বিশ্বশান্তির খোঁজে যে দ্বিচারিতা চলছে

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ জোরদার করতে ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-১৬ দেওয়ার কথা জানিয়েছে আমেরিকা। একই সাথে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর পাইলটদের এই যুদ্ধবিমান চালনায় প্রশিক্ষণও দেবে দেশটি। জাপানের হিরোশিমায় উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর বৈঠকে এই তথ্য জানিয়েছেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এই ঘোষণায় খুবই উৎফুল্ল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর খুশির কারণও গোপন কিছু না। তিনি এতদিন ধরে তাঁর দেশের পরম মিত্রদের কাছ থেকে এ ধরনের সাহায্য আশা করছিলেন। এখন থেকে ইউক্রেনের আকাশ পাহারা দেবে চতুর্থ প্রজন্মের মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৬। আর এই যুদ্ধবিমান আমেরিকা সরাসরি দেবে না। দেবে তার ইউরোপিয় মিত্ররা। নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে তার কাছে থাকা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করার কথা জানিয়েছে। ডেনমার্ক বলেছে, পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেবে।

জি-৭ সম্মেলনে নেতারা। ছবি: টুইটার

অতএব যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে তুলতে এ ঘোষণা একেবারে সোনায় সোহাগা। সংঘাত শুরু হওয়ার ৪৫০ দিনের মাথায় আমেরিকার এই ঘোষণা বিশ্বের পুরো চালচিত্রটাই বদলে দিল। আমেরিকার এই ঘোষণা যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপিয় মিত্র দেশ সমর্থন করলেও ফ্রান্স, জার্মানিসহ আরও অনেকের মতামত জানা যায়নি। ফ্রান্স আর জার্মানি অনেক আগে থেকেই এই সংঘাত অবসানের চেষ্টা চালাচ্ছিল। এর আগে ইউক্রেনকে আধুনিক ট্যাংক দেওয়ার কথা মিত্ররা বললেও জার্মানি অনেক দিন গড়িমসি করেছে। এখন আমেরিকা এফ-১৬ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তাদের চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান টাইফুন বা মিরেজ-২০০০ দিয়ে সাহায্য করার ব্যাপারে যে চাপে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই।

তবে এই পরিস্থিতিতে কে চাপে পড়বে বা কার ভালো হবে, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়েও এক কথায় বলায় যায়, রুশ-ইউক্রেন সংঘাত সহজে থামছে না। কারণ থামানোর উদ্যোগের চেয়ে যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢালার আয়োজন চলছে আরও জাঁকজমকের সাথে। শুধু কী ইউক্রেন? তাইওয়ানকে ঘিরে চীন উত্তেজিত। পশ্চিমা ফাঁদে পা দিয়ে চীন যদি রাশিয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, ভাবতে পারেন? এর বাইরে আফ্রিকায় সুদান, ইথিওপিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন - কোথায় সংঘাত নেই। আর বিভিন্ন দেশে জঙ্গি/ বিচ্ছিন্নতাবাদী/ দেশবিরোধী/ ইনসার্জেন্ট- নানা বিশেষণে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ভূষিত করে চলছে আরেক সংঘাত। অর্থাৎ সর্বত্র অস্ত্রের ঝনঝনানি। ‌‘শান্তির ললিত বাণী’ আজ বিশ্বের সর্বত্র ‌‘ব্যর্থ পরিহাস’-এর মতো শোনাচ্ছে।

এই চিত্রের সাথে আরও কিছু বিষয় যোগ করা যাক। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতে জড়িত দেশ/ গোষ্ঠী/ দল-এর মধ্যে কাজ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন। সংঘাত বন্ধ করে কীভাবে একটা আপসের পথ খুঁজে বের করা যায়, সেটাই তাদের কাজ। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব সংগঠন চলেই পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থ সাহায্যে। এই রকম একটি সংগঠন কনসিলিয়েশন রিসোর্সেস-এর নির্বাহী পরিচালক জোনাথান কোহেন কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আলজাজিরার অনলাইনে লিখছেন, গত ১৪ বছরের মধ্যে ১০ বছরই এসব সংগঠনের জন্য দেওয়া অর্থের পরিমাণ কমেছে। সেফওয়ার্ল্ড অ্যান্ড মার্চি করপস দেখিয়েছে, ২০১৬-২১ সাল পর্যন্ত এই খাতে যুক্তরাজ্যের সাহায্য ৩০ কোটি ডলারে ঘুরপাক খাচ্ছে। শান্তি আলোচনার সাথে যুক্ত সংগঠনগুলোর জন্য সুইডেন সরকারের সাহায্য কমেছে ৪০ শতাংশ। অথচ গত বছর দেশটির আর্থিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৪ শতাংশ।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত

জোনাথান বলছেন, কমছে ঠিক আছে। কিন্তু এই অর্থ যাচ্ছে কোথায়? এই অর্থ কী সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষজনের ঘরবাড়ি তৈরির কাজে লাগছে? কী আহাম্মকের মতো প্রশ্ন দেখুন তো! এই অর্থ বাস্তুচ্যুতদের পেছনে ব্যয় হবে কেন? এটা যোগ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দেশের সামরিক বাজেটে। না হলে অন্যকে অনিরাপদ করে নিজেকে নিরাপদ করা যাবে কীভাবে? জানেন তো, ২০২২ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আগে কেউ কোনো দিন দেখেনি। নিরাপত্তা ভীতি থেকে বাড়ছে সামরিক বাজেট - এমনটাই দাবি দেশগুলোর।

