির প্রভাব মানুষের মনের অনেক গভীরে। সেখানে সামনে যখন একটা সমাধিক্ষেত্র আর উপস্থিত শবযাত্রা, শিরোপার উল্লাস থামিয়ে দেওয়াই কর্তব্য। শবযাত্রার দিক থেকে সে নির্দেশনা গেল শিরোপাধারীদের দিকে। কিন্তু তারুণ্যের স্পর্ধা আর শিরোপা জয়ের উত্তেজনায়ই কিনা, সে নির্দেশনা কানে গেল না মাইয়ো কাউন্টির খেলোয়াড়দের। লরি চলতে থাকল, উল্লাসও। থাকল না শবযাত্রার পবিত্রতা।
শবযাত্রার নেতৃত্ব দেওয়া পুরোহিতের অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপিত হলো শিরোপা নিয়ে উল্লাস করা তরুণদের দিকে। ক্রোধে সরু হলো তাঁর চোখ, কণ্ঠ চিরে বের হলো অভিশাপ - 'তোমাদের সবার ওপর গজব পড়ুক! তোমরা যতদিন বেঁচে থাকবে, মাইয়ো কাউন্টি কোনোদিন আর অল-আয়ারল্যান্ডের শিরোপা না জিতুক!'
লোকমুখে চলে আসা গল্প এটা। আসলেই পুরোহিত এমন কিছু বলেছিলেন কি না, বললেও তাঁর মুখনিঃসৃত শব্দগুলো আসলে কী ছিল, তা এতদিন পর আর জানার উপায় নেই।
কিন্তু যা একেবারে চোখের সামনে দেখা সত্যি তা হলো, সে শিরোপা-যাত্রার ৭২ বছর কেটে গেছে। এরপর মাইয়ো কাউন্টি আরও ১১ বার ফাইনালে উঠেছে। কিন্তু ১৯৫১-র সে শিরোপার পর আর একবারও শিরোপাযাত্রার ভাগ্য হয়নি মাইয়ো কাউন্টির।
গল্পটা আরও ভালোভাবে জানার আগে মাইয়ো কাউন্টি আর গেইলিক ফুটবল সম্পর্কে একটু ধারণার সম্ভবত প্রয়োজন পড়বে। আয়ারল্যান্ডের আটলান্টিক পাড়ের চোখধাঁধানো সুন্দর কাউন্টি মাইয়ো। যদিও সেখানকার তরুণ-যুবকরা সেখানে থাকতে চান না। ভাগ্য আর আধুনিকতার সন্ধানে পাড়ি জমান অন্যদিকে। সে ধারা আজও চলছে। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে চরম দূর্ভিক্ষের মুখে পড়ে অঞ্চলটা, সে সময়েও অঞ্চলটা ছেড়ে অনেকে পাড়ি জমান অন্যদিকে। আজ মাইয়ো কাউন্টির জনসংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার, অথচ দূর্ভিক্ষের আগে - ১৮৪১ সালে জনসংখ্যা ছিল এখনকার তিনগুণ।
এই জনপদেরই একটা জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম গেইলিক ফুটবল। ঘাসের আয়তাকার পিচে দুই দল খেলবে, এক দলে ১৫ জন করে খেলোয়াড়। গোল আর পয়েন্ট - দুই ব্যবস্থাই আছে। দুই দিকে পোস্ট আর একটি বারসহ একটা গোলপোস্ট আছে এখানে, এর পাশাপাশি আবার দুই পাশের দুই পোস্ট বার ছাড়িয়ে আরও আড়াই মিটার পর্যন্ত যায়। কেউ বলে লাথি মেরে বারের নিচ দিয়ে পোস্টে ঢোকালে গোল (এ ক্ষেত্রে হাত দিয়ে পাঞ্চ করে বল ঢোকানোর নিয়ম নেই), আবার লাথি মেরে বা হাত দিয়ে পাঞ্চ করে বারের ওপর দিয়ে পোস্টে বল পাঠালেও পাওয়া যাবে পয়েন্ট। গোলের ক্ষেত্রে ৩ পয়েন্ট, পাঞ্চ করে পাঠালে ১ পয়েন্ট। বলতে পারেন, রাগবির 'জাত ভাই' একটা খেলা।
এই খেলা নিয়েই ওই অঞ্চলের মানুষের উত্তেজনার শেষ নেই। মাইয়ো কাউন্টির এক সময়ের খেলোয়াড় ও পরে এক সময়ে কোচিংও করানো জন ও'ম্যাহনি বিবিসিকে বলছিলেন, 'মাইয়ো কাউন্টিটা ধনী নয়। এখানকার মানুষ অনেক পরিশ্রমী, সৎ, ভালো। ইতিহাসের শুরু থেকেই গেইলিক ফুটবল এখানে বড় খেলা। এখানকার মানুষ কাউন্টির দলটাকে আপন ভাবে।'
কিন্তু সেই মাইয়ো কাউন্টির দলটা আর সেখানকার মানুষ সেই ১৯৫১ সাল থেকেই অনেক হৃদয় ভাঙার গল্পের কুশীলব। এগারো বার দলটা অল-আয়ারল্যান্ড ফাইনাল খেলতে ক্রোক পার্কে গেছে, ১১ বারই 'এবার বুঝি অভিশাপ কাটছে' ভেবে গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলেন কাউন্টির মানুষ। কিন্তু ১১ বারই কোনো না কোনোভাবে ভাগ্য তাদের খালি হাতে ফিরিয়েছে।
১৯৮৯ সাল। ও'ম্যাহনি তখন কাউন্টির কোচ। ১৯৫১ সালের পর সেবারই প্রথম ফাইনালে ওঠে মাইয়ো কাউন্টি। দ্বিতীয়ার্ধ চলছিল, মাইয়ো কাউন্টি তখনো কর্কের বিপক্ষে এগিয়ে আছে, ব্যবধান আরও বাড়ানোর অনেক সুযোগও পেয়ে চলেছে, কিন্তু কাজে লাগাতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত কর্কই ম্যাচে ফিরে এল, শিরোপা নিয়ে চলে গেল! ফলটা একেবারে অবিশ্বাস্য ছিল না, তবে নিজেদের হতাভাগা ভাবার যথেষ্ট কারণ ছিল মাইয়ো কাউন্টির।
অবিশ্বাস্য বলা যায় এর ৭ বছর পর, ১৯৯৬ ফাইনালকে। ম্যাচ শেষ হবে হবে, মিথ-এর বিপক্ষে এক পয়েন্টে এগিয়ে মাইয়ো। মিথের কোম কয়েল বলটা বাতাসে ভাসিয়ে দিলেন সামনে। বেশ কয়েকজন মাইয়ো খেলোয়াড় দেখলেন বলটা আসছে, ধরার মতোই ছিল বলটা, কিন্তু কেউই ধরতে পারলেন না। কীভাবে যেন বলটা বাউন্স করে বারের ওপর দিয়ে চলে গেল। এক পয়েন্ট! ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে রিপ্লে-তে নিয়ে যেতে ওই এক পয়েন্টই দরকার ছিল মিথ দলের। রিপ্লেতে মাইয়োর সেরা খেলোয়াড় লিয়াম ম্যাকহেইল, যিনি কিনা আগের ড্র ম্যাচটির ম্যান অব দ্য ম্যাচ ছিলেন, তিনি ম্যাচের শুরুর দিকেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে লাল কার্ড দেখলেন। ম্যাচটা মাইয়ো হেরে গেল, এক পয়েন্টের ব্যবধানে!
১৯৫১ সালের ওই অভিশাপের কারণেই কি এমন হচ্ছে? ধারণাটা ততদিনে ঘিরে ধরছে মাইয়োর সাধারণ মানুষকে। খেলোয়াড়দেরও কি? হয়তো! না হলে ২০১৬ ফাইনালে অমন হয় কীভাবে? ম্যাচে দুটি আত্মঘাতী গোল খায় মাইয়ো, গেইলিক ফুটবলে আত্মঘাতী গোল হওয়াই যেখানে বিরল ঘটনা। ওই দুই গোলে ডাবলিন ম্যাচে সমতা নিয়ে মাঠ ছাড়ল, রিপ্লেতে জিতেও গেল ডাবলিন! এর আগে-পরে আরও পাঁচ ফাইনালেও যে হারই ছিল মাইয়োর ললাটলিখন!
