ইরান যুদ্ধের ধাক্কা

আমেরিকার শক্তির প্রতীকের এ কী হাল!

৯ মাস ধরে সমুদ্রে! বন্দরে ফেরার সুযোগ নেই, স্বাভাবিক জীবন নেই—এবার অবশেষে ঘরে ফিরছে আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী পরমাণুচালিত বিমানবাহী রণতরি। বারবার যার মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়েছিল, সেই ইরান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কি মার্কিন রণতরিকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছে?

প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনা নিয়ে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর এই দীর্ঘ অভিযানের শেষ দিকে সামনে এসেছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি, পানীয় জলের সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ সংকট এবং নাবিকদের মধ্যে বাড়তে থাকা মানসিক চাপের খবর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যে রণতরিকে যুদ্ধের শক্তির প্রতীক হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, সেটি ফিরছে ঠিক কেমন অবস্থায়?

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে। পরিকল্পনা ছিল চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে অভিযান শেষ করার। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর বারবার বাড়ানো হয় এর সমুদ্রে থাকার সময়। ফলে রণতরিটি বন্দরে না ভিড়ে টানা ৯ মাস সমুদ্রে কাটিয়েছে।

তবে এই দীর্ঘ অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে অন্য এক চিত্র। রণতরিটিতে দেখা দিয়েছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি। কিছু প্রতিবেদনে গরম ও পানযোগ্য পানির সংকট এবং জাহাজের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। আর দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে নাবিকদের ওপর। পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন—নাবিকদের মধ্যে ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং মনোবল কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি কয়েকজন নাবিক সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মার্কিন নৌবাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, জাহাজে অল্পসংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছিল এবং সেগুলোতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি শুধু যুদ্ধের চাপই সামলাচ্ছিল না—দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে ভিতর থেকেও চাপের মুখে পড়েছিল। আর এই কারণেই এখন আব্রাহাম লিংকনের দেশে ফেরাকে শুধু একটি নিয়মিত প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধের সময় একটি রণতরি যত বেশি সময় সমুদ্রে থাকে, তার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, খাবার, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রামের সুযোগ। এই সবকিছুর ওপর দীর্ঘদিনের চাপ তৈরি হলে সেটি শুধু নাবিকদের মনোবল নয়, পুরো যুদ্ধক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আর আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে ঠিক সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

ইরান যুদ্ধের ময়দানে আমেরিকার রণতরি ছিল শক্তির প্রতীক। কিন্তু ৯ মাস পর সেই রণতরি যখন ঘরে ফিরছে, তখন সঙ্গে নিয়ে ফিরছে দীর্ঘ অভিযানের ক্লান্তি, সরবরাহ সংকট আর নাবিকদের চাপের খবর। এখন মূল প্রশ্ন—এত দীর্ঘ যুদ্ধ আর টানা মোতায়েনের পর মার্কিন নৌবাহিনীর আরও কত রণতরিকে একইভাবে বিশ্রাম নিতে ঘরে ফিরতে হবে? কারণ সমুদ্রে শক্তি দেখানো যায়… কিন্তু সেই শক্তিকে কত দিন টানা যুদ্ধের মধ্যে সচল রাখা যায়—ইরান যুদ্ধের পর এখন সেই পরীক্ষাই শুরু হয়ে গেল আমেরিকার জন্য।