দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলোর অন্যতম লক্ষ্য ছিল, ইউরোপে আর কোনো যুদ্ধ নয়। স্নায়ুযুদ্ধের জমানা পেরিয়ে এখন পর্যন্ত মোটাদাগে এই লক্ষ্য অনুযায়ী চলতে পেরেছে অঞ্চলটি। তবে এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। ইউক্রেন যুদ্ধই এই নয়া-পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যা ইউরোপের নতুন সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডের আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে।
জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশ রেখে ইউরোপের নতুন সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডের আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনার কথা শুনে অনেকের ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে। কিন্তু সত্যিই বিষয়টি এমন। কেন? তা বরং ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের দেশগুলোর অবস্থান ক্রমেই প্রকাশ্য হয়ে উঠছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলো থেকে ন্যাটো জোটের আওতায় ইউক্রেনে সামরিক সরবরাহ গেলেও সম্ভাব্য মীমাংসা হিসেবে সুস্পষ্ট দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এক পক্ষ চাইছে ইউক্রেন রাশিয়ার কাছে নতি স্বীকার করে যুদ্ধের সমাধান করুক। আরেক পক্ষ চাইছে রাশিয়া পরাহত হোক। প্রথম পক্ষে রয়েছে জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশগুলো, যারা নানাভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। আর দ্বিতীয় পক্ষে রয়েছে ব্রিটেন ও পোল্যান্ড।
পোল্যান্ডের এই অবস্থানের সাথে যুক্ত হয়েছে তার অর্থনৈতিক শক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পোল্যান্ডের সামরিকীকরণের বিষয়টি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানাচ্ছে, ১৯৯০-এর পর টানা তিন দশক ধরে দেশটি অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে। আয় বৈষম্য নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২০০ ইউরোতে। যুক্তরাজ্যে যা ৩৫ হাজার ইউরো। বাকি ইউরোপের তুলনায় পোল্যান্ডে জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেক কম। সব মিলিয়ে পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক গতিপথ যা, তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাবে দেশটি।
জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশ রেখে ইউরোপের নতুন সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডের আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনার কথা শুনে অনেকের ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে। কিন্তু সত্যিই বিষয়টি এমন। কেন? তা বরং ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের দেশগুলোর অবস্থান ক্রমেই প্রকাশ্য হয়ে উঠছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলো থেকে ন্যাটো জোটের আওতায় ইউক্রেনে সামরিক সরবরাহ গেলেও সম্ভাব্য মীমাংসা হিসেবে সুস্পষ্ট দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এক পক্ষ চাইছে ইউক্রেন রাশিয়ার কাছে নতি স্বীকার করে যুদ্ধের সমাধান করুক। আরেক পক্ষ চাইছে রাশিয়া পরাহত হোক। প্রথম পক্ষে রয়েছে জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশগুলো, যারা নানাভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। আর দ্বিতীয় পক্ষে রয়েছে ব্রিটেন ও পোল্যান্ড।
পোল্যান্ডের এই অবস্থানের সাথে যুক্ত হয়েছে তার অর্থনৈতিক শক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পোল্যান্ডের সামরিকীকরণের বিষয়টি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানাচ্ছে, ১৯৯০-এর পর টানা তিন দশক ধরে দেশটি অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে। আয় বৈষম্য নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২০০ ইউরোতে। যুক্তরাজ্যে যা ৩৫ হাজার ইউরো। বাকি ইউরোপের তুলনায় পোল্যান্ডে জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেক কম। সব মিলিয়ে পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক গতিপথ যা, তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাবে দেশটি।
গড় কর্মঘণ্টার হিসাবে দেশটি এমনকি পরিশ্রমী আমেরিকানদেরও পেছনে ফেলেছে। জন্মহার নিয়ে যে জটিলতা ছিল, তাও অনেকটা কেটেছে। আর তা ইউক্রেন যুদ্ধের বদৌলতেই। ইউরোপের সবচেয়ে কম জন্মহারের দেশগুলোর একটি পোল্যান্ড। ফলে জনমিতিক একটি সংকট তাদের ছিল। আবার তারা অভিবাসী নিতেও তেমন আগ্রহী নয়। ফলে ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব হয়তো তাদের অর্থনৈতিক জয়রথকে থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এখানেই নিদান হয়ে এসেছে ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রতিবেশী ইউক্রেনের ১ কোটি ১৫ লাখ লোক দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের কারও কারও সেখানে আত্মীয়-পরিজন আছে। ফলে তারা শরণার্থী শিবিরের বদলে দেশটির মানুষের সাথে সহজেই মিশতে পারছে, অংশ নিতে পারছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ইউক্রেন থেকে আসা কৃষিপণ্য নিয়ে স্বার্থের সংঘাতটি ঠিকমতো সামাল দিতে পারলেই পোল্যান্ড নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারবে। কারণ, ব্যাটারিসহ প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ধারা বলে দিচ্ছে, দেশটি আগামী দিনের অর্থনীতির কথা মাথায় রেখেই যাবতীয় পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তিকে সামরিক শক্তিতে রূপান্তরে বিনিয়োগ করছে পোল্যান্ড।
পোল্যান্ড এই পথে কেন হাঁটছে?
এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, সাবেক সোভিয়েত জমানা এবং সেই সূত্রে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট ব্লকে থাকা দেশ হিসেবে পোল্যান্ডের আছে ঝঞ্ঝামুখর ইতিহাস। কমিউনিস্ট জমানায় দেশটির মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে ভয়াবহ দারিদ্র্য। সাথে স্নায়ুযুদ্ধকালে দুই বড় শক্তির মাঝখানে পড়ে শ্বাসরুদ্ধকর একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে দেশটি। ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে তারা সব অর্থেই শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায়। আর এই রূপান্তরে তারা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখছে রাশিয়াকে। নিজেদের দরজায় রুশ নেকড়ের আনাগোনা থামাতে তাই তারা সামরিকীকরণের দিকেই হাঁটছে।
রাশিয়াকে প্রতিহত করার এই মনোভাবের কারণে পোল্যান্ড এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোকে মিত্র হিসেবে পাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেভাবে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরোনো মানচিত্র পুরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে সবাই কম-বেশি শঙ্কায় আছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য পোল্যান্ডের এই শঙ্কাটাই প্রয়োজন ছিল। কারণ, শঙ্কা থাকলেই না আশ্রয়ের মূল্য বাড়ে।
তার মানে পোল্যান্ডের এই যে সুপারপাওয়ার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা, এর পেছনেও কোনো না কোনোভাবে মস্কো জড়িয়ে আছে। ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার প্রভাব বলয়কে জার্মান সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান। এমনকি সেখানেও তিনি থামতে রাজি নন। তিনি চান, জার্মানিও জ্বালানি থেকে শুরু করে নানাভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকুক। ইউক্রেন যুদ্ধে জয় পেলে নিশ্চিতভাবে এই পূর্ব ইউরোপকে রাশিয়ার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করার কাজটি অনেকটা হয়ে যাবে। এই শক্তি সমীকরণ সবাই বুঝতে পারছে।
বুঝতে পারছে বলেই আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট চাইছে, যেকোনো মূল্যে রাশিয়াকে থামাতে। এই প্রক্রিয়া কিন্তু অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে। ১৯৯০-এর পটপরিবর্তনের পর থেকে এই সমীকরণে মাঠে খেলা অনেকটাই গড়িয়েছে। ইউরেশিয়া অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ে ২০০৯ সালে আমেরিকার ডিকিনসন কলেজের অধ্যাপক জর্জ ফ্রিডম্যান ‘দ্য নেক্সট হান্ড্রেড ইয়ারস’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ইউরোপের পরবর্তী সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডের আবির্ভাবের সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ তোলেন। কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে ফ্রিডম্যানের সোজা উত্তর, ইসরায়েলের মতো করে।
এখানেই উত্তরটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। সোজা বাংলায়, পূর্ব ইউরোপে পরবর্তী সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডকে দেখতে চায় আমেরিকা। আর সে কারণেই মার্কিন তেল-নুনে তা হয়ে উঠতে যাচ্ছে পোল্যান্ড। এ বিষয়ে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম দ্য আর্টিকেলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকা ইউক্রেন, পোল্যান্ড, বাল্টিক রাষ্ট্র ও পূর্ব ইউরোপীয় অন্য রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে পোলিশ ব্লক গড়ে তুলতে চায়। আর এটি সম্ভব হলে ১৭ শতকের পোলিশ-লিথুয়ানিয়া ব্লকের শক্তিমত্তা আবারও দেখবে বিশ্ব। আমেরিকার সামনে অন্য কোনো পথও নেই। তারা ইউক্রেন যুদ্ধকে যতটা না রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ হিসেবে, তার চেয়ে বেশি চীনের সাথে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে। ২০১৭ সাল থেকেই আমেরিকা তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনকে বিবেচনা করে আসছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি ঘাঁটলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে।
চীনের সাথে আসন্ন এই যুদ্ধে চীনের পক্ষে থাকবে রাশিয়া। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আগে থেকেই এই শক্তিকে পরাভূত করতে চায় ওয়াশিংটন। এ ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় দুই অস্ত্র হতে পারত জার্মানি ও ফ্রান্স। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টাটকা স্মৃতি নিয়ে থাকা এই দুই দেশ রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ নয় বরং ব্যবসা জারি রাখতে বেশি আগ্রহী। সুতরাং আমেরিকার হাতে ন্যাটো জোটে থাকা আর দুটি বিকল্প আছে। প্রথমটি ব্রিটেন, দ্বিতীয়টি পোল্যান্ড। এর সাথে নতুন যুক্ত হওয়া সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের কথাও বলা যায়। বাকি সবাই কোনো না কোনোভাবে রুশ অর্থনীতির সাথে ভীষণভাবে জড়িয়ে।
এই ব্লকের আকার বাস্তবে রূপ পাওয়ার কিছু প্রমাণও সামনে আছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল রাশিয়া। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগের কিয়েভের দিকে তাকালেই এই নতুন শক্তি সমীকরণের দেখা মিলবে। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি কিয়েভে ব্রিটেন, পোল্যান্ড ও ইউক্রেন নিরাপত্তা চুক্তি করেছিল। তারপর তো যুদ্ধ শুরু হলো। তারপর কী? তারপর ন্যাটোর সভা হলো। সেখানে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেনা সংখ্যা বাড়িয়ে ৩ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হলো। আর সাথে পোল্যান্ডে স্থায়ীভাবে মার্কিন সেনা দপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পোল্যান্ড ৫ বছরের মধ্যে নিজেদের সেনা সংখ্যা ৩ লাখে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেমনটি হলে পোল্যান্ডেই থাকবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।
পোল্যান্ডের উত্থানে চাপে ফ্রান্স-জার্মানি?