অভিশাপের অনুভূতি ততদিনে বিশ্বাস হয়ে মানুষের মনে গেঁথে গেছে। এরপর আরও তিনবার - ২০১৭, ২০২০ ও ২০২১ সালে ফাইনালে ওঠে মাইয়ো, তিনবারই হেরেছে।
মাইয়ো অঞ্চলের পত্রিকাগুলোর মধ্যে ওয়েস্টার্ন পিপল পত্রিকাটারই নামডাক বেশি। পত্রিকাটার ক্রীড়া সম্পাদক অ্যান্থনি হেনিগান মাইয়োর দলটাকে দেখেছেন ছোটবেলা থেকেই - প্রথমে দলের ভক্ত হিসেবে, পরে কাজের প্রয়োজনেও। বিবিসিতে হেনিগানের অভিজ্ঞতার বর্ণনা, 'ফাইনালে কীভাবে কীভাবে যেন আমরা সব সময় বাজে খেলি। মাইয়োর ক্ষেত্রে সব সময়ই এটা হয়ে আসছে! মাইয়ো আপনাকে এত দারুণ খেলা দেখাবে বাকি সময়ে, কিন্তু যখন বাজে খেলবে, ভীষণ বাজে খেলবে। '
যদিও এর পেছনে অভিশাপ-টভিশাপের কথাকে পাত্তা দেন না হেনিগান, 'অভিশাপের ব্যাপারটা পুরোপুরিই রহস্যে ঘেরা। কেন বলছি? কারণ, ওটার কথা হঠাৎ কীভাবে যেন সামনে চলে এসেছে! আমি যতটা জানি, ২০০০-এর দিকে কোনো একটা সময়ের আগে এমন কোনো অভিশাপের কথা কখনো শোনা যায়নি।'
হেনিগান জানালেন, তাঁর এক সহকর্মী মাইয়োর ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন। সে গবেষণার প্রয়োজনেই ওই ভদ্রলোক ফক্সফোর্ডে গিয়েছিলেন, যেখানে ১৯৫১ সালে ওই খোলা লরির বিজয়মিছিল শবযাত্রার সামনে পড়েছিল বলে গল্পে প্রচলিত। 'তিনি ফক্সফোর্ডের এমন অন্তত ২৫-৩০ জন মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যাঁরা সারা জীবন ফক্সফোর্ডেই কাটিয়েছেন। ওই মানুষদের কারও জন্ম ১৯২০-এর দশকে, কারও ১৯৩০-এ। ওই বইয়ের সব গবেষণায় তিনি যত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, কারও মুখেই অভিশাপ সম্পর্কিত কিছু শোনা যায়নি' - বিবিসিকে বলেন হেনিগান।
ওই অভিশাপ সত্যি কি মিথ্যা, তা নিয়ে সংশয় তাই থাকছেই। তবে অভিশাপটা সত্যি হলেও সেটির মেয়াদ ২০২১ সালেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। সে বছরে ফাইনালে টাইরনের কাছে মাইয়োর হারের দুই সপ্তাহ পর মারা যান প্যাডি প্রেন্ডেরগাস্ট। ৯৫ বছর বয়সে অন্যলোকে পাড়ি জমানো প্রেন্ডেরগাস্ট ছিলেন ১৯৫১ সালে বিজয়ী সেই দলের সর্বশেষ জীবিত সদস্য। অভিশাপের ভাষা অনুযায়ী, ওই দলের কেউ জীবিত থাকা অবস্থায় মাইয়োর আর ফাইনাল জেতার কথা ছিল না, মাইয়ো জেতেওনি। কিন্তু প্রেন্ডেরগাস্টের মৃত্যুতে ওই দলের কেউ তো আর থাকলেন না। তাহলে অভিশাপ কি আর কার্যকর থাকছে?
কিন্তু এখানে একটা তথ্যগত ফাঁক থেকে যাচ্ছে। প্রেন্ডেরগাস্ট সেদিন ফাইনালে খেলা দলের সর্বশেষ জীবিত সদস্য ছিলেন, কিন্তু সেদিন দলের ড্রেসিংরুমের সর্বশেষ জীবিত সদস্য তো তিনি নন। গন্ডিটা আরও ছড়িয়ে সেই ফাইনালের পরের খোলা লরির বিজয়মিছিলের সর্বশেষ জীবিত সদস্য তো কোনোভাবেই নন!
৭২ বছর আগের সেই ফাইনালে মাইয়োর দলে থাকলেও মাঠে না নামা খেলোয়াড় ড. মিক লফটাস কথা বলেছিলেন 'অ্যামেইজিং স্পোর্টস স্টোরিজ' নামের অনুষ্ঠানে। 'খুব বিশেষ একটা দিন ছিল। ৮০ হাজার মানুষের সামনে মাঠে নামতে আমি এত নার্ভাস ছিলাম!' - লফটাসের স্মৃতিচারণ। লফটাস সেদিন আর মাঠে নামেননি, বেঞ্চে বসেই দেখেছেন সতীর্থদের জয়যাত্রা। বিজয়মিছিলে তো গলা ফাটিয়েছেনই!
এ বছরের মাঝামাঝিতে ৯৩ বছর বয়সে অন্যলোকে পাড়ি জমান লফটাস। তবে মৃত্যুর আগে 'অ্যামেইজিং স্পোর্টস স্টোরিজে'র ওই অনুষ্ঠানে যখন কথা বলেছেন, লফটাসের সেদিনের স্মৃতিতে ধুলোর পরত জমেছে। শুধু এতটুকু মনে পড়ে তাঁর যে, সেদিন তাঁরা জয়ের পর দলের হোটেল 'ব্যারি'জ হোটেল'-এ ফিরেছিলেন, মিষ্টিতে মুখ ভরিয়েছিলেন। 'ফাইনালের পর আমরা অনেক আইসক্রিম খেয়েছিলাম' - বলছিলেন লফটাস।
তবে ওই ফাইনাল নিয়ে এবারই তো প্রথম বলছেন না লফটাস। বিবিসির উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবাদিক মার্ক সাইডবটম ৩০ বছর ধরে গেইলিক ফুটবল নিয়ে কাজ করছেন, লফটাসের সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন অনেকবার। সে ক্ষেত্রে ওই অভিশাপের কথা তো নিশ্চিতভাবেই কোনো সাক্ষাৎকারে উঠে আসার কথা। এ নিয়ে লফটাসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা সাইডবটম বিবিসিতে জানিয়েছেন এভাবে, 'তিনি ব্যাপারটাকে খেলো বানিয়ে রেখেছেন। তিনি বলতেন, 'এসব ফালতু কথা! আমার তো কোনো শবযাত্রার কথা মনে পড়ে না, শবযাত্রাকে উপেক্ষা করার তো প্রশ্নই আসে না! সে কারণে আমি ভেবেছিলাম, তাহলে এসব অভিশাপের কথা সিঁকেয় তোলা যায়।'
এরপর একটা 'কিন্তু' থাকল সাইডবটমের বর্ণনায়, '...কিন্তু এসব বলার পর তিনি (লফটাস) আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসলে ব্যাপারটা হলো কী, ওই সময়ে সবাই অনেক উত্তেজিত ছিল। এখন আমি কোনো শবযাত্রা দেখিনি, এর মানে যে কোনো শবযাত্রা ছিল না এমন তো নয়!''
লফটাসের কাছ থেকে তাই নিশ্চিত হওয়া গেল না সেদিন আসলেই ফক্সফোর্ডে শবযাত্রা আর বিজয়মিছিল একবিন্দুতে মিলে গিয়েছিল কি না। তবে আরলিন ক্র্যাম্পসির ধারণা তিনি এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিতে পারবেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের ভূগোলের লেকচারার ক্র্যাম্পসি, ২০০৮ সালে গেইলিক অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের ইতিহাস নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি, যে কাজের জন্য গেইলিক ফুটবল এবং এ সংক্রান্ত স্মৃতি সংগ্রহ করতে তিনি ছুটেছেন আয়ারল্যান্ডের এ মাথা-ও মাথা।
১৯৫১ সালে মাইয়োর বিজয়মিছিলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এমন ১৪০ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্র্যাম্পসি। এত মানুষের সঙ্গে আলাপের পর তাঁর অভিজ্ঞতা, 'যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা ওই অভিশাপ নিয়ে নির্দিষ্টভাবে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি, অভিশাপ নিয়ে কেউই কোনো কথা বলেননি। এ ব্যাপারটা আমার কাছে অন্যরকম লেগেছে। ওই বিজয়মিছিলে অনেক মানুষ ছিলেন। তাঁদের ওই স্মৃতি মনে আছে, কিন্তু কেউই কথিত সেই অভিশাপ নিয়ে নিজ থেকে কিছু বলেননি। '
ক্র্যাম্পসি তাই এ নিয়ে আরও গবেষণা চালান। জীবিতরা যদি কিছু না বলেন, মৃতদের ইতিহাস হয়তো বলবে - এই ভেবে। ফক্সফোর্ডের আশপাশে সে সময়ের মৃতদের রেকর্ড ঘেঁটেছেন তিনি। ১৯৫১ সালে মাইয়োর অল-আয়ারল্যান্ড ফাইনাল জয়ের ওই সপ্তাহে একটি মৃত্যুর রেকর্ড পেয়েছেন। কিন্তু সেই মৃতের সৎকার হয়েছে ওই সপ্তাহের বুধবারে, আর মাইয়োর উদযাপন মঙ্গলবারেই হয়ে গেছে বলে শোনা গেছে। সে কারণে ধরে নেওয়া যায় যে শবযাত্রা আর বিজয়মিছিল মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা সামান্যই।
কিন্তু সে সময়ের রেকর্ড তো আর একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এতদিন পর এসে পাওয়া সহজ নয়, সে সময়ের স্মৃতিও জীবিতদের কাছ থেকে একেবারে দিন-তারিখ মেনে মেলানো কঠিন। আর কোনো ঘটনা ঘটেছে এটা প্রমাণ করার চেয়ে একটা ঘটনা ঘটেনি প্রমাণ করা তো আরও কঠিন!
অভিশাপ তাই লোকগাঁথা হয়েই থাকছে।
অ্যামেইজিং স্পোর্টস স্টোরিজে সাক্ষাৎকারটা লফটাসের জীবনের সম্ভাব্য শেষ সাক্ষাৎকারই বলা চলে। গেইলিক ফুটবল দলের খেলোয়াড় লফটাস পরে রেফারি ছিলেন, প্রশাসক হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি তাঁর প্রিয় দলকে নিয়ে অবশ্য কখনো আশা হারাননি। সম্ভাব্য শেষ সেই সাক্ষাৎকারে যখন ২০২৩ সালে মাইয়োর শিরোপার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন হলো, লফটাস বলেছেন, 'আমি সত্যিই বিশ্বাস করি আমরা একদিন জিতব।'
তাঁর মৃত্যুর এক মাস পর মাইয়ো যখন অল-আয়ারল্যান্ডের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কেরিকে হারাল, অনেকে ভেবেছিলেন, লফটাসের বিশ্বাস বুঝি সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু এরপর নকআউট রাউন্ডে মাইয়োর সামনে পড়ে ডাবলিন, যারা ২০১৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত টানা ছয় শিরোপা জিতেছে। মাইয়ো ব্যবধানে হারল।
শিরোপাখরার বয়স গড়াল ৭২ বছরে। টিকে থাকল কয়েকটি প্রশ্ন, কিছু সংশয়। অভিশাপটা কি আসলেই সত্যি? সত্যি হলে সেটি শেষ হবে কবে? আদৌ হবে?