নাইজেরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় কওয়ারা রাজ্যে দুই গ্রামে গণহারে গুলিবর্ষণ ও হামলা চালিয়ে অন্তত ৭৫ মুসলিমকে মেরে ফেলেছে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী। স্থানীয় গভর্নর আবদুলরহমান আবদুলরাজাক জানিয়েছেন, এই গণহত্যা চালানো হয়েছে তাঁদের ওপর যাঁরা ‘চরমপন্থী জিহাদিদের প্রচারিত অদ্ভুত ধর্মবাণী মেনে নিতে রাজি হননি।’
তবে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা আছে। রাজ্যের একজন আইনপ্রণেতা বিবিসিকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৭৮ জনকে দাফন করা হয়েছে, এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে — প্রাথমিক অনুমান ১৭০ পর্যন্ত।
হত্যার জন্য ইসলামপন্থী জিহাদি গ্রুপ বোকো হারামকে দায়ী বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছেন। গত কয়েক দিনে নাইজেরিয়ায় একের পর এক সহিংস হামলা হচ্ছে, এরই মধ্যে হলো এই গণহত্যা।
কওয়ারা রাজ্যের সংসদ সদস্য সাইদু বাবা আহমেদ জানিয়েছেন, ওরো ও নুকু গ্রামে এই হামলার সময় ৩৮ জনকে অপহরণও করা হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়, এবং দোকান ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় নেতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও নিহত বা অপহরণের শিকার হয়েছেন। হামলা বিকেল ৫টার দিকে শুরু হয়ে তিন-চার ঘণ্টা ধরে চলেছে।
আহমেদ জানান, ওই অঞ্চলে বোকো হারামের সক্রিয়তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ওই অঞ্চলের মানুষ ইসলামের চরমপন্থী ব্যাখ্যা মানতে রাজি না হওয়াতেই তাঁদের ওপর এই গণহত্যা চালানো হয়েছে। জিহাদি গোষ্ঠী আগেই স্থানীয়দের নোটিশ পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা আসছে। তবে গ্রামবাসী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল।
রেড ক্রসের কর্মকর্তা বাবাওমো আয়োডেজি জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা এখন ১৬২ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ১৭০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, অনেককে কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে, কিছু মানুষকে জীবিত জ্বালিয়ে মারা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা তাৎক্ষণিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
গত কয়েক মাসে কওয়ারা রাজ্যে একটি জিহাদি গ্রুপ মটরসাইকেলে চড়ে এসে ওই অঞ্চলের বাজার ও গ্রাম সুরক্ষার জন্য তৈরি স্থানীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হত্যা চালাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই জিহাদি গ্রুপটি বোকো হারামের একটি শাখা। আবদুলরাজাক বলেছেন, ধারণা করা হচ্ছে, এই হামলা সম্ভবত চালানো হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। কারণ নিরাপত্তাবাহিনী সম্প্রতি ওই অঞ্চলে সফলভাবে কিছু সন্ত্রাসী ও অপহরণকারী দলের খোঁজ বের করে ফেলেছিল।
একই দিন বোকো হারামের হামলায় উত্তরাঞ্চলীয় কাতসিনা রাজ্যের ডোমা গ্রামে ২১ জন এবং উত্তর-পূর্বের বোর্নো রাজ্যে আরও ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
এই ঘটনা ঘটেছে এমন সময়ে, যখন নাইজেরিয়ায় মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতির প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এসেছে। নভেম্বরে নাইজেরিয়ায় ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে হত্যা করছে – এমন অভিযোগ তুলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাইজেরিয়ার ভেতরে অভিযান চালাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য হিসেবে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন – চরমপন্থী গ্রুপকে বিনাশ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান কমান্ডের জেনারেল দাগভিন অ্যান্ডারসন জানিয়েছেন, নাইজেরিয়ার অনুরোধে গোয়েন্দা সমর্থনের জন্য এই বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নাইজেরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিসোফার মুসা অবশ্য মার্কিন সামরিক দলে সদস্যসংখ্যা, তাদের আগমণের তারিখ, অবস্থান কিংবা কতদিন থাকবেন এ ব্যাপারে কিছু জানাননি।
নাইজেরিয়ার উত্তরপ্রান্ত প্রধানত মুসলিম, দক্ষিণে মূলত খ্রিস্টান, মধ্যাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা। দেশটিতে ন্যায়বিচারের অভাব, ক্রিমিনাল গ্যাং ও জিহাদি গ্রুপের উত্থান এবং স্বাধীনতাবাদী আন্দোলনের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি একেবারে নাজুক হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনী বোর্নো রাজ্যে চরমপন্থী নেতা ও ১০ জন অন্যান্য জঙ্গিকে হত্যা করেছে।