রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ জোরদার করতে ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-১৬ দেওয়ার কথা জানিয়েছে আমেরিকা। একই সাথে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর পাইলটদের এই যুদ্ধবিমান চালনায় প্রশিক্ষণও দেবে দেশটি। জাপানের হিরোশিমায় উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর বৈঠকে এই তথ্য জানিয়েছেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এই ঘোষণায় খুবই উৎফুল্ল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর খুশির কারণও গোপন কিছু না। তিনি এতদিন ধরে তাঁর দেশের পরম মিত্রদের কাছ থেকে এ ধরনের সাহায্য আশা করছিলেন। এখন থেকে ইউক্রেনের আকাশ পাহারা দেবে চতুর্থ প্রজন্মের মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৬। আর এই যুদ্ধবিমান আমেরিকা সরাসরি দেবে না। দেবে তার ইউরোপিয় মিত্ররা। নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে তার কাছে থাকা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করার কথা জানিয়েছে। ডেনমার্ক বলেছে, পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেবে।
ব্রিটেন আগামী ৫ বছরে সামরিক ব্যয় ১৩৭০ কোটি ডলার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুইডেন এ বছরই সামরিক ব্যয় ১৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৭০ কোটি ডলার করার কথা জানিয়েছে। জোনাথান লিখছেন, পশ্চিম বা মধ্য ইউরোপে ন্যাটোর বন্ধু দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর যে হিড়িক পড়ে গেছে, তা সাবেক সোভিয়েত জমানার স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও দেখা যায়নি।
পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সামরিক বাজেট বাড়ানোর বিষয়টি খুব রূঢ়ভাবে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ন্যাটো চালাতে একা আমেরিকা কেন কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচ করবে? তখন অনেক সদস্য দেশের মন খারাপ হয়েছিল। আর এখন সেই কাজটি দেশগুলো করছে, একটা বিশেষ পরিস্থিতির অছিলায়। কিছু দিনের মধ্যে তাদের সামরিক বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ করতে হবে। সে পথেই হাঁটছে তারা। শুধু ইউরোপ কেন, জাপানের মতো দেশও সামরিক বাজেট দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ তার শত্রু হিসেবে আবার চীনের লেজুড় হয়ে জুটেছে উত্তর কোরিয়া। অতএব বাজেট না বাড়িয়ে কোনো উপায় আছে? জাপানের মতো দক্ষিণ কোরিয়ারও একই অবস্থা। পাঠক, শুধু টার্গেট দেশগুলোর নাম, অবস্থান ও আর্থিক সক্ষমতার কথা খেয়াল করুন, তাহলে আপনার কাছে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এসবের পাশাপাশি পশ্চিমা কিছু সংগঠনের তথ্য দেখুন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী যে সহিংস সংঘাত চলছে, তার আর্থিক মূল্য ১৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক জিডিপির ১০ শতাংশ। এটা বিশ্বের সামরিক খাতের খরচের চেয়ে অনেক বেশি। গত বছর বিশ্বে সামরিক ব্যয় দুই লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে কিছু বেশি হয়েছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, বিশ্বব্যাপী সংঘাতের জন্য কী চড়া মূল্য মানুষকে দিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও একই ধরনের তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী!
আর এই সহিংসতার আর্থিক মূল্যের বাইরেও আরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি আছে। সহিংসতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কাজ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এমনকি লিঙ্গ বৈষম্য আরও প্রকট করে দিচ্ছে এই ধরনের সহিংসতা। নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের অপহরণ, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের ঢাল হিসেবে শিশুদের ব্যবহার - সবই আছে। বিভিন্ন দেশের ভেতরে ‘ইনসারজেন্সি’ গ্রুপের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের প্রথম শিকার হয় সেখানকার নারীরা, এটা প্রমাণিত। ইউক্রেনে রুশ সেনাদের অপকর্মের কাহিনীও এই তথ্যকে সমর্থন করে। ফলে যুদ্ধ-সহিংসতার ক্ষতিও যে কত বিচিত্রমুখী, তা আমরা সাধারণ বিচারে বুঝতে পারি না।
তাহলে সহিংসতা থামছে না কেন? থামানোর কী কোনো উদ্যোগ নেই? না, নেই। যা আছে, যেটুকু আছে, তার সবটাই লোক দেখানো। এই বছরের প্রথম চার মাসে আমেরিকায় আগ্নেয়াস্ত্রজনিত সহিংসতা বা গান ভায়োলেন্সে মারা গেছে ১৩ হাজার ৯৫৯ জন। সে দেশের গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের এই হিসাব অনুযায়ী, এসব ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জন মারা যায়। তারপরেও বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র কেনার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করে কেন ব্যবস্থা নেয় না মার্কিন প্রশাসন? উত্তর দেওয়ার কী প্রয়োজন আছে?
দুঃখের বিষয় হলো, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তাঁর কর্মকর্তারা রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের পালে বাতাস দিলেন হিরোশিমায় বসে। জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে। তাঁদের একবারও মনে হলো না ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের কথা; প্রায় ৭৮ বছর আগে আমেরিকার বি-৫২ যুদ্ধবিমান থেকে ফেলা ‘লিটল বয়’ নামের সেই আণবিক বোমায় মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কাহিনী। এখনো অন্যের পাপের দায়ভার টেনে যাচ্ছে হিরোশিমাবাসী। এই হিরোশিমায় ইউক্রনের ছায়াতলে নাকি শান্তির অন্বেষায় বসেছেন বিশ্বের মাতব্বর নেতারা! হায় রে শান্তি! সেলুকাসের সাথে সাথে তুইও মরে বেঁচে গেছিস। এই ভণ্ডামি অন্তত দেখতে হয়নি।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন