এই দেশের বেশির ভাগ মানুষই কাজ করে খাওয়া পাবলিক। হ্যাঁ, বলতেই পারেন যে, কাজ না করে কে খায়! কেউ কেউ যে খায়, সেটি আপনিও ভালো জানেন, আমিও ভালো জানি। তবে শতাংশে সেই জনগোষ্ঠীর পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। তাই বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন নিয়েই লেখা আগানো যাক।
এমন করে খাওয়া পাবলিকের জীবনে নানা উত্থান–পতন থাকে। সেটা আক্ষরিক অর্থেই থাকে। ভাবার্থে যেটা ভাবার আপনারা ভেবে নিতে পারেন। ভেবে নেওয়ার স্বাধীনতা তো সবারই থাকে। ওটিও আসলে মানুষের মৌলিক অধিকারের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। আসল কথা হলো, আমাদের মতো মানুষের জীবনে বিভিন্ন কিসিমের ঝামেলা থাকে। কেউ কিছু না করেও অফিসে ধরা খায়। কেউ আবার বেশি চালাকি করতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়। কারও ব্যবসায় গ্যাঞ্জাম হয়। কারও আবার ব্যক্তিজীবন চলে হোঁচট খেতে খেতে। এতই হোঁচট খাওয়া হয় যে, শেষে দেখা যায় সমান রাস্তাতেও দৈনিক অভ্যাসবশত ‘উষ্ঠা’ খাওয়া হয়।
এক কথায়, আমাদের মতো মানুষেরা বিভিন্ন ধরনের রাগ, ভুল, অক্ষমতা, ক্ষোভ, ঘৃণা বুকে চেপে চলতে থাকে। ফলে এক ধরনের প্রত্যাঘাত দেওয়ার ইচ্ছা ক্রমে প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সেই বিষয়টাই হয়তো একসময়ে একেবারে সংশ্লিষ্টতাহীন কারও ওপর আমরা ঝেড়ে দিই প্রবলভাবে। ধরুন, অফিসের বসের ওপর জমে থাকা রাগ ঝেড়ে দেওয়া হলো অধস্তন কারও ওপর। একেবারে শুধু শুধু ঝেড়ে দেওয়া হয় কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। ওই অধস্তন আবার তার নিচে কারও প্রতি ক্ষোভবর্ষণ উগড়ে দেয়। দুনিয়াটাই এমন। এতদিন শোনা গেছে, স্নেহ নিম্নমুখী। তবে ক্ষোভ ও রাগের কথা আর কেউ বলে না!
ফলে আমাদের চক্রাকার জীবনের একটি উপাদানের জন্য আরেকটি উপাদান বিগড়ে যায়। ঊর্ধ্বতনের কারণে বাড়িতে অশান্তি হয়। আবার বাড়ির বস ক্ষেপে গেলে তার প্রভাব অন্য কারও মাথায় ভেঙে পড়ে। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের মতো আমরা যদি জীবনে একটা জিম্বাবুয়ে পেতাম, তাহলে কিন্তু আর একজনের পেইন আরেকজনকে গেইন করতে হতো না। বরং ওই জিম্বাবুয়ের সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই করে আমরা মন হালকা করে ফেলতে পারতাম!
টি২০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এখন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল এ দেশে। গত শুক্রবারই একটা ম্যাচ হয়ে গেল। এর আগে দেশেই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সিরিজ হেরেছে। এর আগে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলাতেও খুব একটা সুবিধে করা যায়নি। অথচ জিম্বাবুয়ে আসতেই মেলায় হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস গান গাইতে গাইতে আপন আলয়ে ফিরে আসছে যেন!
ক্রিকেট দলের লিটন দাস বা তানজিদ তামিমের মতো তাই আমাদের জীবনেও এমন জিম্বাবুয়ে খুবই দরকার। ধরুন, আপনার ভুল করার শখ জাগল। আপনি সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ক্রিকেট ম্যাচটির মতোই ব্যাটার হয়ে লোপ্পা বলে ক্যাচ তুলে দিলেন। কিন্তু কোনো ভয় নেই। প্রতিপক্ষ যেভাবেই হোক সেই ক্যাচ ফেলে দেবেই। আপনাকে হাফ সেঞ্চুরিও করতে দেবে। একবার সুযোগ দিয়ে মন না ভরলে বার বার বাতাসে ভাসিয়ে দেবেন বল। সাথে দেবেন ‘পারলে আউট করে দেখা’ টাইপের হুংকার! দেখবেন, পারবে না। আরে সব বুঝেই তো জীবনে জিম্বাবুয়েকে টেনে আনবেন, তাই না? সেখানেও দ্রুত আউট হয়ে গেলে কীভাবে হবে! সূতরাং, খেলবেন ইচ্ছামাফিক, কিন্তু আউট হবে না, আউট হবে না, আউট হবে না।
আবার ধরুন, বোলার হয়ে উইকেট নেওয়ার শখ জাগল। কিন্তু বল কেবল অফ স্টাম্পের বাইরেই পড়ছে, স্টাম্পকে তাক করে বল করতে পারছেন না। কোনো দুশ্চিন্তা নেই। প্রয়োজনে লেগ স্টাম্পের বাইরে বল করবেন, সেটি টেনে স্টাম্পে এনে বোল্ড আউট হওয়ার দায়িত্ব তো জিম্বাবুয়ের! আপনি নিশ্চিন্তে খেলবেন।
এভাবেই যদি আমাদের জীবনে এমন একটা জিম্বাবুয়ে থাকে, তবে আর দেখবেন মন ঘোলা করে বাসায় ফিরতে হবে না একেবারেই। বরং একেবারে ফুরফুরে মনে ফেরা যাবে ঘরে। দিনের বা জীবনের যতো রাগ, ভুল, অক্ষমতা, ক্ষোভ, ঘৃণা বুকে জমা হবে, সব জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আমরা মিটিয়ে ফেলব। এরপর মাথা ঠান্ডা করে গুনগুন করে গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে জীবনের সব সুখের সঙ্গে হাত মেলানো যাবে।
তাহলে এবার একটু কষ্ট করে হলেও আপনার জীবনের জিম্বাবুয়েকে খুঁজে বের করে ফেলুন। খুঁজে বের করাটাই একটু শ্রমসাধ্য। এরপর দেখবেন, জীবন হয়ে গেছে পুরো জিঙ্গালালা!