তাঁর অন্তরের অন্তস্থল থেকে আসা অনুভূতির কারণেই হোক, বা রাজনৈতিক সুবিধা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের আশির্বাদের লোভে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো তাঁর জেতা নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদকটি গত বৃহস্পতিবার তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। কিন্তু পদক হাতে পেলেই কি আর পুরস্কার ট্রাম্পের নামে হয়ে যাবে? এমন তো হওয়ার কোনো কারণ নেই!
তা এ নিয়ে পরের দিন, অর্থাৎ শুক্রবারই এক বিবৃতি প্রকাশ করেছে নোবেল কমিটি। সেখানে ট্রাম্প বা মাচাদো কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি বটে, তবে তারা লিখেছে, পদক হাতে থাকলেই পরিচয় বদলে যায় না!
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জেতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ কতটা ছিল, তা সম্ভবত এখন আর কারও অজানা নয়। তবে ২০২৫ সালে নোবেল কমিটি তাঁকে নয়, শান্তিতে নোবেলের জন্য বেছে নেয় ভেনেজুয়েলার মাদুরো-প্রশাসনের বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে।
মাচাদো সে সময়েই একবার ‘এই পুরস্কার ট্রাম্পের প্রাপ্য’ বলে স্তুতি জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের প্রতি। এর মধ্যে গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়। মাদুরো বিরোধিতার পাশাপাশি আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রতি গদগদ ভাবের কারণে মাচাদোই এরপর ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব পাবেন বলে ধারণা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি। এই মুহূর্তে দেলচি রদ্রিগেসের হাতেই ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব। ভেনেজুয়েলার ভেতরে মাচাদোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সংশয় আছে ট্রাম্প প্রশাসনের, এমন খবরও এসেছে। এমনকি এ-ও শোনা গেছে যে, মাচাদো নোবেল পুরস্কারটা নিতে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণেই ট্রাম্প তাঁকে ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব দিচ্ছেন না!
এর প্রেক্ষিতেই গত বৃহস্পতিবার মাচাদো তাঁর জেতা নোবেল পুরস্কারের পদকটা ট্রাম্পের হাতে দিয়ে এসেছেন। দুজন বৈঠকও করেছেন।
তা মাচাদো তাঁর পদক ট্রাম্পের হাতে দিয়ে দেওয়ার পরদিনই নোবেল কমিটি বিবৃতিতে লিখেছে, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক বা সনদ কার হাতে আছে — তা দিয়ে নোবেলজয়ীর পরিচয় বদলায় না। যিনি বা যে সংস্থাকে নরওয়ের নোবেল কমিটি বিজয়ী ঘোষণা করে, ইতিহাসে নোবেলজয়ী হিসেবে তাঁর নামই চূড়ান্তভাবে থেকে যায়। পুরস্কারের পদক, সনদ বা অর্থের ভবিষ্যৎ কী হলো, সেটি এই স্বীকৃতিকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করে না।’
কমিটি বলেছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর সেটি কাউকে দেওয়া, ভাগ করে নেওয়া বা হস্তান্তর করার সুযোগ নেই। একবার ঘোষণা হলে সেই সিদ্ধান্ত চিরকালের জন্য চূড়ান্ত থাকে, কোনো পরিস্থিতিতেই তা প্রত্যাহার করা যায় না।
বিজয়ীদের প্রতিদিনের কর্মকান্ড নিয়ে কথা বলা নোবেল কমিটির কাজ নয় জানিয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নোবেল কমিটি সাধারণত বিজয়ীদের পরবর্তী বক্তব্য, সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করে না। যে সময়ের অবদান বিবেচনা করে পুরস্কার দেওয়া হয়, সেই ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর বিজয়ীদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের দায়ভার তাঁদের নিজের।
নোবেল ফাউন্ডেশনের নিয়ম অনুযায়ী, বিজয়ীরা তাঁদের পদক, সনদ বা পুরস্কারের অর্থ নিজের ইচ্ছামতো রাখতে, দান করতে, বিক্রি করতে বা অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাদুঘরে এখন একাধিক নোবেল পদক প্রদর্শিত হচ্ছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী কফি আনানের পদক ও সনদ জাতিসংঘের জেনেভা কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ তাঁর নোবেল পদক নিলামে বিক্রি করে পুরো অর্থ ইউক্রেনীয় শরণার্থী শিশুদের জন্য দান করেছিলেন। আবার নরওয়ের প্রথম শান্তিতে নোবেলজয়ী ক্রিশ্চিয়ান লুস লাঙ্গের পদক অসলোর নোবেল পিস সেন্টারে প্রদর্শিত হচ্ছে।
নোবেল কমিটি মনে করিয়ে দিয়েছে, পদক বা সনদ কোথায় আছে — তা নয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার কাকে দেওয়া হয়েছে, সেটিই মূল সত্য। এই পরিচয় কোনোভাবেই বদলানোর সুযোগ নেই।