মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে রাস্তায় যৌন হেনস্তার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মেক্সিকো সিটিতে গতকাল মঙ্গলবার রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলেন শেইনবাউম। সে সময়ে এক ব্যক্তি এসে প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরার এবং গলায় চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন।
এ ঘটনায় একদিকে রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে মেক্সিকোতে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে। দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তিই যদি এভাবে যৌন হেনস্তার শিকার হন, তাহলে সাধারণ নারীদের কী পরিমাণ যৌন হেনস্তার শিকার হতে হয় – স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শেইনবাউম যখন রাস্তায় কয়েকজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন এক ব্যক্তি এসে শেইনবাউমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরার ও তাঁর গলায় চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন। শেইনবাউম ওই ব্যক্তির হাত সরিয়ে দেন এবং ব্যক্তিটির দিকে ঘুরে দাঁড়ান। সে সময়ে এক সরকারী কর্মকর্তা এসে ওই ব্যক্তি ও শেইনবাউমের মাঝে দাঁড়িয়ে যান।
ওই ব্যক্তি মদ্যপান করে এসেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁকে যখন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, শেইনবাউম মুখে হাসি ধরে রেখে শুধু বলেছেন, ‘দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’
মেক্সিকো সিটির পুলিশ পরে নিশ্চিত করেছে, ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনা নিয়ে মেক্সিকোতে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে লেখা, বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভিডিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে মেক্সিকোতে কোনো নারীই যৌন হেনস্তার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন।
নারীবাদী প্রচারণাবিষয়ক ওয়েবসাইট ভলকানিকাস-এর সাংবাদিক কাতালিনা রুইস-নাভারো বলেছেন, ‘আপনি প্রেসিডেন্ট হলেও, একজন পুরুষ ভাবতে পারছে যে তাঁর বিনা অনুমতিতে আপনার শরীর স্পর্শ করার অধিকার আছে! লোকে যখন জিজ্ঞেস করবে যে পুরুষতন্ত্র আসলে কী, এটাই সেটা!’
তবে এই ঘটনার পর জনপরিসরে শেইনবাউমের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি শেইনবাউমের শরীরে স্পর্শ করার চেষ্টার বেশ কয়েক সেকেন্ড পর একজন কর্মকর্তা এসে সেখানে দাঁড়িয়েছেন।
মেক্সিকোতে তিনদিন আগেই মিশোয়াচান রাজ্যের জনপ্রিয় মেয়র কার্লোস আলবের্তো মানসো রদ্রিগেসকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ‘দ্য ডে অব দ্য ডেড’ উদ্যাপনের সময়ে আততায়ী এসে খুব কাছ থেকে রদ্রিগেসের শরীরে সাতবার গুলি করেন।
২০২৪ সালের জুনে নির্বাচনের আগে প্রচারণার সময়ে ৩৭ জন প্রার্থীকে খুন করা হয়। সে বছরের ১ অক্টোবর শেইনবাউম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০ জন মিউনিসিপাল প্রেসিডেন্ট খুন হয়েছেন।
সেসব যদিও মূলত আঞ্চলিক ঘটনা, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এমন খুনের উদাহরণ মেক্সিকোতে আছে। ১৯৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী লুইস দোনালদো কলোসিওকে গুলি করে খুন করা হয়। ২০২০ সালে হালিসকো সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ওমার গার্সিয়া হারফুচের গাড়িবহর গুলিতে ঝাঁজরা করে তাঁকে খুন করার চেষ্টা করে, ওমার গার্সিয়া এখন শেইনবাউমের সরকারে নিরাপত্তামন্ত্রী।
গত বছর শেইনবাউমের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল যখন চিয়াপাসে নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে মুখে মাস্ক পরা কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাঁর গাড়ি থামান এবং জিজ্ঞেস করে রাজ্যে সন্ত্রাস কমানোর জন্য তিনি কী করছেন! পরে অবশ্য শেইনবাউমকে যেতে দেয় মুখোশধারীরা।
শেইনবাউম এখন পর্যন্ত তাঁর আগের জনপ্রিয় শাসক আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেস অবরাদোরের ঢংয়ে রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার, তাঁদের কথা শোনার ধারা চালু রেখেছেন। এসব সময়ে খুব বেশি নিরাপত্তাব্যবস্থাও রাখতে চান না তিনি। তবে গতকালের ঘটনার পর তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে হয়তো নতুন করে ভাবতে হবে শেইনবাউমকে।
মেক্সিকান ম্যাগাজিন এতসেতেরার পরিচালক আলেহান্দ্রা এসকোবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আশা তো করি (হেনস্তাকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে) এবং প্রেসিডেন্ট একটা বার্তা পৌঁছে দেবেন যে, কোনো পুরুষেরই অনুমতিছাড়া কোনো নারীকে ছোঁয়ার বা চুমু খেতে চাওয়ার অধিকার নেই। আশা করি এই ঘটনা (তাঁর সহকারীদের জন্যও) একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে। তাঁকে এমন ঝুঁকির মধ্যে রাখা তো গ্রহণযোগ্য নয়।’