যুদ্ধটা শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে। কিন্তু সেই যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ কি এখনো তাঁর হাতেই? যদিও হোয়াইট হাউস বলছে—সব পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের খবর সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই এখন উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা—ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে উল্টো নিজেই চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এমনকি কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধের স্টিয়ারিং হুইল এখন আর ওয়াশিংটনের হাতে নেই... চলে গেছে তেহরানের হাতে! তাহলে কি যুদ্ধের আসল বোতামটাই ফসকে গেল ট্রাম্পের হাত থেকে? মিত্রদের চোখেই কি ব্যর্থ ট্রাম্প?
শুরুতে পরিকল্পনা ছিল একেবারে পরিষ্কার। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত হামলা, ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধাক্কা, তারপর বিজয়ের ঘোষণা—অনেকটা আগের সীমিত সামরিক অভিযানের মতো। ট্রাম্পের মিত্ররাও ভেবেছিলেন—কয়েক দিনেই সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দুই সপ্তাহ না পেরোতেই হোয়াইট হাউসের ভেতরে নতুন হিসাব। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির স্বীকারোক্তি, ‘মাঠের লড়াইয়ে আমরা ইরানকে আঘাত করেছি। কিন্তু আসল কার্ড ইরানের হাতেই।’ অর্থাৎ... যুদ্ধ কত দিন চলবে... যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত স্থলবাহিনী নামাতে হবে কি না... এসব নির্ধারণ করছে ইরানের পদক্ষেপ।
ইরান বেছে নিয়েছে ভিন্ন কৌশল। সরাসরি বড় যুদ্ধ নয়; হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে চাপ। তেলের দাম ৭০ থেকে ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও বেড়েছে জ্বালানির দাম। অর্থাৎ যুদ্ধের চাপ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়... ট্রাম্পের রাজনীতিতেও। হোয়াইট হাউস অবশ্য দাবি করছে—অভিযান সফল। কিন্তু একই সময়ে নতুন সেনা পাঠানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। প্রায় দুই হাজার মেরিন, অ্যাম্ফিবিয়াস আক্রমণ সক্ষমতা, বন্দর দখল থেকে সীমিত স্থল অভিযান—সব প্রস্তুতি। এতেই প্রশ্ন উঠছে—যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে এত বড় সামরিক প্রস্তুতির কী প্রয়োজন?
ট্রাম্পের ‘America First’ শিবিরও এখন বিভক্ত। তাদের বক্তব্য—স্থলযুদ্ধে নামা মানেই হবে সেই দীর্ঘ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া... যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই ট্রাম্প রাজনীতি করেছেন। তাদের পরামর্শ—সাইবার হামলা চালান, প্রয়োজনে মিত্র নৌবাহিনী ব্যবহার করুন, কিন্তু মার্কিন সেনাকে ইরানের মাটিতে নামাবেন না। একবার সেনা নামলে... ফিরে আসার পথ আর সহজ থাকবে না।
ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা ইরানের নেতৃত্ব। মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছেন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি। এখন নেতৃত্বে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদেরই প্রশ্ন—‘যার বাবা ও পরিবারের সদস্যরা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন... সে কি আরও নমনীয় হবে, নাকি কঠোর?’ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঝুঁকিও কম নয়। মিত্ররা বলছেন, স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কমতে পারে। কারণ আমেরিকার ভোটারদের একটি বড় অংশ নতুন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ চায় না।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—যুদ্ধ কি এখনো ট্রাম্প চালাচ্ছেন... নাকি যুদ্ধের গতি ইরান নির্ধারণ করছে? হোয়াইট হাউস বলছে—বিজয় সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু ট্রাম্পের নিজের মিত্ররাই বলছেন—‘এখন কার্ড ইরানের হাতেই।’ প্রশ্ন উঠছে, ইরানকে সামলাতে মার্কিন সেনা কি সত্যিই তেহরানের মাটিতে নামবে? আর সেই মুহূর্তেই ঠিক হবে—এটি কি ট্রাম্পের কৌশলগত বিজয়ের গল্প... নাকি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ইতিহাস, যেখান থেকে বেরিয়ে আসাটাই হবে সবচেয়ে কঠিন লড়াই।