ইউক্রেন যুদ্ধের ফল নির্ধারণ এখনো বহু দূর। এমনকি কোনো সম্ভাব্য ফলের ওপর বড় বাজি ধরতেও এখন কেউ রাজি হবে না। এদিকে গোটা বিশ্বই এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে পারমাণবিক লড়াইয়ের শঙ্কাও। এ অবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবশালী কৌশলিদের মধ্যে রাশিয়াকে ভাঙার ধারণা বেশ জোরালো হচ্ছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যম ও তাদের কৌশলবিদদের দৃষ্টিতে এ যুদ্ধে রাশিয়া ঠিক পেরে উঠছে না। যুদ্ধের ময়দান সামলাতে ক্রেমলিনের ত্রাহি দশা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় রাশিয়া যেকোনো সময় পারমাণবিক অস্ত্রও ব্যবহার করে ফেলতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। অবশ্য এই শঙ্কা এমনি এমনি ছড়ায়নি। রুশ কূটনীতিকদের কেউ কেউ এ নিয়ে বিভিন্ন সময় আকারে-ইঙ্গিতে হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। ফলে শঙ্কাটির একেবারে অমূলক, তা বলা যাবে না। আরা তাই পশ্চিমারা এর দাওয়াই খুঁজছেন স্বাভাবিকভাবেই। কী সেই দাওয়াই? উত্তর সোজা-রাশিয়াকে ভাঙো।
এ ক্ষেত্রে দারুণ একটি চালু শব্দ হাজির করছেন পশ্চিমা কৌশলবিদেরা। আর তা হলো-বিউপনিবেশায়ন; ইংরেজিতে ডিকলোনাইজেশন। বলার অপেক্ষা রাখে না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে এ শব্দের বহুল ব্যবহার এখনো পশ্চিমা উপনিবেশবাদী ধারণার বিপরীতেই চালু আছে। গত কয়েক দশকে হালে পানি পেয়ে এর বেশ একটা আবেদনও তৈরি হয়েছে। এই শব্দের তিরই এখন তারা ফিরিয়ে দিতে চাইছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা সরাসরি এখন বলছেন, বিশ্বকে আশু হুমকি থেকে বাঁচাতে রাশিয়ার বি-উপনিবেশায়ন করা জরুরি।
এর অর্থ হচ্ছে রাশিয়া ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলোকে রাশিয়া থেকে পৃথক করে দেওয়া। বর্তমানে রাশিয়া ফেডারেশনে যুক্ত আছে ৮৩টি ফেডারেল অঞ্চল। এগুলোকেই এখন পাখির চোখ করতে চাইছে পশ্চিমারা।
এটি কোনো ধারণা থেকে বলা কথা নয়। মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির ব্রাসেলসভিত্তিক কলাম লেখক অঞ্চল বোরা-এর ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদস্যদের নিয়ে গঠিত কমিশন অন সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, রাশিয়ার বি-উপনিবেশায়নই হওয়া উচিত (পশ্চিমের) নৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য।
শুধু এখানেই তারা থেমে নেই। রাশিয়া থেকে বিহষ্কৃত বা নির্বাসিত রাজনীতিক, সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত সংগঠন দ্য ফ্রি ন্যাশনস অব পোস্ট-রাশিয়া ফোরাম চলতি বছরের শুরুতে ব্রাসেলসে একটি বৈঠক করে। সেখানে আলোচনার পর আমেরিকায় তারা আরও তিনটি বৈঠকের দিন-তারিখও ঘোষণা করে। এই ফোরাম এরই মধ্যে রাশিয়াকে ভেঙে ৪১টি দেশ গঠনের কথা বলেছে। ভেঙে যাওয়া রাশিয়া দেখতে কেমন হবে, তার একটি মানচিত্রও তারা প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিল।
গত জানুয়ারির শেষে হওয়া এই বৈঠকে রাশিয়া ভেঙে যেসব দেশ গড়ার পরিকল্পনা হচ্ছে, তারও প্রতিনিধিত্ব করেন ফোরামটির সদস্যরা। সেখানে এমন কিছু সম্ভাব্য দেশের নাম উঠে আসে, যা সম্পর্কে কারও ধারণাও নেই। নামগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবেরিয়া, চেরকেসিয়া, ইচকেরিয়া (চেচনিয়া), লাপলানডিয়া রিপাবলিক, নোগাই রিপাবলিক ইত্যাদি।
একই রকমের খবর পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমা চোখে রাশিয়ার উদারবাদী ওয়েবসাইট মেডুজা থেকেও। সেখানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সবাই গণহত্যা নিয়ে কথা বলছে। প্রতিটি পক্ষই এই নিপীড়ন থেকে মুক্তির একটি পথই দেখতে পাচ্ছে। আর তা হলো ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে মুক্তির। এর অর্থ হলো রাশিয়া নামে এখনো পরিচিত অঞ্চলটিকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে স্বাধীন করা।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে অর্থনৈতিক সংকটের আবর্তে পড়া পশ্চিমা সমাজ হন্যে হয়ে বাঁচার উপায় খুঁজছে। তাদের সংবাদমাধ্যম অবশ্য এর সাক্ষ্য দেয় না। তবে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলা বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এ অবস্থায় রাশিয়াকে ভেঙে দিয়ে একগুচ্ছ নয়া রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার ধারণা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বিশেষত পশ্চিমের রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকদের মধ্যে এটি বেশ জোরালো হয়েছে। তাঁরা বলছেন, রাশিয়া ভাঙবেই। এ জন্য পশ্চিমকে প্রস্তুত হতে হবে।