তবে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে ইউরোপের এই নিরাপত্তাভীতি কতটা যৌক্তিক, আর কতটা মানুষের নিজের তৈরি - তা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়া-চীন জুজুর ভয়ে তারা কতটা তটস্থ সে কথা বলা কঠিন। কিন্তু আসল কাজটা তারা করে ফেলছে, সামরিক বাজেট বাড়িয়েই চলেছে।

ব্রিটেন আগামী ৫ বছরে সামরিক ব্যয় ১৩৭০ কোটি ডলার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুইডেন এ বছরই সামরিক ব্যয় ১৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৭০ কোটি ডলার করার কথা জানিয়েছে। জোনাথান লিখছেন, পশ্চিম বা মধ্য ইউরোপে ন্যাটোর বন্ধু দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর যে হিড়িক পড়ে গেছে, তা সাবেক সোভিয়েত জমানার স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও দেখা যায়নি।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সামরিক বাজেট বাড়ানোর বিষয়টি খুব রূঢ়ভাবে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ন্যাটো চালাতে একা আমেরিকা কেন কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচ করবে? তখন অনেক সদস্য দেশের মন খারাপ হয়েছিল। আর এখন সেই কাজটি দেশগুলো করছে, একটা বিশেষ পরিস্থিতির অছিলায়। কিছু দিনের মধ্যে তাদের সামরিক বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ করতে হবে। সে পথেই হাঁটছে তারা। শুধু ইউরোপ কেন, জাপানের মতো দেশও সামরিক বাজেট দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ তার শত্রু হিসেবে আবার চীনের লেজুড় হয়ে জুটেছে উত্তর কোরিয়া। অতএব বাজেট না বাড়িয়ে কোনো উপায় আছে? জাপানের মতো দক্ষিণ কোরিয়ারও একই অবস্থা। পাঠক, শুধু টার্গেট দেশগুলোর নাম, অবস্থান ও আর্থিক সক্ষমতার কথা খেয়াল করুন, তাহলে আপনার কাছে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

এসবের পাশাপাশি পশ্চিমা কিছু সংগঠনের তথ্য দেখুন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী যে সহিংস সংঘাত চলছে, তার আর্থিক মূল্য ১৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক জিডিপির ১০ শতাংশ। এটা বিশ্বের সামরিক খাতের খরচের চেয়ে অনেক বেশি। গত বছর বিশ্বে সামরিক ব্যয় দুই লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে কিছু বেশি হয়েছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, বিশ্বব্যাপী সংঘাতের জন্য কী চড়া মূল্য মানুষকে দিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও একই ধরনের তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী!

আর এই সহিংসতার আর্থিক মূল্যের বাইরেও আরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি আছে। সহিংসতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কাজ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এমনকি লিঙ্গ বৈষম্য আরও প্রকট করে দিচ্ছে এই ধরনের সহিংসতা। নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের অপহরণ, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের ঢাল হিসেবে শিশুদের ব্যবহার - সবই আছে। বিভিন্ন দেশের ভেতরে ‘ইনসারজেন্সি’ গ্রুপের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের প্রথম শিকার হয় সেখানকার নারীরা, এটা প্রমাণিত। ইউক্রেনে রুশ সেনাদের অপকর্মের কাহিনীও এই তথ্যকে সমর্থন করে। ফলে যুদ্ধ-সহিংসতার ক্ষতিও যে কত বিচিত্রমুখী, তা আমরা সাধারণ বিচারে বুঝতে পারি না।

তাহলে সহিংসতা থামছে না কেন? থামানোর কী কোনো উদ্যোগ নেই? না, নেই। যা আছে, যেটুকু আছে, তার সবটাই লোক দেখানো। এই বছরের প্রথম চার মাসে আমেরিকায় আগ্নেয়াস্ত্রজনিত সহিংসতা বা গান ভায়োলেন্সে মারা গেছে ১৩ হাজার ৯৫৯ জন। সে দেশের গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের এই হিসাব অনুযায়ী, এসব ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জন মারা যায়। তারপরেও বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র কেনার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করে কেন ব্যবস্থা নেয় না মার্কিন প্রশাসন? উত্তর দেওয়ার কী প্রয়োজন আছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র বিক্রি করে আমেরিকা, কারণ তার কাছে আছে আধুনিকতম অস্ত্রভাণ্ডার। ২০২২ সালে বিশ্বে মোট অস্ত্র রপ্তানিতে আমেরিকার ভাগ ছিল ৪০ শতাংশ। এরপর রাশিয়ার (১৬%)। স্ট্যাটিস্ট্যার হিসাব বলছে, এই তালিকার পরের ক্রমে আছে ফ্রান্স, চীন, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, নেদারল্যান্ডস ও তুরস্ক। এখন দুনিয়ার দেশে দেশে যেভাবে সামরিক বাজেট ফুলে ফেঁপে উঠছে, তাতে বিক্রির তালিকার ওপরের সারির দেশগুলোর পোয়াবারো।

দুঃখের বিষয় হলো, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তাঁর কর্মকর্তারা রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের পালে বাতাস দিলেন হিরোশিমায় বসে। জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে। তাঁদের একবারও মনে হলো না ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের কথা; প্রায় ৭৮ বছর আগে আমেরিকার বি-৫২ যুদ্ধবিমান থেকে ফেলা ‘লিটল বয়’ নামের সেই আণবিক বোমায় মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কাহিনী। এখনো অন্যের পাপের দায়ভার টেনে যাচ্ছে হিরোশিমাবাসী। এই হিরোশিমায় ইউক্রনের ছায়াতলে নাকি শান্তির অন্বেষায় বসেছেন বিশ্বের মাতব্বর নেতারা! হায় রে শান্তি! সেলুকাসের সাথে সাথে তুইও মরে বেঁচে গেছিস। এই ভণ্ডামি অন্তত দেখতে হয়নি।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন