আজ ‘মহান মে দিবস’। মে দিবস হলো শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের দিবস। শ্রমিকদের মজুরির হিস্সা নেওয়ার দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা করার দাবিতে এই দিবসের সূত্রপাত হয়। মে দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন।
দেশের অর্থনীতির মূল শক্তি শ্রমিক শ্রেণি। অথচ সেই শ্রমিকের রক্ত পানি করা শ্রমে সুবিধা নিচ্ছে মালিক গোষ্ঠী। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ধনী–গরিবের বৈষম্য। এই বৈষম্যের অন্যতম ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। এই শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিবস হলো ‘মে দিবস’।
বর্তমানে একজন গার্মেন্ট শ্রমিকের নিম্নতম বেসিক মজুরি ৮ হাজার ৩৯০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৪ হাজার ১৯৫ টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকাসহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে সাকুল্যে ১৫ হাজার ৩৫ টাকা। গত বছরের শেষের দিকে পোশাক শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করেছে। অর্থাৎ, প্রতি বছর ৯ শতাংশ হারে তাদের বেতন বাড়বে।
দু-দিন আগে মোবাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে একটি বার্তা আসে। বার্তায় লেখা ছিল, এবারের মহান মে দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শ্রমিক-মালিক এক হয়ে, গড়বো এদেশ নতুন করে’।
সংবাদ সূত্রে জানা যায়, ঈদের আগে ৭ দিন ধরেই টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করেন। শ্রম ভবনের সামনেই তারা সেহরি করেন, এরপর সন্ধ্যায় ইফতারও করেন। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত পুরো বেতন-বোনাস পাননি। শেষ পর্যন্ত পুরো বেতনের টাকা না দিয়ে মালিক পক্ষ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে বেঈমানি করে।
শ্রমিক বলতে নারী-পুরুষ উভয়ইকে বোঝালেও নারী শ্রমিকেরা আরও প্রান্তিক অবস্থানে আছে। আমাদের দেশে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ (তৃতীয় প্রান্তিক) থেকে জানা যায়, দেশের শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের মোট অংশগ্রহণ (১৩তম আইসিএলএস অনুয়ায়ী) ৫৭ দশমিক ৬৬। এর মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৭৯ দশমিক ৩৫ আর নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৬ দশমিক ৬১। আবার ১৯তম আইসিএলএস অনুয়ায়ী শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের মোট অংশগ্রহণ ৪৮ দশমিক ৭০। এর মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৭৮ দশমিক ৫৮ আর নারীর অংশগ্রহণের হার ১৯ দশমিক ৭। এই পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই ধারণা করা যায়, শ্রমশক্তিতে নারীদের অবস্থান কতটা পিছিয়ে রয়েছে।
বিলস–এর নির্বাহী পরিচালক বলেন, সকল কারখানায় নারীর কাঠামোগত অভিযোগের প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতাবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সকল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন বন্ধে যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতাবিরোধী অভিযোগ সেল ও নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করা হয়নি। এতে নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাই নারী শ্রমিকদের কাজের সুস্থ পরিবেশের জন্য অভিযোগ সেল গঠন জরুরি।
এটা যে কতটা জরুরি তা কয়েকটি উদাহরণে চোখ বোলালেই বোঝা যাবে।
উদাহরণ–১
নাজমা (ছদ্মনাম), কাজ করেন রামপুরার জিসাস ফ্যাশন লিমিটেড প্রতিষ্ঠানে। নাজমা যা বেতন পান, তার অর্ধেকের বেশি টাকা চলে যায় বাসাভাড়া দিতে।
উদাহরণ–২
জয়া (ছদ্মনাম) মালিবাগের এ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায়। তিনি বলেন, ‘কারখানার মালিকপক্ষ আমাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয় না। তাই এই সময়টাতে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। সন্তান হওয়ার পর আবার চাকরিতে ঢুকি। মাঝের মাসগুলোতে বেতন পাই না। খুব কষ্ট করে সংসার চালাইতে হয়। নতুন যে সন্তান পৃথিবীতে আসে, তাকে ঠিকমতো লালনপালন করতে পারি না। সকল কারখানায় মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে আমরা কোথায় যাব? কীভাবে সংসার চালাব?’
উদাহরণ–৩
নাছিমা (ছদ্মনাম) আশুলিয়ার জামগড়ার উইন্ডি গ্রুপে কাজ করেন। নাছিমার মতে, 'বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, কিন্তু বেতন বাড়ে না। অনেক সময় সংসার চালাতে ধার করে বা ওভারটাইম করতে হয়। কারখানায় নারী শ্রমিকদের জন্য সম্মানজনক পরিবেশ নেই। অসুস্থ হলেও ছুটি দেয় না। অনেকে বলে শ্রমিকরা দেশের চালিকাশক্তি, কিন্তু বাস্তবে আমরা অবহেলিত।'
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের মতে, 'বাংলাদেশে বেশির ভাগ নারী শ্রমিকের জন্য মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নেই। সরকারি ও ব্যক্তি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের স্থায়ী শ্রমিক ছাড়া কারও মাতৃত্বকালীন সবেতনে ছুটির ব্যবস্থা নেই। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস। শিল্পাঞ্চল এলাকায় নারীর মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার জন্য বাসস্থান, শিশুযত্ন দিবাকেন্দ্র চালু নেই। একটি দেশের নারীর মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার, মর্যাদার ওপর নির্ভর করে সে দেশের শ্রমজগত কোন অবস্থানে আছে? নারী মানে মনে করা হয় কম পারে, কম বোঝে। এই মনে করাটা ভাঙতে হবে। এ ধারণা ভাঙতে না পারলে সমাজ বা রাষ্ট্র কোনোটাই এগিয়ে যাবে না।'