সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জমানার বাণিজ্য যুদ্ধের পর আর সেভাবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। বরং প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের জের ধরে এ উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় ব্লিঙ্কেনের বেইজিং সফর ঘিরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আশা সঞ্চারিত হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, ব্লিঙ্কেনের এই সফর হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু আমেরিকার সীমানার ওপর দিয়ে যাওয়া তথাকথিত ‘চীনা গোয়েন্দা বেলুন’ ভূপাতিত করার পর এ সফর পিছিয়ে যায়। সে সময় ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, চীন এ ধরনের বেলুন মার্কিন সীমানায় উড়িয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সামরিক এলাকাগুলো সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। যদিও চীন সে অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার অবসান হয়নি। এবার দীর্ঘ বিরতির পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে এমন পরিস্থিতির কিছুটা প্রশমন হবে বলে আশা করছে উভয় পক্ষ।
ট্রাম্প জমানায় বাণিজ্যযুদ্ধ চলার সময় সর্বশেষ ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও চীন সফর করেছিলেন। ২০১৯ সালের পর আর কোনো উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তা চীন সফর করেননি। ফলে ব্লিঙ্কেনের এ সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বেইজিং সফরের সময় তিনি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং অথবা চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই-এর সাথে সাক্ষাৎ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মাইক পম্পেওর মতো তিনি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাথে দেখা করবেন কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
তবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও কিন্তু বসে নেই। আজ শুক্রবারই তিনি মার্কিন ধনকুবের বিল গেটসের সাথে বৈঠক করেছেন। সেখানে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতাকে তিনি ‘আমেরিকান বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। চিনপিং বৈঠকে বিল গেটসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমরা সবসময় আমেরিকান জনগণের ওপর আমাদের আশা রেখেছি। আমি দুই দেশের জনগণের মধ্যে অব্যাহত বন্ধুত্বের প্রত্যাশা করছি।’
ফলে ব্লিঙ্কেনের রোববারের সফর নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ, অর্থনীতি বিবেচনায় চীন-আমেরিকা সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও বেশ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যখন বিশ্বের প্রায় সব দেশ মূল্যস্ফীতির মতো অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় চীনে অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সফরের মূল লক্ষ্য সম্পর্কোন্নয়নই। এ বিষয়ে আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ড্যানিয়েল ক্রিটেনব্রিংক আল-জাজিরাকে বলেন, ব্লিঙ্কেনের চীন সফরের মূল লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যকার যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে পুনঃস্থাপন করা। একইসঙ্গে পরস্পরের বিষয়ে থাকা ভুল ধারণাগুলোকে চিহ্নিত করে, সেগুলোর অবসান ঘটানো। পাশাপাশি দুই পরাশক্তির মধ্যে থাকা প্রতিযোগিতা যেন সংঘাতে রূপ না নেয়, তা নিশ্চিতে চেষ্টা করাটাও হবে এ সফরের লক্ষ্য।
ক্রিটেনব্রিংকের এই ভাষ্যকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শুধু মুখের কথা বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না। সত্যিকার অর্থেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সম্প্রতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, গোটা বিশ্ব এটি সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে উৎকণ্ঠায় আছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এরই মধ্যে সম্ভাব্য তাইওয়ান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছেন। তেমন কিছু প্রবণতাও দেখা গেছিল সম্প্রতি।
গত মাসেই যেমন চীনা যুদ্ধবিমানের সাথে মার্কিন নজরদারি বিমানের সংঘর্ষ বাধতে বাধতে বাধেনি। সেটা নিয়ে আবার উভয় পক্ষই বেশ কড়া অবস্থান প্রকাশ করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেটি ছিল ট্রাম্প জমানায় দুই দেশের সম্পর্ক অবনমন এবং বাইডেন জমানায় তার প্রশমন না হওয়া বাস্তবতায় বহু দ্বন্দ্বের সর্বশেষটি।
কিন্তু এখন সম্ভবত উভয় পক্ষই নিজেদের কিছুটা রাশ টেনে ধরতে চাইছে। এ বিষয়ে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রায়ান হ্যাস বলেন, ‘নিজেদের সম্পর্কোন্নয়ন করা যায় কিনা, তা বোঝার জন্য ব্লিঙ্কেনের এই সফরকে প্রথম ধাপ হিসেবে বর্ণনা করা যায়। পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং উত্তেজনা ক্রমে বাড়িয়ে তোলাটা জো বাইডেন বা সি চিন পিং কারও প্রশাসনের জন্যই ইতিবাচক নয়। এটা সম্ভবত তারা বুঝতে শুরু করেছে। যদিও দুই পক্ষের কেউই একতরফা নরম হয়ে আসতে রাজি নয়।’
রায়ান হ্যাস বলছেন, ‘ব্লিঙ্কেনের সফরের সময় এই সমস্বার্থের ক্ষেত্রটিই খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। নিজেদের প্রতিযোগিতাকে জারি রেখেও যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে চালু রাখার কোনো পথ আছে কিনা, তারই একটি তালিকা করার চেষ্টা হবে। এমন পথ আছে কিনা, তা অবশ্য এখনো আমরা জানি না। তবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখেও দুই দেশের সম্পর্ক যেন শত্রুতাপূর্ণ না হয়, তার পথ খোঁজার জন্যই কূটনীতিকেরা থাকেন।’
তবে ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত সফর অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই কিন্তু আসু সফরের দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। এ জন্য বেশ একটা প্রস্তুতি নিতে হয়েছে দুই দেশকে। কিছুদিন আগেই দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ফোনালাপ হয়েছে। এ ছাড়া বেইজিংয়ে দুই দেশের কূটনীতিকেরা বৈঠক করেছেন। তার আগে গত মে মাসে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান চীনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ওয়াং ই-এর সাথে ভিয়েনায় একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। এর বাইরেও আলোচনা হয়েছে দুই পক্ষে। মে মাসেই সিঙ্গাপুরে হওয়া সে আলোচনার কথা অবশ্য চীন অস্বীকার করেছে। মূলত ২০১৮ সালে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফুর ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাইডেনের অস্বীকৃতির প্রতিক্রিয়াতেই চীন ওই বৈঠকের কথা স্বীকার করেনি। তবে ব্লিঙ্কেনের সফল বলছে, সেই পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলেছে।
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে বেশ আশাবাদী জননীতি ও সুশাসন বিষয়ক চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যানগোল ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো কিনডু জু। সাবেক এ সাংবাদিকের মতে, ব্লিঙ্কেনের ওই সফর আশাবাদী করছে। হতে পারে এটি চলতি বছরের শেষে আমেরিকায় অনুষ্ঠেয় অ্যাপেক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের একটা চেষ্টা।
তেমনটা সম্ভব হলে সারা বিশ্বের জন্যই তা সুসংবাদ বয়ে আনতে পারে। কে না জানে চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বের জেরে কত দেশের কত কোটি মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।