দ্য টেলিগ্রাফের দেওয়া তথ্যমতে, সামরিক খাতে পোল্যান্ড হাত খুলে খরচ করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে সফল প্রমাণিত হওয়া মার্কিন হিমারস আর্টিলারি সিস্টেম কিনতেই তারা ব্যয় করছে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানেই থেমে নেই। তারা এফ-৩৫ জেট ও ১১৬ আব্রামস ট্যাংক কিনছে। এর অর্থ হলো তারা সাবেক সোভিয়েত জমানার মিগ সিরিজের যুদ্ধবিমানকে বিদায় জানাচ্ছে। গেল বছরের তুলনায় সামরিক খাতে তারা ব্যয় বাড়িয়েছে। গত বছরও সামরিক খাতে দেশটির ব্যয় ছিল জিডিপির আড়াই শতাংশ। এ বছর তা বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। জিডিপির বিপরীতে সামরিক খাতে তারা ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশ হতে যাচ্ছে। এমনকি ব্রিটেনও ২০৩০ সাল নাগাদ সামরিক বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির আড়াই শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।
এর অর্থ হলো স্থলযুদ্ধে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠতে যাচ্ছে পোল্যান্ড। পাঁচ বছরের মধ্যে তিন লাখ সেনা দিয়ে সামরিক বাহিনী গড়ে তুললে এমনকি ফ্রান্সও এ ক্ষেত্রে তার সামনে খর্বশক্তির হয়ে যাবে। ফ্রান্সে আছে বর্তমানে ২ লাখ সেনা।
রাশিয়াকে প্রতিহত করার এই মনোভাবের কারণে পোল্যান্ড এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোকে মিত্র হিসেবে পাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেভাবে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরোনো মানচিত্র পুরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে সবাই কম-বেশি শঙ্কায় আছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য পোল্যান্ডের এই শঙ্কাটাই প্রয়োজন ছিল। কারণ, শঙ্কা থাকলেই না আশ্রয়ের মূল্য বাড়ে।
তার মানে পোল্যান্ডের এই যে সুপারপাওয়ার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা, এর পেছনেও কোনো না কোনোভাবে মস্কো জড়িয়ে আছে। ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার প্রভাব বলয়কে জার্মান সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান। এমনকি সেখানেও তিনি থামতে রাজি নন। তিনি চান, জার্মানিও জ্বালানি থেকে শুরু করে নানাভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকুক। ইউক্রেন যুদ্ধে জয় পেলে নিশ্চিতভাবে এই পূর্ব ইউরোপকে রাশিয়ার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করার কাজটি অনেকটা হয়ে যাবে। এই শক্তি সমীকরণ সবাই বুঝতে পারছে।
বুঝতে পারছে বলেই আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট চাইছে, যেকোনো মূল্যে রাশিয়াকে থামাতে। এই প্রক্রিয়া কিন্তু অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে। ১৯৯০-এর পটপরিবর্তনের পর থেকে এই সমীকরণে মাঠে খেলা অনেকটাই গড়িয়েছে। ইউরেশিয়া অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ে ২০০৯ সালে আমেরিকার ডিকিনসন কলেজের অধ্যাপক জর্জ ফ্রিডম্যান ‘দ্য নেক্সট হান্ড্রেড ইয়ারস’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ইউরোপের পরবর্তী সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডের আবির্ভাবের সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ তোলেন। কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে ফ্রিডম্যানের সোজা উত্তর, ইসরায়েলের মতো করে।
এখানেই উত্তরটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। সোজা বাংলায়, পূর্ব ইউরোপে পরবর্তী সুপারপাওয়ার হিসেবে পোল্যান্ডকে দেখতে চায় আমেরিকা। আর সে কারণেই মার্কিন তেল-নুনে তা হয়ে উঠতে যাচ্ছে পোল্যান্ড। এ বিষয়ে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম দ্য আর্টিকেলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকা ইউক্রেন, পোল্যান্ড, বাল্টিক রাষ্ট্র ও পূর্ব ইউরোপীয় অন্য রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে পোলিশ ব্লক গড়ে তুলতে চায়। আর এটি সম্ভব হলে ১৭ শতকের পোলিশ-লিথুয়ানিয়া ব্লকের শক্তিমত্তা আবারও দেখবে বিশ্ব। আমেরিকার সামনে অন্য কোনো পথও নেই। তারা ইউক্রেন যুদ্ধকে যতটা না রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ হিসেবে, তার চেয়ে বেশি চীনের সাথে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে। ২০১৭ সাল থেকেই আমেরিকা তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনকে বিবেচনা করে আসছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি ঘাঁটলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে।
চীনের সাথে আসন্ন এই যুদ্ধে চীনের পক্ষে থাকবে রাশিয়া। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আগে থেকেই এই শক্তিকে পরাভূত করতে চায় ওয়াশিংটন। এ ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় দুই অস্ত্র হতে পারত জার্মানি ও ফ্রান্স। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টাটকা স্মৃতি নিয়ে থাকা এই দুই দেশ রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ নয় বরং ব্যবসা জারি রাখতে বেশি আগ্রহী। সুতরাং আমেরিকার হাতে ন্যাটো জোটে থাকা আর দুটি বিকল্প আছে। প্রথমটি ব্রিটেন, দ্বিতীয়টি পোল্যান্ড। এর সাথে নতুন যুক্ত হওয়া সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের কথাও বলা যায়। বাকি সবাই কোনো না কোনোভাবে রুশ অর্থনীতির সাথে ভীষণভাবে জড়িয়ে।
এই ব্লকের আকার বাস্তবে রূপ পাওয়ার কিছু প্রমাণও সামনে আছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল রাশিয়া। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগের কিয়েভের দিকে তাকালেই এই নতুন শক্তি সমীকরণের দেখা মিলবে। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি কিয়েভে ব্রিটেন, পোল্যান্ড ও ইউক্রেন নিরাপত্তা চুক্তি করেছিল। তারপর তো যুদ্ধ শুরু হলো। তারপর কী? তারপর ন্যাটোর সভা হলো। সেখানে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেনা সংখ্যা বাড়িয়ে ৩ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হলো। আর সাথে পোল্যান্ডে স্থায়ীভাবে মার্কিন সেনা দপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পোল্যান্ড ৫ বছরের মধ্যে নিজেদের সেনা সংখ্যা ৩ লাখে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেমনটি হলে পোল্যান্ডেই থাকবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।
পোল্যান্ডের উত্থানে চাপে ফ্রান্স-জার্মানি?
দ্য টেলিগ্রাফের দেওয়া তথ্যমতে, সামরিক খাতে পোল্যান্ড হাত খুলে খরচ করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে সফল প্রমাণিত হওয়া মার্কিন হিমারস আর্টিলারি সিস্টেম কিনতেই তারা ব্যয় করছে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানেই থেমে নেই। তারা এফ-৩৫ জেট ও ১১৬ আব্রামস ট্যাংক কিনছে। এর অর্থ হলো তারা সাবেক সোভিয়েত জমানার মিগ সিরিজের যুদ্ধবিমানকে বিদায় জানাচ্ছে। গেল বছরের তুলনায় সামরিক খাতে তারা ব্যয় বাড়িয়েছে। গত বছরও সামরিক খাতে দেশটির ব্যয় ছিল জিডিপির আড়াই শতাংশ। এ বছর তা বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। জিডিপির বিপরীতে সামরিক খাতে তারা ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশ হতে যাচ্ছে। এমনকি ব্রিটেনও ২০৩০ সাল নাগাদ সামরিক বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির আড়াই শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।
এর অর্থ হলো স্থলযুদ্ধে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠতে যাচ্ছে পোল্যান্ড। পাঁচ বছরের মধ্যে তিন লাখ সেনা দিয়ে সামরিক বাহিনী গড়ে তুললে এমনকি ফ্রান্সও এ ক্ষেত্রে তার সামনে খর্বশক্তির হয়ে যাবে। ফ্রান্সে আছে বর্তমানে ২ লাখ সেনা।