শুধু রাশিয়ার ভাঙনের জন্যই নয়, ভেঙে জন্ম নেওয়া দেশগুলোকে নিজের বলয়ে টানার জন্যও তাকে কৌশলী হতে হবে। বিশেষত যেসব অঞ্চল সম্পদশালী হবে, তাদের নিজের দিকে টানার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এ জন্য দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনাও তার করে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা গোটা পশ্চিমকে পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন। কী সেই ভুল? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার সময়, অল্পে তুষ্ট হওয়া পশ্চিমাদের উচিত ছিল সে সময় রাশিয়াকে আরও খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়ে নিজেদের প্রভাব ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা।
এই পরামর্শের দিকে তাকালেই পশ্চিমে পড়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবটি বোঝা যাবে। পরামর্শকেরা রাশিয়া ভেঙে জন্ম নেওয়া সম্ভাব্য সম্পদশালী দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এটিই বলে দিচ্ছে যে, এ যুদ্ধ পশ্চিমকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ভেতর থেকে ফোঁপরা করে দিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও সঙিন হবে, সন্দেহ নেই। এই পরামর্শ দেওয়ার সময় এমনকি তারা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের বাস্তবতাকেও ভুলছেন না। অবশ্য ভুলে যাওয়ার কথাও নয়। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী এমন কোনো গৃহযুদ্ধ হলে অস্ত্রের বাণিজ্যটিও ফুলেফেঁপে উঠবে পশ্চিমাদের।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
কিন্তু সত্যিই কি রাশিয়ার ভাঙন গোটা বিশ্বের শান্তির জন্য ভালো কিছু হবে? এ প্রশ্ন রাখছেন অনেকেই। তাঁদের মতে, এমনটি হলে রাশিয়া আরও একগুঁয়ে হয়ে উঠতে পারে। আঞ্চলিক সংঘাত তখন নৈমিত্তিক হয়ে উঠবে। মনে রাখা জরুরি যে, ভূমি, জনবল, অর্থনীতি ইত্যাদিতে পশ্চিমাদের থেকে রাশিয়া তখন পিছিয়ে থাকলেও তাদের হাতে তখনো থাকবে প্রায় ছয় হাজার নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড। ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার বোধ এলে আহত সিংহের মতো যেকোনো কিছুই করতে সে তখন আর তোয়াক্কা করবে না। এমনকি সতর্ক সংকেত হিসেবে একটি হুমকি দেওয়ার প্রয়োজনও সে বোধ না করতে পারে। অথচ পশ্চিমা পরামর্শকেরা এই দাওয়াই তো দিচ্ছেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার থেকে রাশিয়াকে বিরত করার নামেই, যার জন্য এমনকি তারা একটি বিস্তৃত অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মতো বাস্তবতার জন্ম দিতেও রাজি।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যে ১৪টি দেশ নিজেদের সার্বভৌম বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের সক্ষমতা তেমন না থাকলেও আমেরিকাসহ গোটা ইউরোপের সহায়তা তাদের আবারও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ফলে রুশ ফেডারেশন ভাঙার পশ্চিমা ছকের সত্যিকার প্রয়োগে শুধু রাশিয়া নয় আঞ্চলিক যুদ্ধ এর সীমানা ধরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। চীনের সাথে থাকা দীর্ঘ সীমান্তও এমন সমীকরণে বড় প্রভাবক হয়ে উঠবে। এ ধরনের যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় হিসেবে রাশিয়া স্বাভাবিকভাবেই চাইবে চীনকে জড়িয়ে নিতে। ফলে এ ধরনের কোনো ছকই আদতে একটি সীমান্তে আটকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। পশ্চিমা যেসব পরামর্শক রাশিয়া ভাঙার দাওয়াই দিচ্ছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন নিউ স্টার্টসহ অন্য চুক্তিগুলো হওয়ার কার্যকারণের বিষয়টি। না হলে পারমাণবিক যুদ্ধ রোধের অজুহাতে তারা এমন প্রকল্পের পেছনে দাঁড়াতেন না, যা উল্টো পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াইকেই আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলবে।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন