সরকারি চাকরি: অবসর নিলেই সামান্য সঞ্চয় নিয়ে টানাটানি!

তীব্র যান ও জনজট। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। মাথার ওপরে রিমাল-পরবর্তী সূর্য বেশ আরাম করে তাপ ছড়াচ্ছে। যেন দুদিনের বিরতির পর জনজীবনে উত্তাপ ছড়ানোর পবিত্র দায়িত্ব পেয়ে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না। অতি আবেগে যা হয় আরকি। রোদের সাথে বোনাস হিসেবে বাড়তি পাওনা আর্দ্রতা, শরীরজুড়ে শাখাপ্রশাখার মতো নেমে আসা ঘাম। এর মধ্যে এসব জটটট! ভালো লাগে?

অগত্যা খোঁজ নিতেই হলো। জানা গেল–কী এক নতুন সমিতি নাকি অনশনে বসেছে। শুনে মনে হলো, তা বেশ। এই আকালে কিছু লোক যদি অনশন করে মন্দ কী। জিনিসপত্রের যা দাম! কিছু লোক অনশন করলে তো খাবার কম লাগবে। তার মানে চাহিদা কমা। বাজারে তো প্রভাব পড়বে, নাকি? অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী তো জিনিসপত্রের দাম কমার কথা। এতে বুকটা কেমন আশার জলে থইথই করে উঠল। কিন্তু সেই জলের ধাক্কায় বুকের কোনো এক কোণে ছলাৎ করে শব্দ হলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। বেরসিকের মতোই প্রশ্ন জাগল–আচ্ছা কতজন অনশনে বসেছে? সংখ্যাটা যদি আশানুরূপ না হয়, তবে তো কোনো লাভ নেই। উল্টো দেখা যাবে অনশনের কারণে ‘রাস্তায় চলাচলে বিঘ্ন’, ‘পণ্য পরিবহনে বাধা’, ‘পথেই পচনশীল পণ্য নষ্ট’ ইত্যাকার বিচিত্র সব কারণ হাজির করে হাফ সেঞ্চুরি করা সবজিগুলোও সেঞ্চুরি করে বসবে? কী মুশকিল!

সে যাই হোক, এই জটে তো আর বসে থাকা যায় না। খোঁজ নিতেই হলো। অনশনে বসেছে—অবসরবিরোধী সরকারি চাকরিজীবী সমিতি। অনশন কর্মসূচিতে লোক ক্রমশই নাকি বাড়ছে। বেশ রুই-কাতল গোছের কর্মকর্তারাও নাকি আছে; মানে ঊর্ধ্বতন আরকি। কয়েকজন নাকি বেশ ডেডিকেটেড; জনা বিশেকের মতো। এরাই মূলত অনশনটা করছে। বাকিরা জোগালির মতো এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। একটা বড় অংশ পরিস্থিতি বিচার করতে টিফিন, লাঞ্চ ব্রেকের মতো নিয়মতান্ত্রিক এবং ক্লান্তি, লাঞ্চ-প্রস্তুতি, লাঞ্চ-উত্তর, টিফিন ভাবনার মতো চর্চাতান্ত্রিক নানা ব্রেক নিয়ে অনশনস্থল রেকি করে যাচ্ছে। কেউ কেউ লাঞ্চ ব্রেকে ঘুরতে এসে কর্মসূচি কিংবা সেখানে বসে থাকা ঊর্ধ্বতনদের দেখে মুগ্ধ হয়ে নিজেরাই অনশনেই বসে যাচ্ছে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে আসা পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ নাকি আবেগ সামলাতে না পেরে সুশৃঙ্খলভাবে অনশনে বসে পড়েছেন। বিস্তর ক্যামেরাও নাকি হাজির। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ, স্টোরিজ, শর্টস, রিলস, ইমেজ, পোস্ট, টেলিভিশন লাইভ ইত্যাদি মিলিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড।

এই শুনে এক সময়ের সরকারি চাকরিপ্রেমী এবং অনাগত ভবিষ্যৎদের ‘অবশ্যম্ভাবী সরকারি নোকর’ বানানোর প্রতিশ্রুতিতে বন্দী এই তনুমন কি আর শান্ত থাকে। নেমে পড়তে হলো। একে টপকে, ওকে ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে কত কী যে চোখে পড়ল। রীতিমতো মেলা বসেছে। অনশন মঞ্চ তখনো বেশ দূরে। বড় ক্যামেরা নিয়ে জুতমতো জায়গায় দাঁড়ানোর সুযোগ খুঁজছেন পেশাদাররা। কিন্তু কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দাপটে ঠিক সুবিধা করতে পারছেন না তাঁরা। এক দল আবার কোথা থেকে ক্রেন নিয়ে এসেছে। ড্রোনের মালিকানাহীন টপ শট নিতে আগ্রহীদের জন্য সস্তায় ভাড়া দেওয়া হচ্ছে ক্রেন। তারা আবার টিকিট বিক্রি করছে। আগ্রহীরা সেখান থেকে টিকিট কিনে কিউ করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশেই আবার দোকান বসেছে। নানা খাবার ও পানীয় বিক্রি হচ্ছে দর্শনার্থীদের জন্য।

আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল খাবার ও পানীয় বিক্রির অভিজাত ব্যবস্থা। তাদের ধকই আলাদা। কারণ, তারা নাকি অনশনে বসা ঊর্ধ্বতনদের পুষ্টির বিষয়টি দেখছে। এর পাশ ঘেঁষেই দেখা মিলল মিনি হাসপাতালের। তারা এই গরমে হওয়া আয়োজনে আসা লোকেদের এবং অতি অবশ্যই অনশনে বসা ঊর্ধ্বতনদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে।

এই সব ডিঙিয়ে মূল মঞ্চের কাছে যেতেই রথি-মহারথিদের দেখা মিলল। পেছনে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ‘অবসরবিরোধী সরকারি চাকরিজীবী সমিতি’র ব্যানার। চারপাশের হুজ্জতের ছিটেফোঁটা সেখানে নেই। বেশ ভাবগম্ভীর একটা পরিস্থিতি। আশপাশের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল–চলমান অনাচারের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে এই অনশনকারীরা বলছেন, সরকারি চাকরি করার সময় কত অজস্র সংকট মোকাবিলা করতে হয়। অবসরের পর তার বিনিময়ে কী পাচ্ছেন তাঁরা? অতি কষ্টে অর্জিত সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান, তদন্ত। তাও একটি-দুটি নয়; লাগাতার। এসব কি সহ্য হয়? পরিস্থিতি বলছে, সামনেও একই ধারা বজায় থাকার তীব্র আশঙ্কা আছে। তাঁদের পরিষ্কার বক্তব্য–চাকরিজীবনে গড়া সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি চলবে না। ফলে অবসর বিষয়টিই সরকারি চাকরিজীবীদের খাতা থেকে তুলে দেওয়া হোক। এই হলো সোজাসাপটা দাবি।

দাবি বেশ যৌক্তিক নিঃসন্দেহে। সত্যিই তো কত না কষ্ট করে, মাথার ঘাম কই কই ফেলে তাঁরা সম্পদ গড়েছেন। নিজের নামে যতটা না, জীবনসঙ্গী ও পরিবারের নামে তারচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, দেশের কর্মসংস্থান সংকটের কথা ভেবে কত কত প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। কতজনের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। আর শেষে কিনা পুরস্কার হিসেবে মিলল, জ্বালা ধরানো তদন্ত! ফলে তাঁদের গোসা হয়েছে। আর ঊর্ধ্বতনদের গোসা তো যেনতেন নয়। তাঁরা আর ভাত খাবেন না। তবে এলিট খাবারের বিষয়টি আলাদা।

এদিকে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া তরুণদেরও জটলা দেখা গেল। তারা সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা বৃদ্ধির নিজস্ব আন্দোলন রেখে এখানে জমায়েত হয়েছে এটা বুঝতে যে, অনশন সফল হবে কিনা। হলে তারা নিজেদের দাবিকে কীভাবে নবায়ন করবে? এদের কারও কারও আবার চোখ চকচক করছে। আন্দোলনের ফাঁকে ঊর্ধ্বতনদের সাথে যদি একটু লবিং করে নেওয়া যায়।

আর এই সবকে মাঝখানে রেখে চারদিকে লেগে থাকা যান ও জনজট থেকে ছুটে আসছে দীর্ঘশ্বাস। তাদের কেউ কেউ অবশ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অকুস্থলে আসার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করতে করতে তারা ভুলে যাচ্ছে আসলে সে কে, কোথায় যাচ্ছিল, এখানে কীভাবে এল। কিন্তু ভোলামনও পকেটে থাকা মোবাইল বের করতে ভোলে না। ফলে তারা মোবাইল বের করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় চেক-ইন দিচ্ছে। তাদের ডিজিটাল ক্রিয়েটর সত্তা জেগে উঠছে এবং প্রচুর শর্টস-রিলস, লাইভ করে যাচ্ছে। মাঝখান থেকে ফুটেজ খেয়ে নিচ্ছে অবসরবিরোধী সরকারি চাকরিজীবী সমিতির আন্দোলন। বেশ একটা রমরমা ব্যাপার। বিষয়টির সাথে কীভাবে একাত্ম হওয়া যায়, সে ভাবনা যখন মাথায় ঘুরতে শুরু করেছে, তখনই সুতো গেল কেটে। ঘুম গেল ভেঙে। সারা শরীর তো বটেই বিছানার চাদরসহ ভিজে গেছে ঘামে। সিলিংয়ে তাকিয়ে কার্যকারণ পরিষ্কার হলো। লোডশেডিং। ফলে ফ্যান মহাশয় ঘোরা বন্ধ করে দিয়েছেন। রাগ হলো–এত সুন্দর একটা স্বপ্নের শেষটা এমন? স্বপ্নেও কি ঊর্ধ্বতনদের সাথে একাত্ম হওয়ার সুযোগ মিলবে না? কিন্তু ঠিকমতো সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হলো যে, কার ওপর রাগা যায়–নিজের কপাল, স্বপ্ন, ফ্যান, নাকি গরম?