মার্কিন সিনেটের কাঠামো ও কাজ

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম সিনেট, যা দেশটির অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিনিধিমূলক সভা। মার্কিন শাসনবস্থায় সিনেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা ও কার্যাবলির বিচারে সিনেট প্রতিনিধি পরিষদের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের আইনসভার উচ্চকক্ষের হাতে এত বেশি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই। 

যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যগুলোর সমপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সিনেট গঠিত হয়। মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর আয়তন ও লোকসংখ্যায় তারতম্য থাকলেও প্রত্যেক অঙ্গরাজ্য থেকে সিনেটে দুজন করে সদস্য নির্বাচিত হয়। ৫০টি অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে সিনেটে মোট সদস্য সংখ্যা ১০০। মার্কিন সিনেটরদের মেয়াদ থাকে নির্বাচিত হওয়া থেকে ছয় বছর। এটি এমনভাবে নির্বাচন করা হয় যাতে, প্রতি ২ বছরে সিনেটের মোট আসনের প্রায় এক–তৃতীয়াংশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ফলে সিনেটে কখনোই নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয় না।

মার্কিন সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় ধারায় সিনেট সদস্যদের যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে–

প্রার্থীর বয়স হবে সর্বনিম্ন ৩০ বছর।

প্রার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে একাধারে ৯ বছর স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে।

যে নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচন করবেন, সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।

সিনেটের সদস্য থাকাকালে কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কোনো চাকরিতে কর্মরত থাকতে পারবেন না।

সিনেটের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। কোনো বিষয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হলে, সেখানে যদি টাই হয়, তবে টাইব্রেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

আইন প্রণয়ন বিষয়ক সাধারণ বিলের ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের দুটি কক্ষ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ সমান ক্ষমতাসম্পন্ন। সাধারণ বিল প্রতিনিধি সভার মতো সিনেটেও উত্থাপিত হতে পারে। আবার কোনো বিল পাসের জন্য প্রতিনিধি পরিষদের সমর্থনই যথেষ্ট নয়, সিনেটের অনুমোদনও আবশ্যক।

সরকারি কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও মার্কিন সিনেট ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করে। সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, পদস্থ কর্মচারী, রাষ্ট্রদূত, বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রভৃতি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টর হাতে ন্যস্ত থাকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শাসন ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন পদে যে সমস্ত নিয়োগ করেন, তা সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষ। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগের অনুমোদনটি আসে প্রতিনিধি পরিষদ থেকে।

সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির মতামতকে আগ্রাহ্য করে প্রেসিডেন্টের পক্ষে বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে নীতিনির্ধারণ বা তা কার্যকর করা সহজ ব্যাপার নয়। প্রেসিডেন্টের পক্ষে সাধারণত বৈদেশিক ও সামরিক বিষয়ে সিনেটের উক্ত কমিটি ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অংশের সাথে পরামর্শ করে থাকেন। কোনো বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করার জন্য সিনেট প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করতে পারে।

বিভিন্ন বিষয়ে সিনেটে এমন ১৭টি কমিটি ও ৭০টি সাবকমিটি আছে। বিভিন্ন বিষয়ে আনীত বিল এই কমিটিগুলোর কাছে প্রথমে যায়। তারপর সেখান থেকে যথাযথ যাচাই‑বাছাই শেষে তা ভোটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। তখন বিলটির ওপর সিনেটে ভোট হয়।

সিনেট গুরুত্বপূর্ণ বিচারবিষয়ক ক্ষমতার অধিকারী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদ, তথা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে অভিযোগ আনতে পারে। সিনেটই এই অভিযোগের অনুসন্ধান ও বিচার করে। ইমপিচমেন্ট পদ্ধতিতে বিচার করার ক্ষমতা একমাত্র সিনেটেরই আছে। এই রকম বিচারকাজ সম্পাদনের সময় সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি সভাপতিত্ব করেন।

মার্কিন সংবিধান অনুসারে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে কেউ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সিনেট অধিকসংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত প্রথম দুজন প্রার্থীর মধ্যে একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত করে।

মার্কিন সিনেটের শাসন‑সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত বা অনুসন্ধান পরিচালনা করার ক্ষমতাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সিনেটের এ ধরনের অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কমিটি নিয়োগ করে সিনেট যেকোনো পদস্থ সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করতে পারে। 

সিনেট সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ক্ষমতাও ভোগ করে। সিনেটের অনুমোদন ছাড়া সংবিধান সংশোধন কার্যকর হয় না। সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব কংগ্রেসে পাস হতে সিনেটের দুই- তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি লাগে।

শাসন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট যেসকল আন্তর্জাতিক সন্ধি ও চুক্তি স্বাক্ষর করেন, সেগুলোও সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষ। সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য অনুমোদন করলেই কেবলমাত্র এসব সন্ধি-চুক্তি কার্যকর হতে পারে।

মার্কিন ব্যবস্থায় একমাত্র সিনেট যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা রাখে। সিনেটের সম্মতি ছাড়া প্রেসিডেন্ট ৩ মাসের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য। 

আমেরিকায় সিনেট প্রেসিডেন্ট কর্তৃক কোনো নিয়োগে বৈদেশিক চুক্তি অনুমোদন না করলে তা কার্যকর হয় না। অন্য কোনো দেশের উচ্চকক্ষকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

তথ্যসূত্র: হোয়াইটহাউস ডট ওআরজি