রম্য

মনে করি, নিউজিল্যান্ডের কাছে বাংলাদেশ হারেনি

চলুন একটা পাটিগণিত করা যাক। যেখানে শুরুতে একটা ‘মনে করি’ থাকবে। এরপর ‘মনে করি’র ধারা চলতেই থাকবে। শেষটায় কী থাকবে, তা-ও এখনি জানিয়ে দেওয়া যাক। এত সব মনে করি মিলিয়ে এক সময় দেখা যাবে, চেন্নাইয়ে আজ বিশ্বকাপে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে বাংলাদেশ যে ৮ উইকেটে হেরেছে – তা বাস্তবে সত্যি হলেও পাটিগণিতে নয়। সেখানে বাংলাদেশই জিতেছে। 
এবার আসুন, ‘মনে করি’র একটা তালিকা করি।

প্রথমত, মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামার পর যখন ইনিংস শুরু হলো, বিশ্ব ডিম দিবসকে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো ইচ্ছা লিটন দাসের ব্যাটে দেখা যায়নি। এখানে দুটি কল্পনা করে নিতে পারেন - পাঠকের স্বাধীনতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি! কল্পনা এক, জন্মদিনে ইনিংসের প্রথম বলেই নিজেকে বাউন্ডারি উপহার দেওয়ার ‘খায়েশে’ সফল লিটন। অথবা কল্পনা দুই, ট্রেন্ট বোল্টের বলটাতে দু পা এগিয়ে না গিয়ে জায়গায় থেকেই ফাইন লেগে আয়েশি গ্লান্সে রান পেলেন লিটন।

এবার মনে করি, লিটনের পাশাপাশি অন্য প্রান্তে তানজিদ তামিমও টিকে থাকলেন, বিশ্বকাপের আগের প্রস্তুতি ম্যাচের ফর্মটাকে বিশ্বকাপের বাইরেই রেখে আসেননি। ৪টা চারে ১৬ রান করে আউট না হয়ে ইনিংসটাকে তিনি বড় করলেন।

জন্মদিনে লিটন প্রথম বলেই আউট হয়ে গেছেন। ছবি: বিসিবি

তাতে যা হলো, লিটন দাসের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারের ম্যাচে মান বাঁচানোর ফিফটির বাইরেও কল্পনায় একটা ফিফটি-টিফটি হলো। বাংলাদেশ পেল উদ্বোধনী জুটিতে চরম প্রার্থিত কিছু রান। বাস্তবতা যতই বলুক, বিশ্বকাপের তিন ম্যাচে উদ্বোধনী জুটিতে বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৯, ১৪ ও ০ রান পেয়েছে, সেটিকে পাত্তা না দিয়ে ভেবে নিন, আজ বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিতে কিছু রান পেয়েছে!

রানের কল্পনা যখন এসেছেই, দৌড়টা শুধু উদ্বোধনী জুটিতে থামতে হবে – এমন দিব্যি কে দিয়েছে! মনে করি, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২৭ রানে ২ উইকেট, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারানো বাংলাদেশ আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৬ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেনি। অন্তত ১০০-১৫০টা রান করতে পেরেছে, এটা ধরে নেওয়া যাক।

এবার মনে করি, চেন্নাইয়ের ভ্যাপসা গরমে সাকিবের হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট লাগেনি। কিংবা লাগলেও তার আগে ধুঁকতে থাকা সাকিব হ্যামস্ট্রিংয়ে টান নিয়ে আর বেশিক্ষণ টিকতে পারবেন না ভেবে এলোমেলো শট খেলতে শুরু করেননি। কিংবা মনে করি, সাকিবের এলোমেলো শটগুলোতেও আরও কয়েকটি চার-ছক্কা এসেছে। লেখক এবং পাঠকের স্বাধীনতা বলে কথা!

মনে করি, মুশফিকুর রহিমও ৬৬ রানের ইনিংসের শেষটাতে ম্যাট হেনরির স্লোয়ার বাউন্সারে এভাবে কদর্যভাবে বোল্ড হননি। প্রি-মেডিটেটেড শট না খেলে তিনি বলটা দেখে উইকেট টিকিয়ে রেখেছেন। 
আসলে এত ভাগে ভাগে মনে না করে একবারেই মনে করে নেওয়া ভালো যে, বাংলাদেশ ব্যাটিংটা হয়েছে কিছুটা জাতে ওঠার মতো। চোখের দেখা বলেছে, নিউজিল্যান্ড ভালো বোলিং করলেও বাংলাদেশের উইকেটগুলো নিতে বোল্ট-হেনরিদের তেমন কসরত করতে হয়নি, কল্পনার তা বলতে হবে কেন! পাটিগণিতের প্রয়োজনে আমরা ধরে নেব, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং করেছেন, পরিস্থিতি মেনে খেলেছেন। অনেকটা কেইন উইলিয়ামসনের মতো।

বাংলাদেশের টপ অর্ডার ভেঙে পড়ছে দ্রুত। ছবি: বিসিবি

ড্যারিল মিচেলের মতো আগ্রাসন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে কল্পনায়ও ধরে নিতে কিছুটা কষ্ট হতে পারে। বল ব্যাটে লাগার মুহূর্তটা স্লো মোশনে দেখলে যাঁদের ব্যাটের দুলকি চাল চোখে পড়ে, সেই বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা কবজির জোরে ক্লিন হিট করবেন, এতটা পাটিগণিতেও মনে করা একটু দুঃসাধ্য মনে হচ্ছে। তাই আমরা মনে করি, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা উইলিয়ামসনের মতো করে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়ে ধাপে ধাপে ইনিংসের গিয়ার বদলেছেন। তাতে বাংলাদেশের রানটা ৪০-৫০ কম হওয়ার আফসোস থাকেনি ইনিংস শেষে।

এবার বোলিংয়ে মনে করি, মোস্তাফিজ আর শরীফুলের অসাধারণ প্রথম দশ ওভারে বাংলাদেশ উইকেট পেয়েছে একটির বেশি। কিংবা মনে করি, তাসকিন আহমেদ হঠাৎ বিশ্বকাপে গিয়ে ছন্দহীন হয়ে পড়েননি।

বাস্তবতাই বলবে, আজ বাংলাদেশের পেসাররা বেশ চেষ্টা করেছেন। চেন্নাইয়ের ৭৯ শতাংশ আর্দ্রতায় মোস্তাফিজদের টানা ৪-৫ ওভারের স্পেল করানোই তাঁদের প্রতি অবিচার মনে হচ্ছিল। সাকিবকে তাই বারেবারে তাঁদের বিশ্রাম দিয়ে দিয়ে বোলিংয়ের কথা ভাবতে হয়েছে। পিচটা পেসারদের প্রতিই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল কি না! বোলিং নিয়ে বাড়তি কিছু না চেয়ে তাই বরং আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ফিল্ডিংটা ভালো করেছে।

২৪৬ রানের লক্ষ্যে ফিল্ডিংটা অসাধারণ হতে হয়, কিন্তু আজ বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দুটি ক্যাচ হাতছাড়া করে এখন ‘কী হতে পারত, যদি’র আফসোসে পুড়ছে। তা-ও ক্যাচ দুটি কার? কনওয়ে আর উইলিয়ামসন! শেষ পর্যন্ত ৪৫ রান করা কনওয়ে সপ্তম ওভারেই ৪ রানে আউট হতে পারতেন, যদি মোস্তাফিজের বলে তাঁর ক্যাচটা নিতে পারতেন মিরাজ। নিউজিল্যান্ডের রান তখন ছিল ১৫/১। ১৯তম ওভারে সাকিবের বলে উইলিয়ামসনের ক্যাচটা আরেকটু সহজ ছিল, তাসকিন ধরতে পারেননি। উইলিয়ামসনের রান তখন ছিল ২৮, নিউজিল্যান্ড ৮৪/১।

মনে করি, ক্যাচ দুটি বাংলাদেশ ধরেছে। তাতে নিউজিল্যান্ড আরও বিপাকে পড়েছে। কনওয়ে ৪ রানেই আউট হওয়ায় ড্যারিল মিচেল এসেই ওভাবে মারমুখী হতে পারেননি, আর স্বভাবজাত মারমুখী ব্যাটিং করতে না পারায় আউটও হয়ে গেছেন দ্রুত। আর উইলিয়ামসন আউট হওয়ার পর বাংলাদেশ আরও আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে নিউজিল্যান্ডকে। মনে করতে তো আর বাধা নেই।

এত সব ‘মনে করি’গুলো মিলিয়ে নিন, দেখবেন ম্যাচে বাংলাদেশের হারের যে কারণগুলো – দুই ওপেনারের রানখরা, টপ অর্ডারের ব্যাটিং, ক্যাচ মিস... সেগুলো বেমালুম হাওয়া! তাতে হঠাৎ কল্পনায় দেখা যাবে, বাংলাদেশ আসলে এই ম্যাচ জিতেই গেছে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের দৌড়েও একটু এগিয়ে গেছে!

ক্রিকেটটা কেন যে পাটিগণিতের হিসাবে খেলা যায় না!