এই অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে জার্মানির মতো দেশকে চাপে ফেলতে পেরেছে পোল্যান্ড। সবার মনে থাকার কথা যে, গত জানুয়ারিতে ইউক্রেনকে লিওপার্ড ট্যাংক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় জার্মানি। কিন্তু দেশটি সেটি দিতে চায়নি। ন্যাটোর চাপ সত্ত্বেও বার্লিন বিষয়টি কাটিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান থেকে তাদের সরে আসতে হয়েছিল শুধু পোলিশদের তরফ থেকে হুমকি আসার পর। পোলিশরা বলেছিল, জার্মানি না দিলে বার্লিনের অনুমতির তোয়াক্কা না করে তারা তাদের কাছে থাকা লিওপার্ড ট্যাংক ইউক্রেনকে দেবে। পোল্যান্ড কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্যাংক দিয়েছেও। এবং তা জার্মানির কথিত অনুমতি নিয়েই। ফলে সীমান্তে থাকা দেশটি নিয়ে জার্মানিও স্বস্তিতে নেই। তারা এরই মধ্যে নিজেদের সামরিক বাজেট জিডিপির দশমিক ১ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এতে দেশটির মোট সামরিক ব্যয় জিডিপির ১ দশমিক ৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে, যা ইউরোপের সামগ্রিক গড় ২ শতাংশের ঢের নিচে। তারপরও এই ঘোষণা গোটা ইউরোপে নতুন করে সমরায়নের ইঙ্গিতবাহী।
নর্ড স্ট্রিম নামে পরিচিত দুটি গ্যাস পাইপলাইন শুধু ব্যবসায়িক নয়, জার্মানি ও রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থকেও অনেকটা এক করে দিচ্ছে। জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর আবার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির হওয়ায়, তাঁর পক্ষে ঐতিহাসিক কারণেই মস্কোবিরোধী শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে জার্মানিকে সন্দেহের চোখেই বেশি দেখছে আমেরিকা। ইঙ্গ-মার্কিন স্মৃতিতে আসলে ১৯৩৯ সালের রুশ-জার্মান ঐক্যের প্রসঙ্গই ঘুরেফিরে আসছে। আবার ইমানুয়েল ম্যাখোঁর নেতৃত্বাধীন ফ্রান্সও ঠিক মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় পুরোপুরি সায় দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ফ্রান্সের অবস্থান বেইজিংয়ের অবস্থানের সাথে মিলে যাচ্ছে। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত কী করবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে একটা ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে তারা মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে পোল্যান্ডের মতো একটি দেশকে দেখতে চায়, যে তাদের অনুগত থেকে তাদের স্বার্থই রক্ষা করবে। জার্মানি ও ফ্রান্সের নির্লিপ্ততায় তৈরি হওয়া বড় শূন্যস্থানটি পূরণে পোল্যান্ডও আবার সাড়া দিচ্ছে দারুণভাবে। ফলে আমেরিকা ও ব্রিটেনের জন্য তারাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় বিকল্প।
নর্ড স্ট্রিম নামে পরিচিত দুটি গ্যাস পাইপলাইন শুধু ব্যবসায়িক নয়, জার্মানি ও রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থকেও অনেকটা এক করে দিচ্ছে। জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর আবার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির হওয়ায়, তাঁর পক্ষে ঐতিহাসিক কারণেই মস্কোবিরোধী শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে জার্মানিকে সন্দেহের চোখেই বেশি দেখছে আমেরিকা। ইঙ্গ-মার্কিন স্মৃতিতে আসলে ১৯৩৯ সালের রুশ-জার্মান ঐক্যের প্রসঙ্গই ঘুরেফিরে আসছে। আবার ইমানুয়েল ম্যাখোঁর নেতৃত্বাধীন ফ্রান্সও ঠিক মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় পুরোপুরি সায় দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ফ্রান্সের অবস্থান বেইজিংয়ের অবস্থানের সাথে মিলে যাচ্ছে। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত কী করবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে একটা ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে তারা মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে পোল্যান্ডের মতো একটি দেশকে দেখতে চায়, যে তাদের অনুগত থেকে তাদের স্বার্থই রক্ষা করবে। জার্মানি ও ফ্রান্সের নির্লিপ্ততায় তৈরি হওয়া বড় শূন্যস্থানটি পূরণে পোল্যান্ডও আবার সাড়া দিচ্ছে দারুণভাবে। ফলে আমেরিকা ও ব্রিটেনের জন্য তারাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় বিকল্প।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন